বাজারে চিনির ক্রমবর্ধমান দাম ও সরবরাহে ঘাটতির মুখে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিনির বিকল্প হিসেবে আখের গুড় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এক সময় লোকসানের মুখে জেলার যে আখ চাষ ঝিমিয়ে পড়েছিল, বর্তমানে সাধারণ মানুষের ব্যাপক চাহিদার কারণে তা আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্বাস্থ্যসম্মত গুড় এখন জেলার মানুষের মিষ্টির চাহিদা মেটানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের মতে, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ায় অনেকেই সাদা চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক গুড়ের দিকে ঝুঁকছেন। চা, শরবত, পায়েস, মিষ্টান্নসহ নানা খাদ্যপণ্যে গুড় ব্যবহার বাড়ছে। এতে স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়ছে। বর্তমানে গুড়কে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত করে ঝোলা গুড়, গুড়ের পাউডার ও পাটালি গুড়ে রূপান্তর করা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় গুড় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জানান, বর্তমানে বাজারে মানসম্পন্ন গুড়ের চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তারা বলছেন, আগে গুড় কেবল শীতকালীন পণ্য হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন বছরজুড়ে এর চাহিদা থাকছে।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে খোলা গুড় প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রক্রিয়াজাত, পাউডার বা ঝোলা গুড় বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের কারণে এ দামের পার্থক্য হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে না। বরং শহরকেন্দ্রিক বাজারে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
শিবগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা সাহাবুদ্দিন বলেন, অনেকেই এখন উচ্চফলনশীল জাতের আখ চাষ ও গুড় বিপণনে এগিয়ে আসছেন, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী বলেন, মাঝখানে কয়েক বছর টানা লোকসান হওয়ায় আখ চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছিলাম। তবে, এ বছর দুই বিঘা জমিতে আখের আবাদ ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হবে। যদি এমন অবস্থা থাকে, তাহলে আবার আগের মতো আখ চাষ বাড়াবো।
স্থানীয় গুড় প্রস্তুতকারক আলী আকবর বলেন, আগে মূলত খোলা গুড়ই বেশি বিক্রি হতো। এখন আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে গুড় বাজারজাত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাউডার গুড় ও ঝোলা গুড় শহরের বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ আখ ও গুড় শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানেই প্রক্রিয়াজাত গুড় বিক্রি হচ্ছে। এসবের দামও ভালো। এতে চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, আখ চাষিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ, উন্নত জাতের আখ এবং প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে করে আগামী মৌসুমগুলোতে আখের আবাদ আরও বাড়বে।
এছাড়া কৃষক, উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে আখ ও গুড় শিল্প আবারও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এক সময় লোকসানে ধুঁকতে থাকা এই খাত এখন চিনির বিকল্প জোগান দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে, যা জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে।
বাংলা৭১নিউজ/এবি