ইসলামের আগমনের সময় দাস প্রথা পৃথিবীর বহু সমাজে প্রচলিত ছিল। যুদ্ধবন্দি, ঋণগ্রস্ততা, বংশগত দাসত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক প্রথার মাধ্যমে মানুষ দাসে পরিণত হতো।
ইসলাম এই দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা অস্বীকার করেনি। তাই সরাসরি দাস প্রথা বিলোপের ঘোষণা না দিয়ে দাসমুক্তিকে ইবাদত, নেক আমল ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলে ঘোষণা দিয়েছে। যেন দাসমুক্তির পথ সুগম হয়। পাশাপাশি ইসলাম দাসদের মানবিক ও সামাজিক মর্যাদার সুরক্ষার নির্দেশ দিয়েছে এবং অন্যায়ভাবে মানুষকে দাসে পরিণত করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
দাসমুক্তি ইবাদত
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষকে দাসত্বের শিকল থেকে মুক্ত করাকে ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি। তুমি কি জানো—বন্ধুর গিরিপথ কি? তা হচ্ছে দাসমুক্তি।’ (সুরা : বালাদ, আয়াত : ১১-১৩)
আয়াতে দাসমুক্তিকে মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য মুক্তির পথ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা কষ্টসাধ্য হলেও অত্যন্ত মর্যাদাকর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তি কোনো মুসলিম দাসকে মুক্ত করবে, তার প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ মুক্তিদাতার একটি করে অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, ১৫০৯)
দাসমুক্তি অপরাধের প্রতিবিধান
ইসলাম শুধু দাসমুক্তিতে উৎসাহ দেয়নি, বরং কয়েকটি শরয়ি অপরাধের কাফফারা (প্রতিবিধান) নির্ধারণ করেছে দাসমুক্তিকে। যেমন—
১. ভুলবশত হত্যার প্রতিবিধান : ভুলবশত কোনো মুমিনকে হত্যা করলে কাফফারা হিসেবে একজন মুমিন দাস মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশত করলে তা স্বতন্ত্র। আর কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিবারবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।
’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯২)
২. শপথ ভঙ্গের প্রতিবিধান : শরিয়ত শপথ ভঙ্গের কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তির বিধান দিয়েছে। শরিয়তের বিধান হলো কেউ ইচ্ছাকৃত শপথ করার পর তা ভঙ্গ করলে তার তিনটি প্রতিবিধানের একটি হলো—দাস মুক্ত করা। (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮৯)
৩. জিহারের প্রতিবিধান : নিজের স্ত্রীকে মায়ের সঙ্গে বা মায়ের কোনো অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করাকে জিহার বলে। ইসলামের দৃষ্টিতে জিহার একটি গর্হিত কাজ। কেউ জিহারে লিপ্ত হলে তার একটি কাফফারা বা প্রতিবিধান হলো দাস মুক্ত করা। আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে জিহার করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এটা দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন।’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ৩)
মানুষকে দাস বানানো নিষিদ্ধ
ইসলামী শরিয়তে স্বাধীন মানুষকে অন্যায়ভাবে দাসে পরিণত করা নিষিদ্ধ। কোনো স্বাধীন মানুষকে অপহরণ করে, প্রতারণা করে, ঋণের কারণে, জাতিগত পরিচয়ের কারণে বা অন্য কোনো উপায়ে দাস বানানো হারাম ও গুরুতর জুলুম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে কিয়ামতের দিবসে আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো। এক ব্যক্তি যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল। আরেক ব্যক্তি, যেকোনো স্বাধীন মানুষকে (দাস হিসেবে) বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। অপর ব্যক্তি, যেকোনো মজুর নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পুরো কাজ আদায় করে এবং তার পারিশ্রমিক দেয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)
ইসলামী আইন অনুসারে যুদ্ধে যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় তাদের বন্দি করা এবং দাসে পরিণত করা বৈধ। তবে এসব অপরাধীর জন্যও দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ খোলা রেখেছে ইসলাম। আল্লাহ বলেছেন, ‘পরিশেষে যখন তোমরা তাদের সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে, তখন তাদেরকে কষে বাঁধবে; অতঃপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৪)
মুক্তিকামীকে মুক্তি দেওয়া
ইসলাম দাসদের ভেতর যারা মুক্তির প্রত্যাশা করে, তাদের সঙ্গে মুক্তির চুক্তি করার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চাইলে, তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের সঙ্গে মঙ্গলের সন্ধান পাও।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৩)
ঠাট্টাচ্ছলে মুক্তি দিলেও তা কার্যকর
কেউ যদি ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা হাসির ছলে দাসমুক্ত করে, তবু তা কার্যকর বলে গণ্য হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি কাজ এমন, যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য। তা হলো বিয়ে, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯৪)
দাসদের সামাজিক মর্যাদা
দাসদের জীবনমান উন্নয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে তাদের মানবিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দাসরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। অতএব, যার ভাই তার অধীনে রয়েছে, সে যেন তাকে তা-ই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তা-ই পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের জন্য অসহনীয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)
এমনকি ইসলাম তাদের অপমানজনকভাবে দাস বা দাসী বলে ডাকতেও নিষেধ করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন আমার দাস বা আমার দাসী না বলে, বরং বলবে—আমার বালক বা আমার বালিকা, আমার সেবক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৫২)
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ
ইসলাম দাস-দাসীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি নিজের দাসীকে মুক্ত করে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আপন ক্রীতদাসীকে শিক্ষা দেয় এবং উত্তম শিক্ষা দান করে, তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয় এবং উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, এরপর তাকে মুক্ত করে বিয়ে করে তার জন্য আছে দ্বিগুণ সওয়াব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৮৩)
দাসদের ওপর নির্যাতন নয়
দাসদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা নিষিদ্ধ। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার ক্রীতদাসকে চড় মারবে বা মারধর করবে, এর কাফফারা (প্রতিদান) হলো তাকে মুক্ত করে দেওয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৬৮)
দাসমুক্তিতে সামাজিক অর্থায়ন
ইসলাম দাস-দাসীর মুক্তিকে মানুষের করুণা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ওপর ছেড়ে দেয়নি, বরং ইসলাম দাসমুক্তির জন্য সামাজিক অর্থায়নের ব্যবস্থাও করেছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে জাকাতের আটটি খাত বর্ণনা করেছেন। যার একটি হলো দাসমুক্তি। আল্লাহ বলেন, ‘সদকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তত্সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬০)
মোটকথা ইসলাম যদিও সরাসরি দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে নানাভাবে দাসমুক্তির পথ সুগম করেছে, দাসদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে, তাকে পরকালীন জবাবদিহির অধীন করেছে এবং দাসত্ব প্রসারের পথ রুদ্ধ করেছে।
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দিন। আমিন।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























