ঢাকা ০১:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরিয়ানরা এত নুডলস খায় কেন?

বর্তমানে কোরিয়ান সংস্কৃতি আমাদের দেশেও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে কে-ড্রামা, সিনেমার সুবাদে কোরিয়ার সংস্কৃতি পরিচিত হয়ে উঠেছে। কোরিয়ান নাটক বা সিনেমা দেখলে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে গরম ধোঁয়া ওঠা নুডলসের বাটি, পাশে বসে চপস্টিক দিয়ে দ্রুত নুডলস খাচ্ছেন কেউ। কখনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো বাড়িতে, আবার কখনো বন্ধুদের আড্ডায়। কোরিয়ানদের খাবারের তালিকায় নুডলস বা ‘রামিয়ন বা রামেন’-এর উপস্থিতি এতটাই পরিচিত যে বিশ্বজুড়েই এটি এখন কোরিয়ান সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোরিয়ানরা এত নুডলস খান কেন?

এর উত্তর শুধু স্বাদের মধ্যে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, অর্থনীতি, জীবনযাপন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির দীর্ঘ সম্পর্ক।

যুদ্ধের পর খাবারের সংকট থেকেই জনপ্রিয়তা

কোরিয়ায় আজ যে ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা রামেন এত জনপ্রিয়, তার পেছনে রয়েছে দেশটির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস। কোরিয়ান যুদ্ধের পর দেশটিতে খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্য ছিল বড় সমস্যা। তখন কম খরচে পেট ভরানোর মতো খাবারের প্রয়োজন ছিল।

এই সময় বিদেশি খাবারের প্রভাবও কোরিয়ার খাদ্যাভ্যাসে আসে। সস্তা ও সহজে সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবারের চাহিদা বাড়তে থাকে। ১৯৬০-এর দশকে কোরিয়ায় ইনস্ট্যান্ট নুডলস দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অল্প সময়ে রান্না করা যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে পেট ভরে এই দুই কারণ সাধারণ মানুষের কাছে রামিয়নকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

রান্না করা সহজ, খরচও তুলনামূলক কম

রামিয়নের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো এর সুবিধা। একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে নুডলস ও মসলা দিয়ে কয়েক মিনিট রান্না করলেই খাবার তৈরি। আলাদা করে বাজার করা, দীর্ঘ সময় রান্না করা কিংবা অনেক উপকরণ প্রয়োজন হয় না। কোরিয়ার ব্যস্ত জীবনেও এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একা থাকা মানুষ, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও গভীর রাতে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রামেন সহজ খাবারের একটি জনপ্রিয় বিকল্প। আর শুধু প্যাকেটের নুডলস খেয়েই থেমে থাকতে হয় না। অনেকে এতে ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সবজি, মাংস, সামুদ্রিক খাবার বা পনির যোগ করেন। ফলে একই রামিয়ন বিভিন্নভাবে তৈরি করা যায়।

শুধু খাবার নয়, কোরিয়ান সংস্কৃতির অংশ

কোরিয়ায় নুডলসের জনপ্রিয়তা শুধু ইনস্ট্যান্ট খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধরনের নুডলস দেশটির ঐতিহ্যবাহী খাবারেরও অংশ। ঠান্ডা নুডলস, গমের নুডলসসহ বিভিন্ন পদ কোরিয়ান খাবারের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। তবে রামেনকে আলাদা করে জনপ্রিয় করেছে এর সহজলভ্যতা ও আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। দোকান, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বাড়ির রান্নাঘর সব জায়গাতেই এর উপস্থিতি দেখা যায়।

কোরিয়ান নাটক-সিনেমায় নুডলসের প্রভাব

বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান নুডলসের জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কে-ড্রামা এবং কে-পপ সংস্কৃতি। নাটক ও সিনেমায় অভিনেতাদের নুডলস খাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের কাছে খুব পরিচিত। ফলে কোরিয়ান খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে।

বিশেষ করে কোরিয়ান রামেন এখন শুধু কোরিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও কোরিয়ান ইনস্ট্যান্ট নুডলসের চাহিদা বেড়েছে। ঝাল স্বাদ, আলাদা মসলা এবং বিভিন্ন ধরনের ফ্লেভার একে অন্য দেশের ইনস্ট্যান্ট নুডলস থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

কেন এত বেশি খাওয়া হয়?

কোরিয়ানদের নুডলস খাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে ঐতিহাসিক খাদ্যসংকট, সাশ্রয়ী দাম, সহজ রান্না, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং স্বাদের বৈচিত্র্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোরিয়ান জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বজোড়া প্রভাব।তবে রামেন যতই জনপ্রিয় হোক, প্রতিদিনের প্রধান খাবার হিসেবে শুধু ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। অনেক প্যাকেট নুডলসে লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই কোরিয়ানদের নুডলসপ্রেমকে বুঝতে হলে এটিকে শুধু খাবারের অভ্যাস হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশটির ইতিহাস, অর্থনীতি, জীবনযাপন এবং সংস্কৃতিরও একটি গল্প।

একসময় যে খাবার ছিল কম খরচে পেট ভরানোর সহজ উপায়, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে কোরিয়ান সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক। আর কে-ড্রামা ও কোরিয়ান জনপ্রিয় সংস্কৃতির হাত ধরে সেই রামিয়ন এখন কোরিয়ার সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের কোটি মানুষের খাবারের টেবিলে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

কোরিয়ানরা এত নুডলস খায় কেন?

আপডেট সময় ১১:৫৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বর্তমানে কোরিয়ান সংস্কৃতি আমাদের দেশেও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে কে-ড্রামা, সিনেমার সুবাদে কোরিয়ার সংস্কৃতি পরিচিত হয়ে উঠেছে। কোরিয়ান নাটক বা সিনেমা দেখলে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে গরম ধোঁয়া ওঠা নুডলসের বাটি, পাশে বসে চপস্টিক দিয়ে দ্রুত নুডলস খাচ্ছেন কেউ। কখনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো বাড়িতে, আবার কখনো বন্ধুদের আড্ডায়। কোরিয়ানদের খাবারের তালিকায় নুডলস বা ‘রামিয়ন বা রামেন’-এর উপস্থিতি এতটাই পরিচিত যে বিশ্বজুড়েই এটি এখন কোরিয়ান সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোরিয়ানরা এত নুডলস খান কেন?

এর উত্তর শুধু স্বাদের মধ্যে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, অর্থনীতি, জীবনযাপন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির দীর্ঘ সম্পর্ক।

যুদ্ধের পর খাবারের সংকট থেকেই জনপ্রিয়তা

কোরিয়ায় আজ যে ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা রামেন এত জনপ্রিয়, তার পেছনে রয়েছে দেশটির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস। কোরিয়ান যুদ্ধের পর দেশটিতে খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্য ছিল বড় সমস্যা। তখন কম খরচে পেট ভরানোর মতো খাবারের প্রয়োজন ছিল।

এই সময় বিদেশি খাবারের প্রভাবও কোরিয়ার খাদ্যাভ্যাসে আসে। সস্তা ও সহজে সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবারের চাহিদা বাড়তে থাকে। ১৯৬০-এর দশকে কোরিয়ায় ইনস্ট্যান্ট নুডলস দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অল্প সময়ে রান্না করা যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে পেট ভরে এই দুই কারণ সাধারণ মানুষের কাছে রামিয়নকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

রান্না করা সহজ, খরচও তুলনামূলক কম

রামিয়নের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো এর সুবিধা। একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে নুডলস ও মসলা দিয়ে কয়েক মিনিট রান্না করলেই খাবার তৈরি। আলাদা করে বাজার করা, দীর্ঘ সময় রান্না করা কিংবা অনেক উপকরণ প্রয়োজন হয় না। কোরিয়ার ব্যস্ত জীবনেও এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একা থাকা মানুষ, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও গভীর রাতে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রামেন সহজ খাবারের একটি জনপ্রিয় বিকল্প। আর শুধু প্যাকেটের নুডলস খেয়েই থেমে থাকতে হয় না। অনেকে এতে ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সবজি, মাংস, সামুদ্রিক খাবার বা পনির যোগ করেন। ফলে একই রামিয়ন বিভিন্নভাবে তৈরি করা যায়।

শুধু খাবার নয়, কোরিয়ান সংস্কৃতির অংশ

কোরিয়ায় নুডলসের জনপ্রিয়তা শুধু ইনস্ট্যান্ট খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধরনের নুডলস দেশটির ঐতিহ্যবাহী খাবারেরও অংশ। ঠান্ডা নুডলস, গমের নুডলসসহ বিভিন্ন পদ কোরিয়ান খাবারের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। তবে রামেনকে আলাদা করে জনপ্রিয় করেছে এর সহজলভ্যতা ও আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। দোকান, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বাড়ির রান্নাঘর সব জায়গাতেই এর উপস্থিতি দেখা যায়।

কোরিয়ান নাটক-সিনেমায় নুডলসের প্রভাব

বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান নুডলসের জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কে-ড্রামা এবং কে-পপ সংস্কৃতি। নাটক ও সিনেমায় অভিনেতাদের নুডলস খাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের কাছে খুব পরিচিত। ফলে কোরিয়ান খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে।

বিশেষ করে কোরিয়ান রামেন এখন শুধু কোরিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও কোরিয়ান ইনস্ট্যান্ট নুডলসের চাহিদা বেড়েছে। ঝাল স্বাদ, আলাদা মসলা এবং বিভিন্ন ধরনের ফ্লেভার একে অন্য দেশের ইনস্ট্যান্ট নুডলস থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

কেন এত বেশি খাওয়া হয়?

কোরিয়ানদের নুডলস খাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে ঐতিহাসিক খাদ্যসংকট, সাশ্রয়ী দাম, সহজ রান্না, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং স্বাদের বৈচিত্র্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোরিয়ান জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বজোড়া প্রভাব।তবে রামেন যতই জনপ্রিয় হোক, প্রতিদিনের প্রধান খাবার হিসেবে শুধু ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। অনেক প্যাকেট নুডলসে লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই কোরিয়ানদের নুডলসপ্রেমকে বুঝতে হলে এটিকে শুধু খাবারের অভ্যাস হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশটির ইতিহাস, অর্থনীতি, জীবনযাপন এবং সংস্কৃতিরও একটি গল্প।

একসময় যে খাবার ছিল কম খরচে পেট ভরানোর সহজ উপায়, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে কোরিয়ান সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক। আর কে-ড্রামা ও কোরিয়ান জনপ্রিয় সংস্কৃতির হাত ধরে সেই রামিয়ন এখন কোরিয়ার সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের কোটি মানুষের খাবারের টেবিলে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস