ফুটবল শুধুই এক একুশ শতকের খেলা নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন—আর সেই স্পন্দনের প্রথম ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টার নাম পেলে। চরম দারিদ্র্যের ধূলিধূসরিত রাজপথ থেকে বিশ্ব ফুটবলের সবুজ গালিচা জয় করে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অমলিন কিংবদন্তি, তাঁর জীবনের গল্প যেন কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম নয়।
বিদ্যুতের আলোয় জন্ম, থমাস এডিসন ও নামকরণ
১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস প্রদেশের ত্রেস কোরাকোয়েস নামের এক নিভৃত, দরিদ্র পরিবারে আলোর মুখ দেখেন এক শিশু। ঠিক সেই সময়েই সেই প্রত্যন্ত গ্রামে প্রথমবারের মতো জ্বলে উঠেছিল বিদ্যুতের দ্যুতি। সেই আলোর আবিষ্কারক, মহান বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগে বাবা জোয়াও রামোস দো নাসিমেন্তো (যিনি ‘দন্দিনহো’ নামে ফুটবল খেলতেন) এবং মা সেলেস্তে আরান্তেস শিশুর নাম রাখলেন ‘এডসন’।
তবে এই নাম ছাপিয়ে শৈশবে এক অদ্ভুত খেয়ালের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় তাঁর কালজয়ী পরিচয়। বাবা যে ক্লাবে খেলতেন, সেই দলের প্রতিভাবান গোলরক্ষক ‘বিলে’-র খেলা দেখে শিশু এডসন ছিলেন মুগ্ধ। বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে গোল বাঁচানোর সময় ক্ষুদ্রে এডসন চেঁচিয়ে বলতেন, “আমি বিলে হব!” কিন্তু কচি মুখের তোতলামিতে ‘বিলে’ শব্দটি বার বার রূপান্তরিত হতো ‘পেলে’ ধ্বনিতে। বন্ধুরা খেপিয়ে তুলতে তাঁকে ডাকতে শুরু করে ‘পেলে’ বলে। শুরুতে রাগ আর ক্ষোভে এই নামে মারামারি করলেও, নিয়তির কী অপূর্ব লিখন—বিজ্ঞানী এডিসনের থেকে ধার করা নামটি পেছনে ফেলে সেই ভুল উচ্চারণের ‘পেলে’ শব্দটাই হয়ে ওঠে বিশ্ব ফুটবলের সমার্থক।
কাগজের বল ও বুট পালিশের সংগ্রাম
পেলের শৈশব কেটেছে সাও পাওলোর বাউরু অঞ্চলে চরম অভাবের মধ্য দিয়ে। যে বয়সে শিশুদের হাতে শোভা পায় খেলনা, সেই বয়সে পেলের হাতে ছিল না একটি আসল ফুটবল কেনার সামর্থ্য। কিন্তু দারিদ্র্য কি আর অদম্য স্বপ্নকে বাঁধতে পারে? মোজার ভেতরে খবরের কাগজ ঠেসে, দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তিনি বানিয়ে নিতেন নিজের খেলার বল। পরিবারের আহার জোগাতে শৈশবেই তাঁকে নেমে পড়তে হয়েছিল রাজপথে—বুট পালিশের কাজ করে উপার্জিত সামান্য অর্থ তুলে দিতেন মায়ের হাতে। অভাব যেখানে প্রাত্যহিক সঙ্গী, সেখানে পায়ে পায়ে সাম্বার ছন্দই ছিল তাঁর একমাত্র সান্ত্বনা।
ফুটবলে অভিষেক ও সান্তোসের স্বর্ণালী দুয়ার
বাবার কাছে ফুটবলের হাতেখড়ি নেওয়া পেলের প্রতিভা আড়ালে থাকেনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাজিলের খ্যাতনামা ফুটবলার দে ব্রিউতো আবিষ্কার করেন এই বিস্ময় বালককে। তিনি তরুণ পেলেকে নিয়ে যান ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোস এফসি-তে। সান্তোসের পরিচালকদের দিকে তাকিয়ে দে ব্রিউতো সেদিন আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “এই ছেলেটি একদিন পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হবে।” কথাটি মিথ্যা হয়নি। ১৯৫৬ সালে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটিয়ে প্রথম ম্যাচেই গোল করে নিজের আগমন বার্তা জানান তিনি।
বিশ্বমঞ্চে কর্তৃত্ব ও তিন বিশ্বকাপের অমর ইতিহাস
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে জড়িয়ে বিশ্ব ফুটবলে নামেন তিনি। তারপরের ইতিহাস শুধুই তাঁর একক আধিপত্যের।
১৯৫৮ সুইডেন বিশ্বকাপ (কনিষ্ঠ রাজপুত্র): মাত্র ১৭ বছরের এক তরুণ বিশ্বকাপে পা রেখে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন। সেমিফাইনালে পরাশক্তি ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে আয়োজক সুইডেনের জালে চোখধাঁধানো দুই গোল—ব্রাজিলকে তিনি এনে দেন প্রথম বিশ্বকাপ। কনিষ্ঠতম গোলদাতার সেই রেকর্ড আজও ভাস্বর।
১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপ: ইনজুরির কারণে বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে থাকলেও, দলগত জয়ে তাঁর প্রাথমিক অবদান ছিল স্মরণীয়।
১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপ (স্বর্ণযুগ): এটি ছিল পেলের ক্যারিয়ারের সেরা বসন্ত। রিভলীনো, তোস্তাও, জারজিনহোদের নিয়ে গড়া স্বপ্নের ব্রাজিলের প্রাণভোমরা ছিলেন পেলে। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তাঁর সেই অনবদ্য হেড ও জাদুকরী অ্যাসিস্টে ৪-১ গোলের জয় নিয়ে চিরদিনের জন্য ‘জুলে রিমে ট্রফি’ নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল।
মাঠের এই জাদুকর ১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর মারাকানা স্টেডিয়ামে ভাস্কো দা গামার বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে অর্জন করেন তাঁর ঐতিহাসিক ১০০০তম গোল। জীবনের শেষভাগে নিউ ইয়র্ক কসমস ক্লাবে যোগ দিয়ে বিশ্বায়নের যুগে যুক্তরাষ্ট্রেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে দেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও বিচিত্র সংসার
মাঠের বাইরে পেলের ব্যক্তিজীবন ছিল নানা রঙ্গে আঁকা। তিনি তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৬ সালে প্রথম স্ত্রী রোজমেরির সংসারে জন্ম নেন তিন সন্তান—কেল্লী, জেনিফার ও এদিলহো। ১৯৮২ সালে বিচ্ছেদের পর ১৯৯৪ সালে তিনি বিয়ে করেন গায়িকা ও মনোবিজ্ঞানী অ্যাসিরিয়া লেমোসকে, যাঁদের ঘরে জন্ম নেয় যমজ সন্তান জশুয়া ও সেলেস্তে। ২০০৮ সালে এই সংসারের সমাপ্তি ঘটে। জীবনের শেষ প্রান্তে, ২০১৬ সালে ৭৩ বছর বয়সে তিনি দীর্ঘদিনের অনুরাগী মার্সিয়া আওকিকে বিয়ে করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা একসাথে ছিলেন। এর বাইরেও সান্দ্রা রেজিনাসহ (২০০৬ সালে প্রয়াত) তাঁর অন্যান্য সন্তানরা পেলের জীবনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী।
মহাপ্রয়াণ: এক তারার অস্তগমন
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শেষ দিনগুলোতে শারীরিক জটিলতা ও হিপ জয়েন্টের অস্ত্রোপচারের কারণে তাঁকে হুইলচেয়ারের আশ্রয় নিতে হয়। ২০২১ সালে ধরা পড়ে কোলন ক্যানসার। মরণব্যাধির সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২২ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে সাও পাওলোর আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান সাম্বার এই রাজপুত্র। তাঁর প্রয়াণে সমগ্র ব্রাজিল স্তব্ধ হয়ে যায়, ঘোষণা করা হয় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক।
ফিফা কর্তৃক “শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়” খেতাবে ভূষিত এই কিংবদন্তি হয়তো আজ সশরীরে নেই, কিন্তু প্রতিবার যখন সবুজ ঘাসে ফুটবল গড়ায়—ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে সাম্বার ছন্দ হয়ে অমর থেকে যান কালজয়ী কালা মানিক পেলে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি


























