ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন ডিজিটাল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর পর ইউরোপে প্রবেশের সময় পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইতালির রাজধানী রোমের প্রধান বিমানবন্দরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার কারণে ব্রিটিশ যাত্রীদের সীমান্ত পার হতে আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সময় লাগছে।
এদিকে স্বল্পমূল্যের ইউরোপীয় এয়ারলাইন রায়ানএয়ার গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে ইউরোপগামী যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, নতুন সীমান্ত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অনেক বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
নতুন কী এই ইইউ সীমান্ত ব্যবস্থা?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এন্ট্রি-এক্সিট সিস্টেম’ হলো একটি ডিজিটাল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশকারী অ-ইইউ নাগরিকদের আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি (বায়োমেট্রিক তথ্য) সংগ্রহ করে। পরে শেনজেন এলাকা ত্যাগের সময় সেই তথ্য যাচাই করা হয়।
এই প্রক্রিয়া সাধারণত বিমানবন্দরে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় কিয়স্ক বা ই-পাসপোর্ট গেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সীমান্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে তথ্য নিবন্ধন করা হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ফ্লাইটও মিস করছেন যাত্রীরা
নতুন ব্যবস্থা চালুর পর ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। কেউ কেউ দীর্ঘ লাইনের কারণে নিজ দেশের ফেরার ফ্লাইটও মিস করেছেন।
রায়ানএয়ার এক বিবৃতিতে বলেছে, “ব্যর্থ ইইউ এন্ট্রি-এক্সিট সিস্টেম বাস্তবায়নের কারণে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ও দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হচ্ছে।”
এয়ারলাইনটি যুক্তরাজ্যের যাত্রীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, ইউরোপে ভ্রমণের সময় অতিরিক্ত সময় হাতে রাখতে হবে এবং পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ অপেক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
রোম বিমানবন্দরে সময় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ
রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রধান এভিয়েশন কর্মকর্তা ইভান বাসাতো বিবিসিকে জানান, নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে ই-পাসপোর্ট গেট সংযুক্ত করার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগে ব্রিটিশ যাত্রীদের সীমান্ত পার হতে গড়ে সাত মিনিট সময় লাগলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ২০ মিনিটে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে যেভাবে দ্রুত যাত্রীসেবা দেওয়া যেত, এখন আর সেই মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।”
তার মতে, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের এক থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করানো গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, “এই ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।”
বাসাতোর মতে, একই তথ্য একাধিকবার যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা কমাতে হবে। পাশাপাশি আরও বেশি দেশকে ইইউর প্রি-রেজিস্ট্রেশন অ্যাপ ব্যবহার শুরু করা উচিত। বর্তমানে শুধু সুইডেন ও পর্তুগাল এই সুবিধা ব্যবহার করছে।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা
রোমে ভ্রমণে আসা যুক্তরাজ্যের ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা কার্ল জানান, পরিবারের শিশুদের নিয়ে বিমান থেকে নামার তাদের দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ~জানতাম পরিস্থিতি খারাপ হবে, কিন্তু এতটা খারাপ হবে ভাবিনি।”
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পর্যটক ডেভিড জানান, তার প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে, যার ফলে বিমানবন্দর থেকে নেওয়ার জন্য আসা গাড়িও মিস করেন।
স্পেনের বার্সেলোনা হয়ে রোমে আসা ব্র্যাকনেলের বাসিন্দা ব্যারি বলেন, কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় মেশিন বিকল থাকায় পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় লেগেছে।
তার সঙ্গী সারাহ জানান, বার্সেলোনায় সীমান্ত পার হতে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে, যা প্রায় তাদের পুরো উড়োজাহাজ যাত্রার সমান সময়।
পর্তুগালেও প্রযুক্তিগত ত্রুটি
পর্তুগালের ফারো বিমানবন্দরের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সুপারিনটেনডেন্ট পেদ্রো অলিভেইরা জানিয়েছেন, নতুন ইইউ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় এখনও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ত্রুটি (বাগ) রয়েছে। তার ভাষায়, “আগে যে লাইন পার হতে ১০ মিনিট লাগত, এখন অনেক সময় ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় লাগে।”
তিনি বলেন, ইইউর কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সব দেশের ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকায় একটি দেশের প্রযুক্তিগত সমস্যা অন্য দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
“কখনও কখনও ওয়ারশতে কোনও সমস্যা হলে তার প্রভাব এখানেও পড়ে। আবার কখনও পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্ভার একসঙ্গে অচল হয়ে যায়। তখন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে পুরো ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে হয়,” যোগ করেন তিনি।তবে তার দাবি, আগের তুলনায় এ ধরনের প্রযুক্তিগত বিভ্রাট এখন অনেক কম ঘটছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, অধিকাংশ ইইউ বিমানবন্দরে নতুন সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি। সদস্য দেশগুলোকে ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে কমিশন।
তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন এয়ারলাইন ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুমে সাময়িকভাবে এই ব্যবস্থা স্থগিত করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানালেও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইইউর নতুন ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ধীরগতির তথ্য যাচাই এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে ইউরোপের ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ সারি ও যাত্রী অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: বিবিসি
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ


























