ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সিরাজগঞ্জে পৃথক মাদক মামলায় মা-মেয়েসহ তিনজনের যাবজ্জীবন Logo পর্দা উঠল ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের Logo ব্রাজিলের পরবর্তী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নভেম্বরে, কবে কাদের বিপক্ষে ম্যাচ Logo ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়নে ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চুক্তি সই Logo ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা Logo ‘সর্বকালের সেরা বিতর্কের অবসান’—ইনস্টাগ্রামে কেন এমন পোস্ট মেসির? Logo মানবতাবিরোধী অপরাধ : কাদেরসহ ৭ আসামির রায় আগামী সপ্তাহে Logo ইরানের সরকার উৎখাতে কাজ করছে ইসরায়েল: নেতানিয়াহু Logo জামানত ছাড়াই তরুণদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ ও অনুদান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক Logo দেশীয় প্রসাধনীর বাজার এক বিলিয়ন ডলারের বেশি : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

সম্পত্তিতে সমঅধিকার না থাকলে নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়: মহিলা পরিষদ

সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত না করে শুধু নীতিকথা কিংবা সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নারীর পূর্ণ সমানাধিকার অর্জন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। 

সংগঠনটি বলেছে, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সার্বিক সমতা নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকারসহ সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি।

আন্তর্জাতিক সিডও দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সংগঠনটির আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সদস্য লুনা নূর বলেন, বাংলাদেশে নারীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উত্তরাধিকার ও পরিবারকেন্দ্রিক সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের কারণে অধিকাংশ নারী নিজের অর্জিত কিংবা পারিবারিক সম্পদ থেকেও বঞ্চিত হন। একটি আধুনিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।

প্রবন্ধে বলা হয়, জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদে মালিকানা থাকলে নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমে। নিজের নামে সম্পত্তি থাকলে পরিবার ও সমাজে নারীর কথা বলার সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত নারী অনেক সময় পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা সহ্য করতে বাধ্য হন। কারণ, তার নিজস্ব আশ্রয় কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকে না।

সম্পত্তির অধিকার নারীদের অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে সমাজ নারীকে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে। সম্পদে সমান অধিকার নারীকে সামাজিকভাবে সমান মর্যাদার আসনে বসাতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান বাড়ছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, কৃষিতে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও জমির ওপর তাদের অধিকার প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারের নীতি ও আইনে ভূমিহীন ও ক্ষেতমজুরদের খাসজমি দেওয়ার কথা রয়েছে। খাসজমি বিতরণের নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে জমি দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

প্রবন্ধে বলা হয়, কাগজে-কলমে নারীর নামে বা যৌথ নামে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে থাকে না। সমাজ, আইন, বিধি ও পারিবারিক পরিবেশ নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। নিজস্ব সম্পদ না থাকলে নারীরা সব সময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। সম্পদ-সম্পত্তিতে সমঅধিকার তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহযোগিতা করে এবং বিপদ বা বয়সের ভারে অসহায় হয়ে পড়া থেকে সুরক্ষা দেয়।

মূল প্রবন্ধে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীর মৌলিক অধিকার ও সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সিডও সনদের ১১ নম্বর ধারায় সমান পারিশ্রমিক, একই মানের কাজের ক্ষেত্রে একই আচরণ এবং কাজের মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমান আচরণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কর্মজীবী নারীর মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু পরিচর্যা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সক্রিয় পদক্ষেপের কথাও সনদে রয়েছে।

বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে গেলেও রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য অধিকার ভোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানা না থাকার কারণে নানা সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানানো হয়। স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় ব্যাংক অনেক সময় নারী উদ্যোক্তাদের বড় অংকের ঋণ দিতে চায় না। ফলে মূলধারার ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে অনেকে চড়া সুদে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সীমিত পুঁজির কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারীর বড় বা টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ব্যবসার পুঁজির জন্য নারীদের অনেক সময় বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও পুরুষ আত্মীয়দের হাতে চলে যেতে পারে। নানা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় পড়ে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের অনেককে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হয়। তাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি এবং অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের অপরিহার্য শর্ত।

সিডও সনদের প্রসঙ্গ তুলে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করে। শুরুতে কয়েকটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করা হলেও পরবর্তীতে দুটি ধারা—২ এবং ১৬(১)(গ)—এ সংরক্ষণ বহাল রাখা হয়। এর মধ্যে ২ নম্বর ধারায় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। আর ১৬(১)(গ) ধারায় বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছে। ২০১৬ সালে সিডও কমিটিও বাংলাদেশের ৮ম সাময়িক প্রতিবেদনের ওপর পর্যবেক্ষণে ২ ও ১৬(১)(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার তাগিদ দেয়। একই সঙ্গে সব ধর্মের নারীর জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশ করা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সিডও কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন ও বিবাহ-বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়েই বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘ নয় বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৯ম ও ১০ম সাময়িক প্রতিবেদন সিডও কমিটিতে জমা দিয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারায় বাংলাদেশের সংরক্ষণের ৪২ বছর পূর্ণ হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, এই সংরক্ষণ নারীর পূর্ণ মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মৌলিক অন্তরায়। সিডও সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এর বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে এসব সংরক্ষণ সাংঘর্ষিক এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মতো বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে আশা প্রকাশ করা হয়, সরকার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে। সমতাপূর্ণ পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বহুমাত্রিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

বৈষম্য নিরসনে মহিলা পরিষদ সুপারিশ

১. আইনগত ও সাংবিধানিক সংস্কার : বিদ্যমান প্রথাগত ও ব্যক্তিগত আইনের বৈষম্যমূলক ধারাগুলো সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা।

২. সম্পত্তির যৌথ মালিকানা বাধ্যতামূলক করা : বিবাহিত জীবনে অর্জিত সম্পত্তি এবং সরকারের দেওয়া খাসজমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করা।

৩. সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন : পিতৃতান্ত্রিক সংস্কার ও সামাজিক প্রথা ভেঙে নারীর সম্পত্তির অধিকার দাবির বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।

৪. সহজ শর্তে ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা : জামানত ছাড়াই বা বিকল্প জামানতের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক সুবিধা সহজীকরণ করা।

৫. বিনামূল্যে আইনি সহায়তা : জমি ও সম্পত্তিতে অধিকার বঞ্চিত বা নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য দ্রুত ও বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা কেন্দ্র জোরদার করা।

মতবিনিময় সভায় উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি ও দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর চন্দন লাহিড়ী এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন নাহার মিষ্টি বক্তব্য দেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এনালিস্ট ও ইউনিট ম্যানেজার (জেন্ডার রেসপনসিভ গভর্ন্যান্স) তপতী সাহা, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর।

বাংলা৭১নিউজ/সারোয়ার

Tag :

সিরাজগঞ্জে পৃথক মাদক মামলায় মা-মেয়েসহ তিনজনের যাবজ্জীবন

সম্পত্তিতে সমঅধিকার না থাকলে নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়: মহিলা পরিষদ

আপডেট সময় ০১:১৩:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত না করে শুধু নীতিকথা কিংবা সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নারীর পূর্ণ সমানাধিকার অর্জন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। 

সংগঠনটি বলেছে, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সার্বিক সমতা নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকারসহ সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি।

আন্তর্জাতিক সিডও দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সংগঠনটির আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সদস্য লুনা নূর বলেন, বাংলাদেশে নারীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উত্তরাধিকার ও পরিবারকেন্দ্রিক সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের কারণে অধিকাংশ নারী নিজের অর্জিত কিংবা পারিবারিক সম্পদ থেকেও বঞ্চিত হন। একটি আধুনিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।

প্রবন্ধে বলা হয়, জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদে মালিকানা থাকলে নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমে। নিজের নামে সম্পত্তি থাকলে পরিবার ও সমাজে নারীর কথা বলার সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত নারী অনেক সময় পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা সহ্য করতে বাধ্য হন। কারণ, তার নিজস্ব আশ্রয় কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকে না।

সম্পত্তির অধিকার নারীদের অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে সমাজ নারীকে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে। সম্পদে সমান অধিকার নারীকে সামাজিকভাবে সমান মর্যাদার আসনে বসাতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান বাড়ছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, কৃষিতে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও জমির ওপর তাদের অধিকার প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারের নীতি ও আইনে ভূমিহীন ও ক্ষেতমজুরদের খাসজমি দেওয়ার কথা রয়েছে। খাসজমি বিতরণের নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে জমি দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

প্রবন্ধে বলা হয়, কাগজে-কলমে নারীর নামে বা যৌথ নামে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে থাকে না। সমাজ, আইন, বিধি ও পারিবারিক পরিবেশ নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। নিজস্ব সম্পদ না থাকলে নারীরা সব সময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। সম্পদ-সম্পত্তিতে সমঅধিকার তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহযোগিতা করে এবং বিপদ বা বয়সের ভারে অসহায় হয়ে পড়া থেকে সুরক্ষা দেয়।

মূল প্রবন্ধে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীর মৌলিক অধিকার ও সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সিডও সনদের ১১ নম্বর ধারায় সমান পারিশ্রমিক, একই মানের কাজের ক্ষেত্রে একই আচরণ এবং কাজের মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমান আচরণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কর্মজীবী নারীর মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু পরিচর্যা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সক্রিয় পদক্ষেপের কথাও সনদে রয়েছে।

বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে গেলেও রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য অধিকার ভোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানা না থাকার কারণে নানা সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানানো হয়। স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় ব্যাংক অনেক সময় নারী উদ্যোক্তাদের বড় অংকের ঋণ দিতে চায় না। ফলে মূলধারার ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে অনেকে চড়া সুদে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সীমিত পুঁজির কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারীর বড় বা টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ব্যবসার পুঁজির জন্য নারীদের অনেক সময় বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও পুরুষ আত্মীয়দের হাতে চলে যেতে পারে। নানা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় পড়ে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের অনেককে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হয়। তাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি এবং অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের অপরিহার্য শর্ত।

সিডও সনদের প্রসঙ্গ তুলে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করে। শুরুতে কয়েকটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করা হলেও পরবর্তীতে দুটি ধারা—২ এবং ১৬(১)(গ)—এ সংরক্ষণ বহাল রাখা হয়। এর মধ্যে ২ নম্বর ধারায় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। আর ১৬(১)(গ) ধারায় বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছে। ২০১৬ সালে সিডও কমিটিও বাংলাদেশের ৮ম সাময়িক প্রতিবেদনের ওপর পর্যবেক্ষণে ২ ও ১৬(১)(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার তাগিদ দেয়। একই সঙ্গে সব ধর্মের নারীর জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশ করা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সিডও কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন ও বিবাহ-বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়েই বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘ নয় বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৯ম ও ১০ম সাময়িক প্রতিবেদন সিডও কমিটিতে জমা দিয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারায় বাংলাদেশের সংরক্ষণের ৪২ বছর পূর্ণ হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, এই সংরক্ষণ নারীর পূর্ণ মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মৌলিক অন্তরায়। সিডও সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এর বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে এসব সংরক্ষণ সাংঘর্ষিক এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মতো বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে আশা প্রকাশ করা হয়, সরকার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে। সমতাপূর্ণ পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বহুমাত্রিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

বৈষম্য নিরসনে মহিলা পরিষদ সুপারিশ

১. আইনগত ও সাংবিধানিক সংস্কার : বিদ্যমান প্রথাগত ও ব্যক্তিগত আইনের বৈষম্যমূলক ধারাগুলো সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা।

২. সম্পত্তির যৌথ মালিকানা বাধ্যতামূলক করা : বিবাহিত জীবনে অর্জিত সম্পত্তি এবং সরকারের দেওয়া খাসজমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করা।

৩. সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন : পিতৃতান্ত্রিক সংস্কার ও সামাজিক প্রথা ভেঙে নারীর সম্পত্তির অধিকার দাবির বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।

৪. সহজ শর্তে ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা : জামানত ছাড়াই বা বিকল্প জামানতের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক সুবিধা সহজীকরণ করা।

৫. বিনামূল্যে আইনি সহায়তা : জমি ও সম্পত্তিতে অধিকার বঞ্চিত বা নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য দ্রুত ও বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা কেন্দ্র জোরদার করা।

মতবিনিময় সভায় উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি ও দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর চন্দন লাহিড়ী এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন নাহার মিষ্টি বক্তব্য দেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এনালিস্ট ও ইউনিট ম্যানেজার (জেন্ডার রেসপনসিভ গভর্ন্যান্স) তপতী সাহা, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর।

বাংলা৭১নিউজ/সারোয়ার