ঢাকা ১২:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মা-বাবার খেদমত

মা-বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। শ্রেষ্ঠ উপহার। দুনিয়ার সব জিনিসের বিকল্প থাকলেও মা-বাবার কোনো বিকল্প নেই। কোনো রিপ্লেসমেন্ট নেই। তাই মা-বাবার খেদমত করতে হবে। তাদের খেদমতের জন্য অন্য যেকোনো কাজ স্থগিত করতে হবে। মা-বাবার খেদমতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রিয় নবী (সা.)-এর এক সাহাবি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলে তিনি তাঁকে বৃদ্ধ মা-বাবার খেদমত করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ নবী (সা.) তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন যে মা-বাবার খেদমত করা আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। কোরআনের বহু আয়াতের প্রথম অংশে আল্লাহর ইবাদত ও পরের অংশে মা-বাবার খেদমত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর ইবাদত এবং মা-বাবার খেদমত অনেক সুরায় একই সঙ্গে উল্লেখ করার মাধ্যমে দুটি ইবাদতেরই সর্বাধিক গুরুত্বের বিষয়টি অনুধাবন করা যায়।

বিভিন্ন আয়াতে মা-বাবার সম্মান ও মর্যাদার বর্ণনার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে কেমন আচার-ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-‘(হে নবী) তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না। বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। ববা-মার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন তবে তাদের উফ পর্যন্ত বল না এবং তাদের ধমক দিও না। বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বল।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩-২৪)। এই আয়াত দ্বারা অনেক বিষয় বোঝা যায়। মা-বাবার সর্বাধিক খেদমতের পাশাপাশি তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান করতে হবে। তাঁদের সামনে জোরে কথা বলা যাবে না। তাঁরা কষ্ট পান এমন শব্দও উচ্চারণ করা যাবে না।

হাদিসেও মা-বাবার খেদমত, সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন-‘এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! আমার সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যে কে সর্বাধিক সৌজন্যমূলক আচরণ লাভের অধিকারী তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবারও জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার বাবা।’ অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে-‘তোমার মা। তারপর তোমার মা। তারপর তোমার মা। অতঃপর তোমার বাবা। এরপর তোমার (পর্যায়ক্রমে) নিকটবর্তী ব্যক্তিরা।’ (বুখারি ও মুসলিম)।’

এই হাদিস থেকে মায়ের খেদমত বেশি করতে হবে বিষয়টি স্পষ্ট। আরেক হাদিসে এসেছে-‘হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন-রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক। জিজ্ঞেস করা হলো-ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! কে সে তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার বাবা-মার কোনো একজনকে অথবা উভয়জনকে তাঁদের বৃদ্ধ অবস্থায় পেল, কিন্তু তাঁদের খেদমত করে বেহেশত লাভ করতে পারল না।’ (মুসলিম শরিফ)। মা-বাবা যদি অমুসলিমও হন তবু তাঁদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যাবে না। হজরত আসমা বিনতে আবুবকর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, ‘কুরাইশদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের সন্ধি হয় আমার মা তখন মুশরিক অবস্থায় আমার কাছে আগমন করলেন। আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম-ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! আমার মা আমার কাছে এসেছেন; কিন্তু তিনি ইসলামের প্রতি বিরূপ ভাব পোষণকারিণী। এমতাবস্থায় আমি তাঁর সঙ্গে কি ভালো ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁর সঙ্গে উত্তম ব্যবহার কর।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

বাবা-মা যদি মারা যান তাহলে তাঁদের আপন ভাইবোনদের খেদমত করতে হবে। অর্থাৎ মা-বাবা মারা গেলে নিজের আপন খালা, মামা, চাচা, ফুপুদের খেদমত করতে হবে। এমনকি মা-বাবার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তির সর্র্বোত্তম সৎ কাজগুলোর অন্যতম হলো তার বাবার অবর্তমানে বাবার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং সদাচরণ করা।’ (মুসলিম)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মা-বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (তিরমিজি)। হজরত আবু দারদা (রা.) বললেন, ‘আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মা-বাবা হলেন বেহেশতের দরজাগুলোর মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমার ইচ্ছা হয় দরজাটিকে রক্ষা কর, ইচ্ছা হয় নষ্ট কর।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মা-বাবার খেদমত করার তাওফিক দিন। আমিন।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

মা-বাবার খেদমত

আপডেট সময় ১১:৩৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মা-বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। শ্রেষ্ঠ উপহার। দুনিয়ার সব জিনিসের বিকল্প থাকলেও মা-বাবার কোনো বিকল্প নেই। কোনো রিপ্লেসমেন্ট নেই। তাই মা-বাবার খেদমত করতে হবে। তাদের খেদমতের জন্য অন্য যেকোনো কাজ স্থগিত করতে হবে। মা-বাবার খেদমতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রিয় নবী (সা.)-এর এক সাহাবি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলে তিনি তাঁকে বৃদ্ধ মা-বাবার খেদমত করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ নবী (সা.) তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন যে মা-বাবার খেদমত করা আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। কোরআনের বহু আয়াতের প্রথম অংশে আল্লাহর ইবাদত ও পরের অংশে মা-বাবার খেদমত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর ইবাদত এবং মা-বাবার খেদমত অনেক সুরায় একই সঙ্গে উল্লেখ করার মাধ্যমে দুটি ইবাদতেরই সর্বাধিক গুরুত্বের বিষয়টি অনুধাবন করা যায়।

বিভিন্ন আয়াতে মা-বাবার সম্মান ও মর্যাদার বর্ণনার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে কেমন আচার-ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-‘(হে নবী) তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না। বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। ববা-মার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন তবে তাদের উফ পর্যন্ত বল না এবং তাদের ধমক দিও না। বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বল।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩-২৪)। এই আয়াত দ্বারা অনেক বিষয় বোঝা যায়। মা-বাবার সর্বাধিক খেদমতের পাশাপাশি তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান করতে হবে। তাঁদের সামনে জোরে কথা বলা যাবে না। তাঁরা কষ্ট পান এমন শব্দও উচ্চারণ করা যাবে না।

হাদিসেও মা-বাবার খেদমত, সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন-‘এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! আমার সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যে কে সর্বাধিক সৌজন্যমূলক আচরণ লাভের অধিকারী তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবারও জিজ্ঞেস করল তারপর কে তিনি বললেন, তোমার বাবা।’ অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে-‘তোমার মা। তারপর তোমার মা। তারপর তোমার মা। অতঃপর তোমার বাবা। এরপর তোমার (পর্যায়ক্রমে) নিকটবর্তী ব্যক্তিরা।’ (বুখারি ও মুসলিম)।’

এই হাদিস থেকে মায়ের খেদমত বেশি করতে হবে বিষয়টি স্পষ্ট। আরেক হাদিসে এসেছে-‘হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন-রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক, তার নাসিকা ধূলিমলিন হোক। জিজ্ঞেস করা হলো-ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! কে সে তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার বাবা-মার কোনো একজনকে অথবা উভয়জনকে তাঁদের বৃদ্ধ অবস্থায় পেল, কিন্তু তাঁদের খেদমত করে বেহেশত লাভ করতে পারল না।’ (মুসলিম শরিফ)। মা-বাবা যদি অমুসলিমও হন তবু তাঁদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যাবে না। হজরত আসমা বিনতে আবুবকর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, ‘কুরাইশদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের সন্ধি হয় আমার মা তখন মুশরিক অবস্থায় আমার কাছে আগমন করলেন। আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম-ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! আমার মা আমার কাছে এসেছেন; কিন্তু তিনি ইসলামের প্রতি বিরূপ ভাব পোষণকারিণী। এমতাবস্থায় আমি তাঁর সঙ্গে কি ভালো ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁর সঙ্গে উত্তম ব্যবহার কর।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

বাবা-মা যদি মারা যান তাহলে তাঁদের আপন ভাইবোনদের খেদমত করতে হবে। অর্থাৎ মা-বাবা মারা গেলে নিজের আপন খালা, মামা, চাচা, ফুপুদের খেদমত করতে হবে। এমনকি মা-বাবার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তির সর্র্বোত্তম সৎ কাজগুলোর অন্যতম হলো তার বাবার অবর্তমানে বাবার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং সদাচরণ করা।’ (মুসলিম)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মা-বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (তিরমিজি)। হজরত আবু দারদা (রা.) বললেন, ‘আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মা-বাবা হলেন বেহেশতের দরজাগুলোর মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমার ইচ্ছা হয় দরজাটিকে রক্ষা কর, ইচ্ছা হয় নষ্ট কর।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মা-বাবার খেদমত করার তাওফিক দিন। আমিন।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস