
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তাতে ব্যারেলপ্রতি দাম ২০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, তবে পর্দার অন্তরালের চিত্রটি আরও ভয়াবহ।
ওমানি জ্বালানি তেল বর্তমানে ব্রেন্টের চেয়ে রেকর্ড ৫১ ডলার বেশি প্রিমিয়ামে বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে মে মাসে সরবরাহের জন্য এই তেলের প্রকৃত মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ ডলারে। দুবাইয়ের ক্যাশ প্রিমিয়ামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোয় এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ পরিসংখ্যানে বাজারের প্রকৃত সংকটের গভীরতা পুরোপুরি ফুটে উঠছে না।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে পা দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল আটকা পড়ে আছে, যা বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা তার চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করছেন। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরাহ বন্দরে দফায় দফায় হামলার কারণে বিকল্প পথে তেল পরিবহনের চেষ্টাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এশিয়ায়, কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার চীনের সিনোপেক তাদের পরিশোধন কার্যক্রম ১০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীন ও থাইল্যান্ড ইতিমধ্যে পরিশোধিত তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এদিকে আকাশপথে যাতায়াতের খরচও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে; এশিয়ায় জেট ফুয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার এবং ইউরোপে ১৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত শেষে দ্রুত দাম কমে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল জরুরি মজুদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিলেও উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হতে মাসখানেক সময় লেগে যেতে পারে। ফলে সরবরাহ সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে ইরানের দেওয়া ২০০ ডলারের সতর্কবার্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ