ঢাকা ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন’ ব্যাখ্যা কী?

`আল্লাহ যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন’ এই কথাটির অর্থ হলো বান্দার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যা কিছু সিদ্ধান্ত নেন, তার অন্তরালে কোনো না কোনো কল্যাণ বা মঙ্গল লুকিয়ে থাকে। রবের প্রতি মানুষের এই সুধারণা তাকে মানসিক যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেয়।

দুনিয়ার জীবনে মানুষের ওপর যত ধরনের বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট বা প্রতিকূলতা নেমে আসে, তা মূলত তিনটি প্রধান কারণে ঘটে থাকে। প্রথমত, কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার অজান্তে ঘটে যাওয়া গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। আখেরাতের কঠিন পাকড়াও থেকে বাঁচাতে আল্লাহ দুনিয়াতেই সামান্য কষ্টের মাধ্যমে তা মোচন করে দেন। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় বান্দার আত্মিক ও ইমানি মর্যাদাকে উচ্চে উন্নীত করার জন্য আল্লাহ বিপদ পাঠান। আর তৃতীয়ত, এটি হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার সবর ও সহনশীলতার পরীক্ষা। বান্দা বিপদে ভেঙে পড়ে নাকি আল্লাহর ফয়সালাকে মাথা পেতে নিয়ে ধৈর্য ধরে সেই মানসিকতার পরীক্ষা নেওয়ার জন্যই কঠিন পরিস্থিতি আসে।

সুতরাং কোনো বিপদ যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন, বান্দা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সবর করতে পারে, তবে তার পেছনে কোনো না কোনো মঙ্গল নিশ্চিতভাবেই লুকিয়ে থাকে। এটা শুধু মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অবাস্তব কোনো ধারণা নয়, বরং এটিই বাস্তবতা। এই বাস্তবতার ওপর যার ইমান ও বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, সে দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খেয়েও অন্তরে সুখের অনুভূতি লাভ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে, যাদের কোনো ধর্ম বা মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস নেই। বিপদের দিনে সান্ত্বনা পাওয়ার বা দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কোনো আত্মিক জায়গা তাদের থাকে না বলে তারা সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে এবং নিজেকে ধ্বংস করার পথ বেছে নেয়।

অন্যদিকে, ধর্মে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে কম দেখা যায় মুসলমানদের মাঝে। যদিও বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা নানা দুঃখ-কষ্ট, নিপীড়ন ও যুদ্ধের মুখোমুখি। তা সত্ত্বেও ইমানি শক্তি তাদের অন্তরে পরম সুখ ও প্রশান্তি জোগায়।

তাই প্রকৃত সুখ অর্জনের জন্য বিপুল ধন-সম্পদ সঞ্চয়ের চেয়ে দ্বীনকে জীবনে ধারণ করা বহুগুণ বেশি জরুরি। সম্পদ দিয়ে হয়তো সুখে থাকার অভিনয় করা যায়, কিন্তু বাস্তব সুখ পেতে হলে আল্লাহর দরবারে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করতেই হয়।

নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মুমিনের প্রতিটি অবস্থাতেই কল্যাণ রয়েছে। তার জীবনে কোনো আনন্দ বা সুসংবাদ এলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, ফলে সে সওয়াব পায়। আবার যদি কোনো বিপদ বা ক্ষতি তাকে স্পর্শ করে, তখন সে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে, ফলে এর বিনিময়েও সে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান লাভ করে। অর্থাৎ সুখ কিংবা দুঃখ যে কোনো অবস্থাতেই মুমিনের কেবল লাভ আর লাভ।

মানুষের সমস্ত আমল ও ইবাদতের নির্দিষ্ট প্রতিদান থাকলেও শরিয়তে একটিমাত্র আমল রয়েছে, যার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন অগণিত সওয়াব বা অসীম প্রতিদান দান করবেন। আমলটি হলো সবর বা ধৈর্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে, তাদেরকে হিসাব ছাড়াই অঢেল প্রতিদান দেওয়া হবে।

এখনকার মুসলমানদের মধ্যে নামাজ আদায়কারী, পর্দা পালনকারী কিংবা হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা মানুষের অভাব না থাকলেও খাঁটি সবরকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বড় বড় পণ্ডিত বা আবেদ ব্যক্তিদের মধ্যেও অনেক সময় ধৈর্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেকেই ছোটখাটো বিষয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিজেকে ওমর (রা.) বা মুসার (আ.) মতো কঠোর মেজাজের বলে দাবি করেন, অন্যের সামান্য ভুল দেখলেই অধৈর্য হয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। অথচ নিজের ভুলত্রুটি শয়তানের প্ররোচনায় তাদের চোখে পড়ে না।

ধৈর্যের চেয়ে সুন্দর ও মহৎ গুণ আর হতে পারে না। যে ব্যক্তি সবর করতে পারে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। প্রতিদিনের সাধারণ ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি নিজের মেজাজের বিরুদ্ধে কোনো কিছু ঘটলে তা শান্তভাবে হজম করতে পারা এবং ধৈর্যের ঢোক গিলতে পারাই হলো একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহ

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

‘আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন’ ব্যাখ্যা কী?

আপডেট সময় ০১:৩৮:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

`আল্লাহ যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন’ এই কথাটির অর্থ হলো বান্দার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যা কিছু সিদ্ধান্ত নেন, তার অন্তরালে কোনো না কোনো কল্যাণ বা মঙ্গল লুকিয়ে থাকে। রবের প্রতি মানুষের এই সুধারণা তাকে মানসিক যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেয়।

দুনিয়ার জীবনে মানুষের ওপর যত ধরনের বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট বা প্রতিকূলতা নেমে আসে, তা মূলত তিনটি প্রধান কারণে ঘটে থাকে। প্রথমত, কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার অজান্তে ঘটে যাওয়া গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। আখেরাতের কঠিন পাকড়াও থেকে বাঁচাতে আল্লাহ দুনিয়াতেই সামান্য কষ্টের মাধ্যমে তা মোচন করে দেন। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় বান্দার আত্মিক ও ইমানি মর্যাদাকে উচ্চে উন্নীত করার জন্য আল্লাহ বিপদ পাঠান। আর তৃতীয়ত, এটি হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার সবর ও সহনশীলতার পরীক্ষা। বান্দা বিপদে ভেঙে পড়ে নাকি আল্লাহর ফয়সালাকে মাথা পেতে নিয়ে ধৈর্য ধরে সেই মানসিকতার পরীক্ষা নেওয়ার জন্যই কঠিন পরিস্থিতি আসে।

সুতরাং কোনো বিপদ যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন, বান্দা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সবর করতে পারে, তবে তার পেছনে কোনো না কোনো মঙ্গল নিশ্চিতভাবেই লুকিয়ে থাকে। এটা শুধু মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অবাস্তব কোনো ধারণা নয়, বরং এটিই বাস্তবতা। এই বাস্তবতার ওপর যার ইমান ও বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, সে দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খেয়েও অন্তরে সুখের অনুভূতি লাভ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে, যাদের কোনো ধর্ম বা মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস নেই। বিপদের দিনে সান্ত্বনা পাওয়ার বা দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কোনো আত্মিক জায়গা তাদের থাকে না বলে তারা সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে এবং নিজেকে ধ্বংস করার পথ বেছে নেয়।

অন্যদিকে, ধর্মে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে কম দেখা যায় মুসলমানদের মাঝে। যদিও বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা নানা দুঃখ-কষ্ট, নিপীড়ন ও যুদ্ধের মুখোমুখি। তা সত্ত্বেও ইমানি শক্তি তাদের অন্তরে পরম সুখ ও প্রশান্তি জোগায়।

তাই প্রকৃত সুখ অর্জনের জন্য বিপুল ধন-সম্পদ সঞ্চয়ের চেয়ে দ্বীনকে জীবনে ধারণ করা বহুগুণ বেশি জরুরি। সম্পদ দিয়ে হয়তো সুখে থাকার অভিনয় করা যায়, কিন্তু বাস্তব সুখ পেতে হলে আল্লাহর দরবারে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করতেই হয়।

নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মুমিনের প্রতিটি অবস্থাতেই কল্যাণ রয়েছে। তার জীবনে কোনো আনন্দ বা সুসংবাদ এলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, ফলে সে সওয়াব পায়। আবার যদি কোনো বিপদ বা ক্ষতি তাকে স্পর্শ করে, তখন সে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে, ফলে এর বিনিময়েও সে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান লাভ করে। অর্থাৎ সুখ কিংবা দুঃখ যে কোনো অবস্থাতেই মুমিনের কেবল লাভ আর লাভ।

মানুষের সমস্ত আমল ও ইবাদতের নির্দিষ্ট প্রতিদান থাকলেও শরিয়তে একটিমাত্র আমল রয়েছে, যার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন অগণিত সওয়াব বা অসীম প্রতিদান দান করবেন। আমলটি হলো সবর বা ধৈর্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে, তাদেরকে হিসাব ছাড়াই অঢেল প্রতিদান দেওয়া হবে।

এখনকার মুসলমানদের মধ্যে নামাজ আদায়কারী, পর্দা পালনকারী কিংবা হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা মানুষের অভাব না থাকলেও খাঁটি সবরকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বড় বড় পণ্ডিত বা আবেদ ব্যক্তিদের মধ্যেও অনেক সময় ধৈর্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেকেই ছোটখাটো বিষয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিজেকে ওমর (রা.) বা মুসার (আ.) মতো কঠোর মেজাজের বলে দাবি করেন, অন্যের সামান্য ভুল দেখলেই অধৈর্য হয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। অথচ নিজের ভুলত্রুটি শয়তানের প্ররোচনায় তাদের চোখে পড়ে না।

ধৈর্যের চেয়ে সুন্দর ও মহৎ গুণ আর হতে পারে না। যে ব্যক্তি সবর করতে পারে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। প্রতিদিনের সাধারণ ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি নিজের মেজাজের বিরুদ্ধে কোনো কিছু ঘটলে তা শান্তভাবে হজম করতে পারা এবং ধৈর্যের ঢোক গিলতে পারাই হলো একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহ

বাংলা৭১নিউজ/জেএস