২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল ইন্টারনেটের থ্রি-জি ও ফোরজি সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও প্রতিমন্ত্রী পলক।
রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানান বিটিআরসির উপপরিচালক মাহদী আহমদ।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি জানতে পারেন, বিটিআরসিতে পূর্বনির্ধারিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভার একটি আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা থাকায় তিনি ওইদিন অফিসে উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি নিজে সভায় অংশ নেননি; তার তৈরি করা নথিপত্র তৎকালীন মহাপরিচালককে সরবরাহ করেছিলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে মাহদী আহমদ এ জবানবন্দি দেন। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার কার্যক্রম সোমবার (১২ অক্টোবর) পরবর্তী দিন পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও আবদুল্লাহ আল মামুন। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ।
১৫ জুলাই পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সীমিত
জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ বলেন, ১৪ জুলাই দিবাগত রাত অর্থাৎ ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার পর বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন। ওই সময় মহাপরিচালক তাকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন আহম্মেদকে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পর মহাপরিচালক মোবাইল অপারেটরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশনা দেন। পরে ১৫ জুলাই সকাল ৯টার দিকে অফিসে গিয়ে মাহদী আহমদ জানতে পারেন, আগের দিন যেসব এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সীমিত করা হয়েছিল, সেসব এলাকায় সকাল ৮টার দিকে আবার সেবা চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশনা বিটিআরসির চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছানোর পর মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু করেন। বন্ধ ও চালুর বিষয়ে পরে নথিতে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয়।
১৬ জুলাই ৫৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেটওয়ার্ক বন্ধ
মাহদী আহমদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৬ জুলাই দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেন। চেয়ারম্যান তা মহাপরিচালককে জানান এবং মহাপরিচালক মোবাইল অপারেটরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়।
সাক্ষী জানান, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি এ নির্দেশনার বিষয়ে জানতে পারেন। ওইদিন বিটিআরসিতে একটি পূর্বনির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের সভা ছিল। সভায় সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলক অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
মাহদী আহমদ বলেন, সভার একটি আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা থাকায় তিনি অফিসে ছিলেন। তবে তিনি সরাসরি সভায় অংশ নেননি। তার তৈরি করা নথিপত্র মহাপরিচালককে দিয়েছিলেন। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়ে নথিতে পরে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
২৫ জুলাই ভোল্টে সেবা চালুর নির্দেশ
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থ্রি-জি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়টি মোবাইল অপারেটরগুলো বিটিআরসিকে জানায়। পরে বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যান বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী পলককে অবহিত করেন।
এরপর ২৫ জুলাই পলকের নির্দেশে মোবাইল অপারেটরগুলোকে ফোরজি ভয়েস বা ভোল্টে (VoLTE) সেবা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও পরে নথিতে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল বলে জানান মাহদী আহমদ।
২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট চালুর নির্দেশ
মাহদী আহমদ জানান, ২৮ জুলাই আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলকের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, এমএফএস এবং মোবাইল অপারেটরগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষী মির্জা কামাল আহমেদ / ‘ইন্টারনেট বন্ধ করতে কত সময় লাগতে পারে মন্ত্রী পলক আমাকে জিজ্ঞেস করেন’
ওই সভায় পলক তৎকালীন এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে চারটি মোবাইল অপারেটরের থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার বন্ধ রাখার নির্দেশনা বিটিআরসিকে দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষী আরও জানান, ৩১ জুলাই পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার চালুর নির্দেশ দেন। এ সিদ্ধান্তের বিষয়েও নথিতে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।
মাহদী আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট ২৮ জুলাই চালু করা হয়। অন্যদিকে, ক্যাবল ইন্টারনেট ২৩ জুলাই সাময়িকভাবে চালু করা হয়েছিল এবং ৩১ জুলাই তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়।
জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ বলেন, দেশজুড়ে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ এনটিএমসি দিয়েছিল—এমন বক্তব্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেন না। তার দায়িত্ব মূলত মোবাইল অপারেটরগুলোর পরিচালন ও কারিগরি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করার বিষয়ে তাঁর সরাসরি জানা নেই। তবে ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে তিনি জানেন এবং ২৮ জুলাইয়ের সভার মাধ্যমে এ বিষয়ে অবগত হন।
মাহদী আহমদ আরও জানান, ২০২৪ সালের ১৫, ১৬, ২৫, ২৮ ও ৩১ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, সীমিতকরণ ও চালুর বিষয়ে তৈরি বিভিন্ন নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত নথিতে তিনি নিজের স্বাক্ষর শনাক্ত করেন। একই সঙ্গে সহকারী পরিচালক ইয়াসমিন সুলতানা, পরিচালক গোলাম রাজ্জাক, তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান এবং তৎকালীন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন আহম্মেদের স্বাক্ষরও শনাক্ত করেন তিনি।
মাহদী আহমদের জবানবন্দিতে উঠে আসা এসব তথ্য ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোবাইল ইন্টারনেট সীমিত ও বন্ধ করা এবং পরবর্তী সময়ে তা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস






















