জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমা দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। বিতর্কিত নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর মঙ্গলবার তিনি শপথ নেন।
তবে নির্বাচনের পর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হিচিলেমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রায়ান মুন্দুবিলে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। এর মধ্যেই তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হিচিলেমা ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে সরকারি ফলাফলে জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মুন্দুবিলে পেয়েছেন ৩৮ শতাংশ ভোট। তবে মুন্দুবিলে অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের ফল বদলে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের ফলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সুযোগও তিনি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ, আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর শেষ দিন গত সপ্তাহে আদালতগুলো বন্ধ ছিল।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, ভোটের দিন বেশির ভাগ সময় পরিস্থিতি শান্ত ছিল। তবে ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলেন, অনেক ভোট গণনাকেন্দ্রে ফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিকভাবে গণনার কাগজে লিখে রাখা হয়নি। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্যের সঙ্গে কাগজের নথির মিল যাচাইয়ের ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল। পর্যবেক্ষকরা আরো জানান, অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনার অপেক্ষায় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।
নির্বাচনের পরদিন রাজধানী লুসাকার একটি সম্পত্তিতে অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। ওই সম্পত্তিটির সঙ্গে মুন্দুবিলের সম্পর্ক ছিল বলে জানানো হয়েছে। অভিযানের সময় সাবেক এক মন্ত্রিসভা সদস্য নিহত হন। বিরোধী দলের কয়েকজন রাজনীতিককেও গ্রেপ্তার করা হয়। কর্তৃপক্ষ বিরোধীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার অভিযোগ আনে। তবে বিরোধীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুন্দুবিলে ও তার নির্বাচনী সহযোগী মেকেবি জুলু পরে আত্মগোপনে চলে যান। গত সপ্তাহে পুলিশ তাদের আটক করে। সপ্তাহান্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মঙ্গলবার শপথ অনুষ্ঠানে হিচিলেমা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর গ্রেপ্তার নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার জন্য সহিংসতার পথ বেছে না নেওয়ার আহ্বান জানান। হিচিলেমা বলেন, জাম্বিয়ায় শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিনিময়ে কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্রে সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়। মতভেদ থাকলেও একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো দরকার। বিরোধীদের তার সরকারের সঙ্গে দেশের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, বিরোধীদের কোনো ভালো ধারণা থাকলে তার সরকার তা শুনবে।
রাজধানীর ন্যাশনাল হিরোস স্টেডিয়ামে শপথ গ্রহণের আয়োজন করা হয়। সেখানে হাজারো সমর্থক জড়ো হন। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন হিচিলেমা। তার নির্বাচনী সহযোগী মুতালে নালুমাঙ্গোও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। অনুষ্ঠানে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেনিয়া, বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া ও তানজানিয়ার প্রেসিডেন্টরা ছিলেন। ২০২১ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন হিচিলেমা। সে সময় তামা উৎপাদনে সমৃদ্ধ জাম্বিয়া অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। দেশটি আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছিল। একই সময়ে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতিও ২৪ শতাংশের বেশি ছিল।
নির্বাচনের আগে রাজধানী লুসাকায় বিবিসিকে হিচিলেমা বলেছিলেন, তার সরকার একটি ভেঙে পড়া অর্থনীতি পেয়েছিল এবং অর্থনীতি নিচের দিকে যাচ্ছিল। ক্ষমতায় এসে সাবেক এই ব্যবসায়ী দেশের ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আলোচনা করেন। বিদেশি ঋণদাতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। পণ্যের দাম বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ সামলাতে অনেক মানুষকে এখনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে হিচিলেমা গত পাঁচ বছরে তৈরি করা অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর আরো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শপথ গ্রহণের ভাষণে তিনি বলেন, জাম্বিয়া এখন স্থিতিশীলতা থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথম মেয়াদে তার সরকার কঠিন কাজগুলো করেছে। আগামী পাঁচ বছর দেশের সব মানুষের প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করার সময়। জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে তামা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি আসে তামা থেকে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তামার দাম বেড়েছে। এতে জাম্বিয়ার অর্থনীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামার দাম বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা এখনো জাম্বিয়ার বাজার নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও অন্য সমস্যাগুলোও তারা আপাতত উপেক্ষা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























