ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করায় ভোটারদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
শহরের অলিগলি, হাট-বাজার ও পাড়া-মহল্লায় আলোচনার বিষয় এখন নির্বাচন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, মিছিল ও গণসংযোগে সরব হয়ে উঠেছে পুরো নির্বাচনী এলাকা। মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে রঙিন ও সাদা-কালো পোস্টার, আর মাইকিং ও উঠান বৈঠকে জমে উঠেছে প্রচারণা।
এদিকে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
প্রার্থীরা দিন-রাত এক করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, রাস্তাঘাট সংস্কার, কৃষি ও নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সাংসদ থাকা অবস্থায় বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শুরু করা উন্নয়নমূলক কাজ শেষ করার বিষয়টিও উঠে আসছে প্রচারণায়।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি সদর উপজেলা ও পৌরসভাকেন্দ্রিক হওয়ায় এ নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। চায়ের দোকান, বাজার ও জনসমাগমস্থলে চলছে প্রার্থীদের যোগ্যতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এখন সেখানে আলোচনার প্রধান বিষয়—কে হচ্ছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নতুন অভিভাবক।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
শূন্য ঘোষিত আসনটিতে উপনির্বাচন ঘিরে শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই উপনির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে রয়েছেন পাঁচজন প্রার্থী।
আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম, বটগাছ প্রতীকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মো. আবদুল আলীম নিজামী এবং ডাব প্রতীকে বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।
প্রতীক বরাদ্দের পরপরই প্রার্থীরা নামেন ভোট প্রার্থনায়। সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির নেতা মির্জা ফয়সল আমিন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটারদের কাছে এলাকায় অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ শেষ করা ও পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন এবং অন্যান্য প্রার্থীও নতুন নেতৃত্ব ও সুশাসনের অঙ্গীকার নিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
ঠাকুরগাঁও সদরের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের প্রচার দেখে তারা আনন্দিত। এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রেখে যিনি উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সততার সঙ্গে ভূমিকা রাখবেন, তাকেই বেছে নিতে চান ভোটাররা।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সমাজসেবক রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং এয়ারপোর্ট পুনরায় চালুর মতো কিছু যুগান্তকারী মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে গেছেন। প্রকল্পগুলো এখন বাস্তবায়নের পথে। আমরা চাই এমন একজন যোগ্য অভিভাবক নির্বাচিত হয়ে আসুক, যিনি চলমান উন্নয়নের ধারাকে বেগবান রাখবেন এবং জাতীয় সংসদে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর হাসান তানু বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। এখানে সব ধর্ম ও মতের মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেবে।
শহরের তরুণ বাসিন্দা রাশেদুল হাসান তন্ময় বলেন, কয়েক দিন ধরে পুরো ঠাকুরগাঁও যেন এক আনন্দের শহর। অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় মোড়—সবখানে নির্বাচনী প্রতীকের ব্যানার-পোস্টার। সন্ধ্যার পর রিকশা আর মাইকের গানের সঙ্গে প্রচারণা চলছে। চায়ের দোকানগুলোতেও গভীর রাত পর্যন্ত মুখর আলোচনা। এক মনোরম বৈচিত্র্যময় নির্বাচনী উৎসবে মেতেছে ঠাকুরগাঁও।
এদিকে, উপনির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে। মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮। মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ইভিএম অথবা ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হবে। প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চলবে আগামী ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ হবে ২৯ অক্টোবর।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

























