ছোটবেলায় কেউ জিজ্ঞেস করলে খুব সহজেই বলে দেওয়া যেত-বড় হয়ে কী হতে চাই। কেউ ডাক্তার হতে চাইত, কেউ শিক্ষক, কেউ শিল্পী, কেউ আবার দূরদেশে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখত। তখন স্বপ্নের সামনে বয়সের হিসাব ছিল না, ছিল না সংসারের অঙ্ক। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নগুলোর জায়গা দখল করে নেয় বাস্তবতার নানা হিসাব।
বিয়ে, চাকরি, সংসার, সন্তান, পরিবারের দায়িত্ব-একটার পর একটা দায়িত্ব এসে জীবনের ব্যস্ততা বাড়ায়। নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করা হয়ে ওঠে কঠিন। একসময় হয়তো মনে হয়, ‘এখন আর নতুন করে কী স্বপ্ন দেখব?’ অথচ সত্যিটা হলো, স্বপ্ন দেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।
দায়িত্বের ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ‘আমি’
জীবনের একটি পর্যায়ে এসে অনেকেই নিজের পরিচয়কে শুধু দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। কারও পরিচয় হয়ে যায় কারোও স্ত্রী, কারো স্বামী, কারো মা-বাবা, আবার কারো পরিচয় শুধুই চাকরি বা সংসারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
সারাদিন অন্যের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে নিজের ইচ্ছার কথা মনে রাখার সময়ই যেন থাকে না। কোন বইটি পড়তে চেয়েছিলেন, কোন জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন, কোন কাজটি শিখতে চেয়েছিলেন-ছোট ছোট সেই ইচ্ছাগুলো ধীরে ধীরে জমতে থাকে মনের এক কোণে। কখনো কখনো নিজের কাছেই প্রশ্ন আসে-‘আমি আসলে কী চাই?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াও এক ধরনের নতুন যাত্রা।
স্বপ্ন মানেই বড় কিছু পাওয়া নয়
স্বপ্ন বলতেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে বড় চাকরি, বাড়ি, গাড়ি কিংবা বিদেশভ্রমণের ছবি। কিন্তু স্বপ্ন সবসময় এত বড় হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
কারো স্বপ্ন হতে পারে নিজের লেখা একটি বই প্রকাশ করা। কারো ইচ্ছে হতে পারে ছবি আঁকা শেখা। কেউ হয়তো অনেক বছর পর আবার গান গাইতে চান। কেউ একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান। আবার কারো কাছে স্বপ্ন মানে হতে পারে নিজের জন্য সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা সময় বের করে পছন্দের কাজটি করা। অর্থাৎ স্বপ্নের মূল্য তার আকারে নয়, স্বপ্নটি আপনাকে কতটা আনন্দ দেয়, তার মধ্যে।
বয়স বাড়লে স্বপ্নের প্রয়োজন আরও বেশি
তরুণ বয়সে সামনে অনেক সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও নিজের সম্পর্কে বোঝাপড়াও বাড়ে। ফলে নতুন কোনো স্বপ্ন দেখার অর্থ অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য নতুন একটি অর্থ খুঁজে নেওয়া।
৪০, ৫০ কিংবা ৬০ বছর বয়সে কেউ নতুন কিছু শিখতে চাইলে সেটি দেরি হয়ে যায় না। বরং এতদিনের অভিজ্ঞতা সেই নতুন পথকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে। জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলেই যে গল্প শেষ হয়ে যায়, তা নয়। অনেক সময় সেখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি।
অন্যের সঙ্গে নিজের সময়ের তুলনা নয়
নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হতে পারে অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা। কেউ ২৫ বছর বয়সে সফল হয়েছে, কেউ ৩০ বছর বয়সে নিজের ব্যবসা শুরু করেছে, কেউ ৪০ বছর বয়সে নতুন পেশায় গিয়েছে, তাই বলে আপনার সময়ও একই হতে হবে, এমন নয়।
প্রত্যেক মানুষের জীবনের পরিস্থিতি আলাদা। কারো হয়তো পরিবারকে সময় দিতে হয়েছে, কারো আর্থিক দায়িত্ব ছিল, কারো নিজের সুযোগ তৈরি হতে সময় লেগেছে। তাই ‘আমার বয়স তো হয়ে গেছে’-এই কথাটি দিয়ে নিজের ইচ্ছাকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নিজের জন্য একটু জায়গা রাখুন
সংসার থাকবে, দায়িত্ব থাকবে, প্রিয় মানুষের প্রয়োজনও থাকবে। কিন্তু সেই সবকিছুর মাঝেও নিজের জন্য সামান্য জায়গা রাখা জরুরি। কারণ নিজের ইচ্ছাগুলোকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে করতে একসময় মানুষ নিজের কাছ থেকেই দূরে সরে যেতে পারে।
প্রতিদিন হয়তো এক ঘণ্টা সম্ভব নয়। কিন্তু ১৫ মিনিটও হতে পারে শুরু। যে বইটি পড়তে চেয়েছিলেন, সেটি খুলুন।
যে ভাষাটি শিখতে চেয়েছিলেন, তার প্রথম শব্দটি শিখুন। যে জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন, তার পরিকল্পনা করুন। যে কাজটি ভালো লাগে, সেটির জন্য ছোট একটি সময় বের করুন। স্বপ্ন পূরণের জন্য সবসময় বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন হয় না। অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকে।
কারণ জীবন শুধু দায়িত্বের নাম নয়
বিয়ে, চাকরি, সংসার, সন্তান-সবই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এগুলোর বাইরে একজন মানুষ হিসেবে আপনারও কিছু ইচ্ছে, ভালো লাগা ও অপূর্ণতা আছে। সেই ইচ্ছাগুলোর কথা মনে রাখা স্বার্থপরতা নয়। জীবন কতটা দীর্ঘ হবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু যতদিন জীবন আছে, ততদিন নতুন কিছু চাওয়ার, শেখার, চেষ্টা করার এবং ভালো লাগার অধিকারও আছে।
তাই বয়সের ক্যালেন্ডার দেখে স্বপ্নকে বিদায় দেবেন না। ২০ বছর বয়সে যে স্বপ্ন দেখা যায়, ৪০ বছরেও তা দেখা যায়, ৫০ বছরেও নতুন স্বপ্ন জন্ম নিতে পারে, এমনকি ৬০ পেরিয়েও শুরু হতে পারে জীবনের নতুন অধ্যায়।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, মিডিয়াম
বাংলা৭১নিউজ/জেএস



























