মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নীল সুনামিতে ভেসে গেছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা। সে সুনামির ঢেউ লেগেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই খাতেও।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিখাতের শেয়ার বিক্রির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে যেন। তাতে একের পর এক ধস নামছে প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে। এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। এআইয়ের স্বর্ণযুগ কি তাহলে শেষ হয়ে আসছে, নাকি এটি কেবলই একটি বাস্তবতা যাচাই?
গত কয়েকবছরে এআই খাতে যে হাইপ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছকই বুদবুদ নাকি এর সম্ভাবনা বাকি রয়ে গেছে? আরেকটা প্রশ্ন সামনে আসছে, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সঙ্গে এআই খাতের এ দুর্দশার সম্পর্ক কী?
২০২২ সালের শেষের দিকে ওপেনএআই কর্তৃক চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত করার ঘটনাটিকে এআইয়ের ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে জনসাধারণের এবং করপোরেট খাতের ব্যাপক আগ্রহ তৈরির মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়।
এটি রাতারাতি একটি আধুনিক ‘স্বর্ণ খোঁজার হিড়িক’ তৈরি করে। বিনিয়োগকারীরা কম্পিউটার চিপ ও নেটওয়ার্কিং অবকাঠামো প্রস্তুতকারী, ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী এবং এগুলো সচল রাখার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কম্পানির পাশাপাশি মূল এআই তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেদার টাকা ঢালতে শুরু করেন। এর ফলে প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর বাজারমূল্য আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এই জোয়ার চলতি বছরেও অব্যাহত ছিল।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা অনুযায়ী, কেবল চলতি ২০২৬ সালেই এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই খাতটি বাজার থেকে এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ তুলে নিয়েছে যে, এর ফলে অন্যান্য শিল্পের নিজস্ব ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা তো তাদের রিটার্ন বা লাভ চান। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে যে, এআই-এর এই জোয়ার সত্যিই প্রত্যাশিত মুনাফা এনে দিতে পারবে কি না।
ঠিক এমন এক সময়ে এই উদ্বেগগুলো সামনে এসেছে যখন এআই গবেষকদের জনসমক্ষে দেওয়া কিছু বক্তব্য খবরের শিরোনাম হচ্ছে।
তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, এমনকি এটিকে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন। এর ফলে এই খাতের ওপর একটি বড় ধরনের সরকারি বিধিনিষেধের খড়গ নেমে আসতে পারে বলে গুঞ্জন জোরালো হচ্ছিল।
গবেষকদের অনেকে এআইয়ের লাগাম টানার কথা বললেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই এআইয়ের আরো বিকাশের পক্ষে ছিলেন। এখানেই তৈরি হয়েছে শঙ্কা। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে এআই বা প্রেসিডেন্টের ভাষায় ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এর পক্ষে পুরোপুরি অবস্থান নিয়েছে, সেখানে অনেক শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতা ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছেন। এই ক্ষোভের মূল কারণ ছিল ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল পরিমাণ পানি এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে এর ফলে সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি বিল বেড়ে যাবে।
এ ছাড়া ডেটা সেন্টারের শব্দদূষণ, জমির ব্যবহার এবং সামগ্রিক পরিবেশগত বিঘ্ন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত মে মাসে প্রকাশিত একটি গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ আমেরিকান তাদের এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করবেন। যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই বিরোধিতার হার ছিল ৫৩ শতাংশ।
নির্বাচনে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতা ডেটা সেন্টারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে সচল রাখা ডেটা সেন্টার অপরিহার্য। ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের ফলে এআই খাতে আরো বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মনীতি আসতে পারে—এমন আশঙ্কাই বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট জেমস ট্যালারিকো বলেছেন, ‘আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্ব বজায় রাখতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের কাজ থেকে শুরু করে সন্তানদের পড়াশোনা—সবকিছুতে এটি কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে আমরা এখনো হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের অবশ্যই আমেরিকানদের রক্ষা করতে হবে এবং ব্যবসার জন্য স্পষ্ট ও ধারাবাহিক আইন তৈরি করতে হবে।’
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায়, ডেমোক্র্যাটরা এখন প্রেসিডেন্টের প্রযুক্তিগত এজেন্ডাকে আরো জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ করবে এবং এই শিল্পের বিস্তারকে লাগাম টানতে পারে এমন আইন প্রণয়ন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং নতুন কোনো ডেটা সেন্টার নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হিনোজোসার এই জয় প্রযুক্তি খাতের মাল্টি-বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যিনি বছরের পর বছর ধরে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি থাকা এই টেক্সাস রাজ্যে স্পেসএক্স এবং টেসলার কার্যক্রমের বড় অংশ সরিয়ে এনেছেন। এই টেসলা প্রধান মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রচারণায় প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন।
এআই নিয়ে এ শঙ্কার ঢেউ লেগেছে বিশ্বের শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আর্ম হোল্ডিংস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা টিউডর ব্রাউন যেমনটি উল্লেখ করেছেন, ‘স্টকের মূল্য বর্তমান আয়ের ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।’
মুনাফা যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, তবে কিছু বিনিয়োগকারী স্বাভাবিকভাবেই শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া বেছে নেবেন। গত দুদিনে শেয়ার বাজারে যে পতন দেখা গেছে, তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের কারণেই শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। তবে প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর বাজারমূল্য যে অতিমূল্যায়িত ছিল, সেই উদ্বেগ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। এখন অতি মূল্যায়ন আর শঙ্কা মিলে হঠাৎ স্বর্ণখনি হয়ে ওঠা এআই খাত এখন যেন অনেকের গলার কাঁটা।
এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবলই একটি অতি-উচ্ছ্বসিত বাজারের সাময়িক সংশোধন, নাকি এটি এআই বুদবুদ ফেটে যাওয়ার লক্ষণ, যার পরিণতি হবে আরো মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী?
‘ফিউচার মার্কেট ইনসাইটস’-এর নন্দিনী রায় চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, শক্তি খরচ এবং এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আসে কি না, বিনিয়োগকারীরা এখন তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
তিনি আরো যোগ করেন, প্রযুক্তি স্টকগুলোতে এখনই কোনো দ্রুত ও ব্যাপক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম। কারণ ট্রেডাররা এখন অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করবেন এবং যেসব কম্পানির ব্যালেন্স শিট বা আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী, সেগুলোর দিকেই ঝুঁকবেন। তবে টিউডর ব্রাউন মনে করেন এর প্রভাব হবে সীমিত।
তার মতে, ‘এআই-এর সীমাহীন প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশার কারণে শেয়ারের মূল্য অনেক বেশি স্ফীত হয়েছিল, যার পর এখন সামান্য আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এর একটি স্বাভাবিক তলানি বা সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে। সেটি পার হওয়ার পর বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে এবং এটি প্রমাণ করবে যে এই কম্পানিগুলো আসলে এখনো প্রচুর টাকা আয় করছে।’
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























