ঢাকা ১১:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে নতুন আইন : বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সহিংসতাকারীদের

ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান আরো কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির আইন প্রণেতারা। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘কাস্যর-পেয়র’ বিলটি সিনেটে অনুমোদন হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে সহিংস বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ফরাসি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বিলটির পক্ষে সিনেটে ২২৯টি ভোট পড়েছে এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১০৫ জন সদস্য। জনসমক্ষে সংঘটিত সহিংসতা ও ভাঙচুরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ বিলটি ইতিমধ্যে কার্যকর আইনে পরিণত হয়েছে, এমন নয়।

চূড়ান্ত সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এর আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে।

যৌথ দায়ের বিধান নিয়ে আলোচনা

বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সহিংস সমাবেশে ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুধু সরাসরি ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অন্য সদস্যদেরও আর্থিকভাবে দায়ী করার সুযোগ রাখা। ফলে কেউ নিজ হাতে কোনো দোকান বা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর না করলেও, আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে বিক্ষোভে উপস্থিত থাকা মাত্রই প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে—বিলটির প্রস্তাবিত ব্যবস্থা এমন নয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামাজিক সহায়তার অর্থ থেকে পাওনা আদায়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পাওনা আদায় সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোগটির সমর্থকেরা।

ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের যুক্তি

ফ্রান্সে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক আন্দোলন, শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে দোকানপাট, যানবাহন ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি, জনসাধারণের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিলটির সমর্থকদের মতে, সহিংসতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা নিরুৎসাহিত করার জন্য কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁদের যুক্তি, ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণ ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া শক্তিশালী হলে জনসম্পদ রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংরক্ষণ সহজ হবে।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ

অন্যদিকে, বিলটির বিরোধিতাকারীদের আশঙ্কা, যৌথ আর্থিক দায়ের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা না থাকলে সহিংসতায় সরাসরি জড়িত নন—এমন ব্যক্তিরাও আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে বড় কোনো বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আইনগত বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের নীতি। কোনো সমাবেশে উপস্থিত থাকা এবং সেখানে সংঘটিত অপরাধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা ও দায় প্রমাণের যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।

তাঁদের মতে, জনসম্পত্তি রক্ষা ও ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও, নতুন বিধানের প্রয়োগ যেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সিনেটে অনুমোদনের পর বিলটির পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিধানগুলোকে কার্যকর আইন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

বিলটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় সংঘটিত ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে যৌথ দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ আদায়ের সীমা এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নও আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

 

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্রান্সে নতুন আইন : বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সহিংসতাকারীদের

আপডেট সময় ১০:৫৬:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান আরো কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির আইন প্রণেতারা। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘কাস্যর-পেয়র’ বিলটি সিনেটে অনুমোদন হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে সহিংস বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ফরাসি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বিলটির পক্ষে সিনেটে ২২৯টি ভোট পড়েছে এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১০৫ জন সদস্য। জনসমক্ষে সংঘটিত সহিংসতা ও ভাঙচুরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ বিলটি ইতিমধ্যে কার্যকর আইনে পরিণত হয়েছে, এমন নয়।

চূড়ান্ত সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এর আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে।

যৌথ দায়ের বিধান নিয়ে আলোচনা

বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সহিংস সমাবেশে ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুধু সরাসরি ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অন্য সদস্যদেরও আর্থিকভাবে দায়ী করার সুযোগ রাখা। ফলে কেউ নিজ হাতে কোনো দোকান বা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর না করলেও, আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে বিক্ষোভে উপস্থিত থাকা মাত্রই প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে—বিলটির প্রস্তাবিত ব্যবস্থা এমন নয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামাজিক সহায়তার অর্থ থেকে পাওনা আদায়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পাওনা আদায় সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোগটির সমর্থকেরা।

ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের যুক্তি

ফ্রান্সে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক আন্দোলন, শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে দোকানপাট, যানবাহন ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি, জনসাধারণের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিলটির সমর্থকদের মতে, সহিংসতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা নিরুৎসাহিত করার জন্য কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁদের যুক্তি, ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণ ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া শক্তিশালী হলে জনসম্পদ রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংরক্ষণ সহজ হবে।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ

অন্যদিকে, বিলটির বিরোধিতাকারীদের আশঙ্কা, যৌথ আর্থিক দায়ের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা না থাকলে সহিংসতায় সরাসরি জড়িত নন—এমন ব্যক্তিরাও আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে বড় কোনো বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আইনগত বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের নীতি। কোনো সমাবেশে উপস্থিত থাকা এবং সেখানে সংঘটিত অপরাধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা ও দায় প্রমাণের যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।

তাঁদের মতে, জনসম্পত্তি রক্ষা ও ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও, নতুন বিধানের প্রয়োগ যেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সিনেটে অনুমোদনের পর বিলটির পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিধানগুলোকে কার্যকর আইন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

বিলটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় সংঘটিত ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে যৌথ দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ আদায়ের সীমা এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নও আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ