ঢাকা ১২:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলার বাঘ ও ইতিহাসের অমর নায়ক শেরেবাংলা: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার এক অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা, প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক, প্রখর প্রতিভাধর আইনজীবী এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পরম বন্ধু। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উপমহাদেশের রাজনীতিতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসামান্য বাকপটুতা এবং আপসহীন নেতৃত্বের কারণে তিনি ‘শের-ই-বাংলা’ (বাংলার বাঘ) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী)।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

এ. কে. ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে তার মাতুলালয়ে (মামার বাড়ি) জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামে। তার পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন বরিশালের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং মাতা সৈয়দুন্নেসা খাতুন ছিলেন প্রখ্যাত সমাজসেবক।

ছেলেবেলা ও প্রখর মেধার গল্প

শেরেবাংলার শৈশব কেটেছিল বরিশালেই। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। লোকমুখে প্রচলিত আছে, তিনি কোনো বই একবার পড়লে আর দ্বিতীয়বার পড়া লাগত না, এমনকি পড়ার পর বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলার মতো প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল তার। শৈশবে গৃহশিক্ষকদের কাছে আরবি, ফারসি ও বাংলা শিক্ষার মাধ্যমে তার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়।

শিক্ষাজীবন

তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ১৮৯০ সালে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) এবং এফ.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান।

১৮৯৪ সালে কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও গণিত—এই তিনটি বিষয়ে ট্রিপল অনার্সসহ প্রথম শ্রেণীতে বি.এ পাস করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম প্রথম মাল্টিপল অনার্স ডিগ্রিধারী। ১৮৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন (উল্লেখ্য, এক বন্ধুর চ্যালেঞ্জের মুখে তিনি মাত্র ৬ মাসের প্রস্তুতিতে গণিতে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণী পান)। এরপর ১৮৯৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিস্টিংশনসহ আইন (বি.এল.) ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন ও আইন পেশা

১৮৯৭ সালে কলকাতার বিখ্যাত আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে শিক্ষানবিস হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বরিশালে ফিরে আসেন এবং বরিশাল বার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। ১৯০৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও, সরকারি আমলাতন্ত্রের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে এবং জনগণের সেবা করার উদ্দেশ্যে ১৯১২ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে আইন পেশা ও রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

প্রেম-ভালোবাসা ও বিবাহ

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক তার জীবনে তিনটি বিবাহ করেছিলেন, তবে সামাজিক ও পারিবারিক প্রথা মেনেই তিনি এই বিয়েগুলো করেন এবং এক স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় কখনো অন্য বিয়ে করেননি।

প্রথম বিবাহ: নওয়াব বাহাদুর স্যার খাজা সলিমুল্লাহর বোন খুরশিদ তালাত বেগমের সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। তালাত বেগমের গর্ভে দুটি কন্যাসন্তানের (নাফিসা বিবি ও রইসী বেগম) জন্ম হয়। কিন্তু সন্তান প্রসবের পর তালাত বেগম অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় বিবাহ: প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি জিনাতুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করেন। কিন্তু জিনাতুন্নেসাও নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোকগমন করেন।

তৃতীয় বিবাহ: পরবর্তীতে তিনি খাদিজা বেগমকে বিয়ে করেন। এই তৃতীয় স্ত্রীর গর্ভেই শেরেবাংলার একমাত্র পুত্র আবুল কালাম ফায়জুল হক (এ কে ফায়জুল হক) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

রাজনীতি, আন্দোলন ও সংগ্রাম

ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমুখী এবং বর্ণাঢ্য। তিনি যুগপৎভাবে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন এবং ১৯১৮ সালে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কলকাতার ড্রয়িংরুমের রাজনীতি ছেড়ে তিনি বাংলার সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ে নেমে পড়েন। ১৯২৯ সালে তিনি ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন করেন, যা ১৯৩৬ সালে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হকই ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে উপমহাদেশের বিভক্তি এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল বীজ বপন করেছিল।

রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব ও জনকল্যাণমুখী সংস্কার

ফজলুল হক তার জীবনে বহু উচ্চ পদে আসীন হয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করেছেন। ১৯৩৫ সালে তিনি ছিলেন কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই সময়ে তিনি ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন করে বাংলার কোটি কোটি নিঃস্ব কৃষককে মহাজনদের ঋণের জাল থেকে মুক্ত করেন। এছাড়া পাস করেন ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’।

তিনি অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৯২১), কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ, ইডেন কলেজ এবং নিজ গ্রামে চাখার ফজলুল হক কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫) এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬-১৯৫৮) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষভাগে এসে শেরেবাংলা সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান। বয়সের ভারে এবং অসুস্থতায় তার শেষ জীবন কাটে ঢাকার টিকাটুলির বাসভবনে। অবহেলিত বাঙালি জাতিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা এবং কৃষকদের অধিকার এনে দেওয়া এই মহান সিংহপুরুষ ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার মৃত্যুর পর সমগ্র উপমহাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বর্তমানে সেই স্থানটি ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত, যেখানে তার পাশে শুয়ে আছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমউদ্দিন।

উপসংহার

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার উদার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজীবন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে তাকে অমর করে রাখবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলার বাঘ ও ইতিহাসের অমর নায়ক শেরেবাংলা: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা

আপডেট সময় ০৬:১৭:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার এক অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা, প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক, প্রখর প্রতিভাধর আইনজীবী এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পরম বন্ধু। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উপমহাদেশের রাজনীতিতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসামান্য বাকপটুতা এবং আপসহীন নেতৃত্বের কারণে তিনি ‘শের-ই-বাংলা’ (বাংলার বাঘ) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী)।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

এ. কে. ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে তার মাতুলালয়ে (মামার বাড়ি) জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামে। তার পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন বরিশালের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং মাতা সৈয়দুন্নেসা খাতুন ছিলেন প্রখ্যাত সমাজসেবক।

ছেলেবেলা ও প্রখর মেধার গল্প

শেরেবাংলার শৈশব কেটেছিল বরিশালেই। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। লোকমুখে প্রচলিত আছে, তিনি কোনো বই একবার পড়লে আর দ্বিতীয়বার পড়া লাগত না, এমনকি পড়ার পর বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলার মতো প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল তার। শৈশবে গৃহশিক্ষকদের কাছে আরবি, ফারসি ও বাংলা শিক্ষার মাধ্যমে তার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়।

শিক্ষাজীবন

তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ১৮৯০ সালে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) এবং এফ.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান।

১৮৯৪ সালে কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও গণিত—এই তিনটি বিষয়ে ট্রিপল অনার্সসহ প্রথম শ্রেণীতে বি.এ পাস করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম প্রথম মাল্টিপল অনার্স ডিগ্রিধারী। ১৮৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন (উল্লেখ্য, এক বন্ধুর চ্যালেঞ্জের মুখে তিনি মাত্র ৬ মাসের প্রস্তুতিতে গণিতে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণী পান)। এরপর ১৮৯৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিস্টিংশনসহ আইন (বি.এল.) ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন ও আইন পেশা

১৮৯৭ সালে কলকাতার বিখ্যাত আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে শিক্ষানবিস হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বরিশালে ফিরে আসেন এবং বরিশাল বার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। ১৯০৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও, সরকারি আমলাতন্ত্রের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে এবং জনগণের সেবা করার উদ্দেশ্যে ১৯১২ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে আইন পেশা ও রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

প্রেম-ভালোবাসা ও বিবাহ

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক তার জীবনে তিনটি বিবাহ করেছিলেন, তবে সামাজিক ও পারিবারিক প্রথা মেনেই তিনি এই বিয়েগুলো করেন এবং এক স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় কখনো অন্য বিয়ে করেননি।

প্রথম বিবাহ: নওয়াব বাহাদুর স্যার খাজা সলিমুল্লাহর বোন খুরশিদ তালাত বেগমের সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। তালাত বেগমের গর্ভে দুটি কন্যাসন্তানের (নাফিসা বিবি ও রইসী বেগম) জন্ম হয়। কিন্তু সন্তান প্রসবের পর তালাত বেগম অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় বিবাহ: প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি জিনাতুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করেন। কিন্তু জিনাতুন্নেসাও নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোকগমন করেন।

তৃতীয় বিবাহ: পরবর্তীতে তিনি খাদিজা বেগমকে বিয়ে করেন। এই তৃতীয় স্ত্রীর গর্ভেই শেরেবাংলার একমাত্র পুত্র আবুল কালাম ফায়জুল হক (এ কে ফায়জুল হক) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

রাজনীতি, আন্দোলন ও সংগ্রাম

ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমুখী এবং বর্ণাঢ্য। তিনি যুগপৎভাবে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন এবং ১৯১৮ সালে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কলকাতার ড্রয়িংরুমের রাজনীতি ছেড়ে তিনি বাংলার সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ে নেমে পড়েন। ১৯২৯ সালে তিনি ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন করেন, যা ১৯৩৬ সালে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হকই ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে উপমহাদেশের বিভক্তি এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল বীজ বপন করেছিল।

রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব ও জনকল্যাণমুখী সংস্কার

ফজলুল হক তার জীবনে বহু উচ্চ পদে আসীন হয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করেছেন। ১৯৩৫ সালে তিনি ছিলেন কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই সময়ে তিনি ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন করে বাংলার কোটি কোটি নিঃস্ব কৃষককে মহাজনদের ঋণের জাল থেকে মুক্ত করেন। এছাড়া পাস করেন ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’।

তিনি অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৯২১), কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ, ইডেন কলেজ এবং নিজ গ্রামে চাখার ফজলুল হক কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫) এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬-১৯৫৮) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষভাগে এসে শেরেবাংলা সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান। বয়সের ভারে এবং অসুস্থতায় তার শেষ জীবন কাটে ঢাকার টিকাটুলির বাসভবনে। অবহেলিত বাঙালি জাতিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা এবং কৃষকদের অধিকার এনে দেওয়া এই মহান সিংহপুরুষ ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার মৃত্যুর পর সমগ্র উপমহাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বর্তমানে সেই স্থানটি ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত, যেখানে তার পাশে শুয়ে আছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমউদ্দিন।

উপসংহার

শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার উদার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজীবন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে তাকে অমর করে রাখবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি