ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে আমলটি করতে হয় নীরবে

কিছু আমলের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে নীরবতায়। কেউ দেখল না, কেউ জানল না, কেউ প্রশংসা করল না, তবু বান্দা করে গেলেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ইসলামে এ ধরনের আমল ইখলাস বা নিষ্ঠা রক্ষার একটি সুন্দর মাধ্যমও।

গোপন দান: সবচেয়ে পরিচিত দৃষ্টান্ত
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। আর যদি গোপনে অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও ভালো।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)

রাসুলুল্লাহ (স.) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাঁদের কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়া দান করবেন। তাঁদের একজন সেই ব্যক্তি, যিনি এত গোপনে দান করেন যে তাঁর বাম হাত জানে না, ডান হাত কী দান করেছে। (সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১)

‘বাম হাতও জানে না’ কথাটি দানের গোপনীয়তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব বোঝায়। অর্থাৎ এমনভাবে দান করা, যাতে নিজের আমল প্রকাশ করার প্রবণতাও না থাকে।

নীরব আমলের আরও রূপ
রাতের নির্জন ইবাদত: সবাই ঘুমিয়ে থাকলে একা উঠে নামাজ পড়া ও দোয়া করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা থাকে। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে।’ (সুরা সাজদাহ: ১৬)

একান্তে আল্লাহর স্মরণ: আরশের ছায়াপ্রাপ্ত সাত ব্যক্তির একজন হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত হন। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

নির্জনে পাপ থেকে বিরত থাকা: কেউ দেখছে না, তবু শুধু আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে সরে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।’ (সুরা রহমান: ৪৬)

নীরবে মানুষের উপকার: কারও অজান্তে তার জন্য দোয়া করা, গোপনে কাউকে সাহায্য করা কিংবা কারও প্রয়োজন পূরণ করে তা প্রকাশ না করাও নেক আমলের সুন্দর রূপ হতে পারে।

কেন নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ
মূল কথা হলো নিয়ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রেখে এবং নামাজ কায়েম করবে ও জাকাত দেবে আর এটাই সরল সঠিক উম্মতের দ্বীন।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ: ৫)

মানুষের প্রশংসা পাওয়া নিজে সবসময় দোষের নয়। তবে প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা যদি আমলের উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করে, তাহলে ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এমন কিছু নেক আমল নিজের জন্য রেখে দেওয়া ভালো, যার কথা অন্য কেউ জানে না।

এ ধরনের আমলে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার প্রত্যাশা কম থাকে। এতে একজন মুমিন নিজের নিয়ত নিয়ে আরও সচেতন হতে পারেন।

সব আমল কি গোপনে করতে হবে?
না। ইসলামে সব আমল গোপন করার নির্দেশ নেই। জামাতে নামাজ, আজান ও হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা প্রকাশ্যেই হয়। আবার প্রকাশ্য নেক আমল অন্য মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিতও করতে পারে। কোরআনে প্রকাশ্য দানকে উত্তম বলা হয়েছে এবং গোপনে অভাবগ্রস্তকে দান করাকে আরও উত্তম বলা হয়েছে।

তাই আমল প্রকাশ্য না গোপন- শুধু এটিই মূল বিষয় নয়। আমলের উদ্দেশ্য ও অন্তরের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যে নফল আমল গোপনে করা সম্ভব, তার কিছু অংশ নিজের ও আল্লাহর মধ্যে রেখে দেওয়া ইখলাস রক্ষায় সহায়ক হয়।

আজই শুরু করা যায়
প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করুন, যার কথা কাউকে বলবেন না।
কাউকে গোপনে সাহায্য করুন বা অজান্তে তার জন্য দোয়া করুন।
রাতের শেষ প্রহরে অল্প সময় একান্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
আমল প্রকাশের তাড়না এলে নিজেকে প্রশ্ন করুন- ‘এটি কার জন্য করছি?’
মানুষ হয়তো জানবে না আপনি কী করেছেন, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর একজন মুমিনের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে এমন কিছু নেক আমল থাকুক, যার সাক্ষী শুধু আপনি এবং আপনার রব।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ২৭১; সুরা সাজদাহ: ১৬; সুরা রহমান: ৪৬; সুরা বাইয়্যিনাহ: ৫; সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

যে আমলটি করতে হয় নীরবে

আপডেট সময় ১১:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

কিছু আমলের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে নীরবতায়। কেউ দেখল না, কেউ জানল না, কেউ প্রশংসা করল না, তবু বান্দা করে গেলেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ইসলামে এ ধরনের আমল ইখলাস বা নিষ্ঠা রক্ষার একটি সুন্দর মাধ্যমও।

গোপন দান: সবচেয়ে পরিচিত দৃষ্টান্ত
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। আর যদি গোপনে অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও ভালো।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)

রাসুলুল্লাহ (স.) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাঁদের কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়া দান করবেন। তাঁদের একজন সেই ব্যক্তি, যিনি এত গোপনে দান করেন যে তাঁর বাম হাত জানে না, ডান হাত কী দান করেছে। (সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১)

‘বাম হাতও জানে না’ কথাটি দানের গোপনীয়তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব বোঝায়। অর্থাৎ এমনভাবে দান করা, যাতে নিজের আমল প্রকাশ করার প্রবণতাও না থাকে।

নীরব আমলের আরও রূপ
রাতের নির্জন ইবাদত: সবাই ঘুমিয়ে থাকলে একা উঠে নামাজ পড়া ও দোয়া করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা থাকে। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে।’ (সুরা সাজদাহ: ১৬)

একান্তে আল্লাহর স্মরণ: আরশের ছায়াপ্রাপ্ত সাত ব্যক্তির একজন হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত হন। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

নির্জনে পাপ থেকে বিরত থাকা: কেউ দেখছে না, তবু শুধু আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে সরে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।’ (সুরা রহমান: ৪৬)

নীরবে মানুষের উপকার: কারও অজান্তে তার জন্য দোয়া করা, গোপনে কাউকে সাহায্য করা কিংবা কারও প্রয়োজন পূরণ করে তা প্রকাশ না করাও নেক আমলের সুন্দর রূপ হতে পারে।

কেন নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ
মূল কথা হলো নিয়ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রেখে এবং নামাজ কায়েম করবে ও জাকাত দেবে আর এটাই সরল সঠিক উম্মতের দ্বীন।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ: ৫)

মানুষের প্রশংসা পাওয়া নিজে সবসময় দোষের নয়। তবে প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা যদি আমলের উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করে, তাহলে ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এমন কিছু নেক আমল নিজের জন্য রেখে দেওয়া ভালো, যার কথা অন্য কেউ জানে না।

এ ধরনের আমলে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার প্রত্যাশা কম থাকে। এতে একজন মুমিন নিজের নিয়ত নিয়ে আরও সচেতন হতে পারেন।

সব আমল কি গোপনে করতে হবে?
না। ইসলামে সব আমল গোপন করার নির্দেশ নেই। জামাতে নামাজ, আজান ও হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা প্রকাশ্যেই হয়। আবার প্রকাশ্য নেক আমল অন্য মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিতও করতে পারে। কোরআনে প্রকাশ্য দানকে উত্তম বলা হয়েছে এবং গোপনে অভাবগ্রস্তকে দান করাকে আরও উত্তম বলা হয়েছে।

তাই আমল প্রকাশ্য না গোপন- শুধু এটিই মূল বিষয় নয়। আমলের উদ্দেশ্য ও অন্তরের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যে নফল আমল গোপনে করা সম্ভব, তার কিছু অংশ নিজের ও আল্লাহর মধ্যে রেখে দেওয়া ইখলাস রক্ষায় সহায়ক হয়।

আজই শুরু করা যায়
প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করুন, যার কথা কাউকে বলবেন না।
কাউকে গোপনে সাহায্য করুন বা অজান্তে তার জন্য দোয়া করুন।
রাতের শেষ প্রহরে অল্প সময় একান্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
আমল প্রকাশের তাড়না এলে নিজেকে প্রশ্ন করুন- ‘এটি কার জন্য করছি?’
মানুষ হয়তো জানবে না আপনি কী করেছেন, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর একজন মুমিনের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে এমন কিছু নেক আমল থাকুক, যার সাক্ষী শুধু আপনি এবং আপনার রব।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ২৭১; সুরা সাজদাহ: ১৬; সুরা রহমান: ৪৬; সুরা বাইয়্যিনাহ: ৫; সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১

বাংলা৭১নিউজ/জেএস