আমাদের সমাজে পরীক্ষার খাতায় গৎবাঁধা প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারাকে অনেক সময় ব্যর্থতার সমার্থক মনে করা হয়। জিপিএ-৫ বা ভালো ফলের চাপে পিষ্ট হয়ে অনেক শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ‘ফেল’ মারা কিংবা ঝরে পড়া অনেক মানুষই পরবর্তী জীবনে বদলে দিয়েছেন মানবসভ্যতা। সনদ নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি আর অদম্য জেদই যে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি—তা প্রমাণ করেছেন এই আলোকিত মানুষগুলো।
১. রিচার্ড ব্র্যানসন: স্কুল পালানো সেই ধনকুবের
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দেন বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তা ও ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসন। শিক্ষাজীবনে শিক্ষকরা তার ওপর এতটাই ত্যক্ত-বিরক্ত ছিলেন যে, তার হেডমাস্টার রবার্ট ড্রেসন বলেছিলেন— “ব্র্যানসন হয় একদিন জেলে যাবে, না হয় কোটিপতি হবে।” শিক্ষকদের সেই ধারণা ভুল হয়নি। মাত্র ১৬ বছরেই ‘স্টুডেন্ট’ ম্যাগাজিন দিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ তিনি ৪০০টি কোম্পানির নিয়ন্ত্রক এবং ৫.১ বিলিয়ন ডলারের মালিক।
২. জ্যাক মা: ব্যর্থতার পাহাড় ডিঙানো কিংবদন্তি
চীনের শীর্ষ ধনী জ্যাক মা’র জীবন যেন ব্যর্থতার এক মহাকাব্য। প্রাথমিক পরীক্ষায় দু’বার এবং মাধ্যমিকে তিনবার ফেল করেছিলেন তিনি। এমনকি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বার আবেদন করে প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হন। চাকরির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ; কেএফসিতে ২৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হলেও বাদ পড়েছিলেন একমাত্র তিনি। কিন্তু দমে যাননি। আজ তার গড়া ‘আলিবাবা’ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।
৩. জেকে রাউলিং: অক্সফোর্ড যাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল
হ্যারি পটার সিরিজের স্রষ্টা জেকে রাউলিং আজ বিশ্বের সবচেয়ে দামী লেখকদের একজন। অথচ তার শিক্ষাজীবন ছিল বাধাগ্রস্ত। এ-লেভেলে বাজে ফলের কারণে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগই পাননি। পরে ইউনিভার্সিটি অফ এক্সটার থেকে শিক্ষা শেষ করে লেখালেখিতে মন দেন। আজ তার বই পড়েনি এমন তরুণ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
৪. স্টিভ জবস: কলেজ ড্রপআউট থেকে প্রযুক্তির জাদুকর
অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস কলেজের গণ্ডি পার করতে পারেননি। পড়াশোনায় আগ্রহ কম থাকলেও তার ছিল উদ্ভাবনী চিন্তা। মাত্র ২০ বছর বয়সে গ্যারেজে বসে অ্যাপল শুরু করেন। মাঝপথে নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হয়েও ফিরে আসেন বীরদর্পে। আইফোন বা ম্যাকবুকের মতো বৈপ্লবিক প্রযুক্তি আজ তারই দূরদর্শী চিন্তার ফসল।
৫. বিল গেটস: মাইক্রোসফটের নেপথ্যে হার্ভার্ডের সেই ছাত্র
বিশ্বের দীর্ঘ সময়ের শীর্ষ ধনী বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তার লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্ব জয় করা। ডিগ্রি না থাকলেও তার তৈরি ‘মাইক্রোসফট’ আজ পৃথিবীর প্রতিটি কম্পিউটারের অপরিহার্য অংশ। তিনি প্রমাণ করেছেন, উদ্ভাবনী শক্তির কাছে কাগজের সনদ নগণ্য।
৬. সায়মন কোয়েল: সংগীত দুনিয়ার দাপুটে বিচারক
সংগীতের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘আমেরিকান আইডল’ বা ‘এক্স ফ্যাক্টর’-এর জনপ্রিয় বিচারক সায়মন কোয়েল ও-লেভেল পরীক্ষায় কোনোমতে পাস করে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই তিনি আজ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার প্রতিষ্ঠান বিএমজে রেকর্ডস থেকে বিক্রি হয়েছে ১৫০ কোটিরও বেশি রেকর্ড।
৭. বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ: বখে যাওয়া ছাত্র থেকে অস্কার মনোনয়ন
শার্লক হোমস খ্যাত অভিনেতা বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ ছাত্রজীবনের এক পর্যায়ে ড্রাগ এবং খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে ও-লেভেলে খুব খারাপ রেজাল্ট করেন। পরে তিনি উপলব্ধি করেন এবং ঘুরে দাঁড়ান। আজ তিনি গোল্ডেন গ্লোব ও অস্কার মনোনীত বিশ্বখ্যাত অভিনেতা।
৮. ধীরুভাই আম্বানি: গড়পড়তা ছাত্র থেকে শিল্পপতি
ভারতের রিলায়েন্স সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানি স্কুলজীবনে ছিলেন একেবারেই সাধারণ মানের ছাত্র। বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস তাকে এশিয়ার অন্যতম সেরা ধনীতে পরিণত করেছে।
৯. উইনস্টন চার্চিল: ফেল করা ছাত্র যখন যুদ্ধজয়ী বীর
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলে বার বার ফেল করতেন। শিক্ষকরা ভেবেছিলেন তিনি জীবনে কিছুই করতে পারবেন না। কিন্তু সেই ‘ফেল্টুস’ ছাত্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দিয়ে রক্ষা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেন।
ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়, বরং এটি একটি নতুন শুরুর সুযোগ। ওপরের এই সফল মানুষগুলো আমাদের শিখিয়ে গেছেন— পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিই একজন মানুষকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানেই হেরে যাওয়া নয়, বরং সাফল্যের বীজ বপন করার এটিই শ্রেষ্ঠ সময়।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























