ঢাকা ০৭:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সর্বজনীন পেনশন স্কিমে মুনাফার হার বাড়ল Logo ইরানে সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ Logo আগস্টে এপিবিএনের অভিযানে গ্রেপ্তার ৮০০, উদ্ধার সাড়ে ৯ কোটি টাকার স্বর্ণ Logo হুতিদের নিয়ন্ত্রণে মরিয়া সৌদি, এবার ইরানের সহায়তা চাইল চীন Logo রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo রুশ তেল কেনায় নতুন মার্কিন শুল্ক, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে ভারতের সতর্কতা Logo প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার সুযোগ তৈরি সরকারের অঙ্গীকার: গণপূর্তমন্ত্রী Logo প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের একান্ত সচিব হলেন সাইফুল ইসলাম জয় Logo আউশে বদলে যাচ্ছে রংপুরের কৃষিচিত্র Logo ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৪৮৪

আউশে বদলে যাচ্ছে রংপুরের কৃষিচিত্র

পুরনো ধান ফুরিয়ে গেছে, নতুন ধান ঘরে উঠতে এখনো বাকি। এই কঠিন সময়ে মাঠে ‘মঙ্গার ধান’ নামে পরিচিত স্বল্পমেয়াদি আগাম ধানের চারায় দেখা দিয়েছে শীষ। বুধবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের চন্দনের হাট এলাকার একটি ক্ষেতে। ছবি: কালের কণ্ঠ

বোরো ধান ঘরে তোলার পর আমন চাষ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত একসময় রংপুরের কৃষিতে চলত স্থবিরতা। জমির একটি বড় অংশ পড়ে থাকত।

কাজের অপেক্ষায় থাকতে হতো কৃষিশ্রমিকদের। অনেক পরিবারকে পার করতে হতো অভাব-অনটনের সময়। সেই বাস্তবতার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ‘মঙ্গা’ শব্দটি।

সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়টাও আর পুরোপুরি ফাঁকা থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদে জমি যেমন রয়েছে উৎপাদনের আওতায়, তেমনি বাড়ছে কৃষিকাজের সুযোগ।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিস জানিয়েছে, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলার কৃষিতে আউশ এখন বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। কৃষকের আগ্রহ ও চাষের বিস্তারে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ হয়েছিল ২৪ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন। উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে আবাদ হয়েছিল ৪০ হাজার ৬১৮ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টর জমিতে ফলন ছিল ৩ দশমিক ০৪ মেট্রিক টন।

ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ২৩ হাজার ৪৭৮ মেট্রিকটন।

২০১৯-২০ অর্থ বছরে ছিল ৪৭ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমি। প্রতি হেক্টরে ফলন হয়েছিল ৩ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। সেই হিসেবে ১ লাখ ৫০ হাজার ১৬ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৬০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমি। ওই বছর ৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও মোট উৎপাদন ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ সালে ৬২ হাজার ৯০ হেক্টর, ২০২২-২৩ সালে ৬৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ সালে ৬১ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়, উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৮০ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ১৬৩ হেক্টরে। একই সময় হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ০২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে মোট উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।

অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ প্রায় ৬০ হাজার হেক্টরের ওপরেই রয়েছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে আউশের আবাদ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর। আবাদ বাড়ার পাশাপাশি ফলনেও এসেছে বড় উন্নতি।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ব্রি-৪৮, ব্রি ৯৮, বিনা-২১,ধানী গোল্ড, গোল্ডেন-১, জনকরাজসহ অন্তত ৩০ ধরনের আউশ ধান চাষ হচ্ছে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায়।

সরেজমিন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে এক সময় ‘মঙ্গা’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কাজের অভাব ও খাদ্যসংকটের দীর্ঘ ইতিহাস। বোরো ধান কাটার পর আমন চাষ শুরুর আগ পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে কাজ কমে যেত। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো তখন আয়-রোজগারের সংকটে পড়ত।

তবে, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আউশসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মৌসুমি ফসলের আবাদ বাড়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে জমি চাষের আওতায় আসছে। ফলে কৃষকের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

গংগাচড়ার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের এখানে ধুধু চর। কখনো শুকনো মৌসুম, কখনো পানিতে ডুবে থাকতে হয়। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে কাজের সংকট ছিল। এখন আউশসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বেড়েছে। ফলে ওই সময়টাতেও জমিতে কৃষিকাজ হচ্ছে, এখন সময়টা অনেক ভালো।’

আব্দুর রহিম বলেন, কয়েক বছর আগেও কাজের অভাব ছিল, আমাদের মঙ্গা এলাকার লোক বলত। এখন মানুষের হাতে কাজ আসছে। কোনো সময়ই আমরা বসে থাকি না। আউশ অনেকটাই আমাদের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বড় বাড়িগ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘বোরো কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আউশ (বড় ধান) চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে ফাও (বাড়তি) আরেকটা ফসল পাওয়া যায়। পরিশ্রম কম, খরচ কম। মোটামুটি লাভও হচ্ছে। এতে জমি ফেলে না রেখে আবাদ করায় মানুষের যে অভাব ছিল সেটা এখন আর নেই।’

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আউশ ধানের আবাদ বেড়েছে, কৃষক অনেক বেশি লাভবান না হলেও আগ্রহটা বেড়েছে। তারা জানান, এক একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে বীজ, বীজতলা ও সার, চারা, সেচ, কিটনাশক মজুরি, মাড়াইসহ মোট খরচ প্রায় ৫২ হাজার ৫১২ টাকা। এক একরে ধানের উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৩০ কেজি। খড়ের মূল্য বাদ দিলে ধানের নিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৯১২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৯ টাকা।

কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি ধান ৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলে একরপ্রতি মুনাফা থাকে প্রায় চার হাজার ৭০০ টাকা।

কৃষকরা জানান, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আবার ধান কাটার মৌসুমে বাজারদর কমে গেলে লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ধানের দাম ভালো থাকলে কৃষক এই ধান চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবে।

কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আউশের আবাদ আরো বাড়াতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা এবং বাজারে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে আউশ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরো বাড়বে। এতে এক সময়ের মঙ্গা যেভাবে দূর হয়েছে, ঠিক একইভাবে আরো আর্থিক সচ্ছলতা বাড়বে এই অঞ্চলের কৃষকদের।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তনের একটি দিক হলো বছরের মাঝের সময়টুকুও এখন আর আগের মতো পুরোপুরি অনাবাদি থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সেই সময়টাকে উৎপাদনের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে জমির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি কৃষিকাজের পরিধিও হয়েছে বিস্তৃত।

অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, আউশ স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে এই ধান চাষ হয়। উন্নত জাত নির্বাচন, সময়মতো চাষ, সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন আরো বাড়াতে কৃষকদের সাবির্ক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে মুনাফার হার বাড়ল

আউশে বদলে যাচ্ছে রংপুরের কৃষিচিত্র

আপডেট সময় ০৬:৩৬:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুরনো ধান ফুরিয়ে গেছে, নতুন ধান ঘরে উঠতে এখনো বাকি। এই কঠিন সময়ে মাঠে ‘মঙ্গার ধান’ নামে পরিচিত স্বল্পমেয়াদি আগাম ধানের চারায় দেখা দিয়েছে শীষ। বুধবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের চন্দনের হাট এলাকার একটি ক্ষেতে। ছবি: কালের কণ্ঠ

বোরো ধান ঘরে তোলার পর আমন চাষ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত একসময় রংপুরের কৃষিতে চলত স্থবিরতা। জমির একটি বড় অংশ পড়ে থাকত।

কাজের অপেক্ষায় থাকতে হতো কৃষিশ্রমিকদের। অনেক পরিবারকে পার করতে হতো অভাব-অনটনের সময়। সেই বাস্তবতার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ‘মঙ্গা’ শব্দটি।

সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়টাও আর পুরোপুরি ফাঁকা থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদে জমি যেমন রয়েছে উৎপাদনের আওতায়, তেমনি বাড়ছে কৃষিকাজের সুযোগ।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিস জানিয়েছে, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলার কৃষিতে আউশ এখন বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। কৃষকের আগ্রহ ও চাষের বিস্তারে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ হয়েছিল ২৪ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন। উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে আবাদ হয়েছিল ৪০ হাজার ৬১৮ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টর জমিতে ফলন ছিল ৩ দশমিক ০৪ মেট্রিক টন।

ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ২৩ হাজার ৪৭৮ মেট্রিকটন।

২০১৯-২০ অর্থ বছরে ছিল ৪৭ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমি। প্রতি হেক্টরে ফলন হয়েছিল ৩ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। সেই হিসেবে ১ লাখ ৫০ হাজার ১৬ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৬০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমি। ওই বছর ৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও মোট উৎপাদন ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ সালে ৬২ হাজার ৯০ হেক্টর, ২০২২-২৩ সালে ৬৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ সালে ৬১ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়, উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৮০ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ১৬৩ হেক্টরে। একই সময় হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ০২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে মোট উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।

অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ প্রায় ৬০ হাজার হেক্টরের ওপরেই রয়েছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে আউশের আবাদ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর। আবাদ বাড়ার পাশাপাশি ফলনেও এসেছে বড় উন্নতি।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ব্রি-৪৮, ব্রি ৯৮, বিনা-২১,ধানী গোল্ড, গোল্ডেন-১, জনকরাজসহ অন্তত ৩০ ধরনের আউশ ধান চাষ হচ্ছে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায়।

সরেজমিন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে এক সময় ‘মঙ্গা’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কাজের অভাব ও খাদ্যসংকটের দীর্ঘ ইতিহাস। বোরো ধান কাটার পর আমন চাষ শুরুর আগ পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে কাজ কমে যেত। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো তখন আয়-রোজগারের সংকটে পড়ত।

তবে, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আউশসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মৌসুমি ফসলের আবাদ বাড়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে জমি চাষের আওতায় আসছে। ফলে কৃষকের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

গংগাচড়ার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের এখানে ধুধু চর। কখনো শুকনো মৌসুম, কখনো পানিতে ডুবে থাকতে হয়। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে কাজের সংকট ছিল। এখন আউশসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বেড়েছে। ফলে ওই সময়টাতেও জমিতে কৃষিকাজ হচ্ছে, এখন সময়টা অনেক ভালো।’

আব্দুর রহিম বলেন, কয়েক বছর আগেও কাজের অভাব ছিল, আমাদের মঙ্গা এলাকার লোক বলত। এখন মানুষের হাতে কাজ আসছে। কোনো সময়ই আমরা বসে থাকি না। আউশ অনেকটাই আমাদের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বড় বাড়িগ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘বোরো কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আউশ (বড় ধান) চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে ফাও (বাড়তি) আরেকটা ফসল পাওয়া যায়। পরিশ্রম কম, খরচ কম। মোটামুটি লাভও হচ্ছে। এতে জমি ফেলে না রেখে আবাদ করায় মানুষের যে অভাব ছিল সেটা এখন আর নেই।’

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আউশ ধানের আবাদ বেড়েছে, কৃষক অনেক বেশি লাভবান না হলেও আগ্রহটা বেড়েছে। তারা জানান, এক একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে বীজ, বীজতলা ও সার, চারা, সেচ, কিটনাশক মজুরি, মাড়াইসহ মোট খরচ প্রায় ৫২ হাজার ৫১২ টাকা। এক একরে ধানের উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৩০ কেজি। খড়ের মূল্য বাদ দিলে ধানের নিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৯১২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৯ টাকা।

কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি ধান ৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলে একরপ্রতি মুনাফা থাকে প্রায় চার হাজার ৭০০ টাকা।

কৃষকরা জানান, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আবার ধান কাটার মৌসুমে বাজারদর কমে গেলে লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ধানের দাম ভালো থাকলে কৃষক এই ধান চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবে।

কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আউশের আবাদ আরো বাড়াতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা এবং বাজারে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে আউশ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরো বাড়বে। এতে এক সময়ের মঙ্গা যেভাবে দূর হয়েছে, ঠিক একইভাবে আরো আর্থিক সচ্ছলতা বাড়বে এই অঞ্চলের কৃষকদের।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তনের একটি দিক হলো বছরের মাঝের সময়টুকুও এখন আর আগের মতো পুরোপুরি অনাবাদি থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সেই সময়টাকে উৎপাদনের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে জমির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি কৃষিকাজের পরিধিও হয়েছে বিস্তৃত।

অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, আউশ স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে এই ধান চাষ হয়। উন্নত জাত নির্বাচন, সময়মতো চাষ, সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন আরো বাড়াতে কৃষকদের সাবির্ক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ