মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে বিখ্যাত এক যুদ্ধে জয়ী হওয়া মধ্যযুগীয় রুশ রাজপুত্রের তরবারি চালানো হাতের হাড়ের কিছু টুকরো ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
রুশ অর্থোডক্স চার্চের পক্ষ থেকে সেনাদের মনোবল বাড়াতে এসব হাড়ের টুকরো সেখানে পাঠানো হয়।
একই সঙ্গে এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি চার্চের সমর্থনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
রুশ অর্থোডক্স চার্চ জানিয়েছে, দিমিত্রি দনস্কয়ের ডান হাতের হাড়ের একটি অংশ দোনেৎস্কে পাঠানো হয়েছে। দোনেৎস্ক ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলের একটি, যেগুলোকে ২০২২ সালে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন পুতিন। তবে ইউক্রেন এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে একে অবৈধভাবে ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা বলে আখ্যা দেয়।
রুশ অর্থোডক্স চার্চের মস্কো প্যাট্রিয়ার্কেট দিমিত্রি দনস্কয়কে ‘পবিত্র যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চার্চ বলেছে, রুশ সেনাদের পাশে অদৃশ্যভাবে থাকার প্রতীক হিসেবে তাঁর দেহাবশেষের একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
রুশ অর্থোডক্স চার্চ এক বিবৃতিতে বলেছে, গ্র্যান্ড প্রিন্স দিমিত্রি দনস্কয়ের ডান হাতের একটি হাড়ের অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। কুলিকোভোর যুদ্ধে যে হাত দিয়ে তিনি তরবারি চালিয়েছিলেন, এটি সেই হাতেরই অংশ।
সেনাদের মনোবল বাড়াতেই এটি পাঠানো হয়েছে। চার্চ জানিয়েছে, বিশেষ নকশা করা একটি ছোট বাক্সে হাড়ের ওই অংশটি রাখা হয়েছে।
বাক্সটি শক্ত কাচ দিয়ে ঢাকা। রাশিয়া-ইউক্রেনের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ যুদ্ধসীমায় বিভিন্ন রুশ সেনা ইউনিটকে এটি দেখানো হবে। দিমিত্রি দনস্কয়ের নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চের অর্থায়নে তৈরি একটি সোভিয়েত ট্যাংক বহরের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
১৯৮৮ সালে রুশ অর্থোডক্স চার্চ তাঁকে ‘সন্ত’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
গ্র্যান্ড প্রিন্স দিমিত্রি দনস্কয় ১৩৮৯ সালে মারা যান। রুশ জাতীয়তাবাদীদের কাছে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তি। ১৩৮০ সালের কুলিকোভোর যুদ্ধে মঙ্গোলদের ‘গোল্ডেন হোর্ড’ বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়। চলতি গ্রীষ্মে মস্কোর ক্রেমলিনের ভেতরে অবস্থিত আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে সংস্কারকাজের সময় রাজপুত্র দিমিত্রি দনস্কয়ের ‘সারকোফ্যাগাস’ বা বিশেষ পাথরের কফিনটি আবিষ্কৃত হয়।
আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজে ওই রাজপুত্রের সংরক্ষিত দেহাবশেষ দেখেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, দেহাবশেষগুলো ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল। পুতিন এটিকে ‘অত্যন্ত বিরল ও অসাধারণ আবিষ্কার’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই আবিষ্কার রাশিয়ার ইতিহাসের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে।
দেশপ্রেম
দিমিত্রি দনস্কয়ের দেহাবশেষ ব্যবহার করে দেশপ্রেম ও সেনাদের মনোবল বাড়ানোর এই পরিকল্পিত প্রচারাভিযান এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন চলতি মাসের শেষ দিকে রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাশিয়ার সামরিক ও ধর্মীয় কর্মকর্তারা এই আবিষ্কারকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তাদের দাবি, এটি ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর জয় পেতে সহায়তা করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পড়েছে এবং দীর্ঘ ও কঠিন এই যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে চলমান কূটনৈতিক আলোচনাতেও এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সপ্তাহের শুরুতে রুশ অর্থোডক্স চার্চের বিশাল এক ধর্মীয় শোভাযাত্রায় দিমিত্রি দনস্কয়ের দেহাবশেষ মস্কোর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হয়। মঙ্গলবার দোনেৎস্কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি স্মৃতিসৌধে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুতিনের প্রথম উপপ্রধান স্টাফ সের্গেই কিরিয়েনকো, কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা এবং রাশিয়ার নিয়োগ করা আঞ্চলিক প্রধান অংশ নেন। সেখানে তাঁরা দেহাবশেষের বাক্সে চুম্বন করেন এবং ক্রুশের চিহ্ন আঁকেন। এ সময় একজন ধর্মযাজক প্রার্থনা করেন।
দোনেৎস্ক ও মারিউপোলের মেট্রোপলিটন ভ্লাদিমির বলেন, ‘আমাদের সেনা এবং দোনবাসে বসবাসকারী মানুষের ওপর থেকে শক্তি, ঈশ্বরের সাহায্য এবং আমাদের সাধুদের আশীর্বাদ প্রয়োজন।’ দোনবাস বলতে দোনেৎস্ক ও পাশের লুহানস্ক অঞ্চলকে বোঝায়। এই বিস্তৃত এলাকার প্রায় পুরো অংশই বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বুধবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, স্ভেরদলভস্ক অঞ্চলের রুশ সেনারা গির্জার একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের হাতে ছিল ধর্মীয় প্রতীক ও অর্থোডক্স পতাকা। ভিডিওতে এক সামরিক কমান্ডার বলেন, দনস্কয়ের দেহাবশেষ রাশিয়ার বিজয়ে সহায়তা করবে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ






















