ঢাকা ০৯:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ইশরাকের অভিযান চালানো সেই স্পটে যৌথ অভিযান, আটক ১৫ জনের কারাদণ্ড Logo স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি: প্রধানমন্ত্রী Logo টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০, পরিচয় মিলেছে ৮ জনের Logo রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর Logo পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ৩ বিভাগ সফরে প্রধানমন্ত্রী Logo মণিপুরে সহিংসতায় নিহত ৪, মরদেহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ Logo রিজার্ভ চুরির মামলায় ৯৯ বারের মতো পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন Logo স্বর্ণ ব্যবসায়ী দিলীপ আগরওয়ালা গ্রেপ্তার Logo সাবেক এমপি নাঈমুজ্জামানের ২ দিনের রিমান্ড Logo সৌদির সার্বভৌমত্ব ও পবিত্র স্থান রক্ষায় কোনো আপস নয়, ঘোষণা পাকিস্তানের

মণ্ডপে শোভিত প্রতিমা, কানে কানে উৎসব পৌঁছে দিচ্ছে ঢাক

বুড়ো আঙুল, তর্জনী আর মধ্যমা—তিন আঙুলে দুই কাঠি। ঢাকে কাঠির আঘাত পড়ার সময় আঙুলগুলো নড়তে থাকে প্রজাপতির ডানার মতো।

পূজার বাদ্য নামে পরিচিত এই ঢাক বাজানো হচ্ছে শত শত বছর ধরে, একই ধারায়।

বাদ্যকরদের অন্যতম উপাদান ঢাক। সঙ্গে ঢোল, কাঁসি, করতাল, মন্দিরা, খঞ্জনি, সানাই, বাঁশি, ঝনঝনি।

দুর্গাপূজার সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে অন্যতম আকর্ষণ বাদ্যযন্ত্রের দল।

পূজা মৌসুমে বাদ্যকররা তাদের বাড়ি ছেড়ে ছুটে আসেন মণ্ডপে মণ্ডপে। এতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মণ্ডপও তার ব্যতিক্রম নয়।

দিনভর কেউ ঢাক-ঢোল, বাঁশি, কাঁসি, ঝুনঝুনি (ঝুমুর) বাজান।

ছন্দ থাকে একই, কিন্তু লয় বদলায়—কখনো দ্রুত, কখনো মধ্য, কখনো আবার ধীর লয়।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে বাজানো বাদ্যকররা এসেছেন পাশের কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে। উপজেলায় এ বছর অন্তত ৪৬টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব হচ্ছে যেখানে বাজানোর জন্য ৭০ থেকে ৮০ জন বেশি ঢাকি প্রয়োজন।

সন্ধ্যায় উপজেলার উজানচর মণ্ডপে ধূপের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে একদল ভক্ত তখন দেবী দুর্গা ও তার পরিবার—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও মহিষাসুর-এর বেদির সামনে নৃত্য করছিলেন। সন্ধ্যার এই নৃত্যের নাম আরতি।

সেখানে ঢাক বাজাচ্ছিলেন সমীর দাস।

ঢাকি সমীরের ভাষ্য, ‘ঢাকের এই ছন্দের মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে, যা প্রত্যেক বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, এটা রক্তে ঢেউ তোলে।’

আরেক বাদ্যকর স্বপন দাসে ভাষায়, পূজার এই ছন্দ বাজানো হয় ছয়-আট মাত্রার চক্রে, যা ঝুমুর তালের মতো। তিনি বলেন, ‘এটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কারণ ঝুমুর তাল হলো বিশ্বের সব ধরনের লোক সংগীতের অন্তর্নিহিত মৌলিক ছন্দ। এটা এমন এক ছন্দ-কাঠামো, যার সঙ্গে গোটা বিশ্ব আত্মিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে।’

সোমবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাঞ্ছারামপুরের জমিদার বাড়ির পূজামণ্ডপে বাজাচ্ছিল চার ঢাকির একটি দল। দলটি এসেছে নরসিংদির মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রাম থেকে। ছোট দলটি বাজাচ্ছিল দুটি ঢাক, একটি ঢোল ও একটি কাঁসর ঘণ্টা নিয়ে।

দলটির নেতা আশিষ কুমার বলেন, ‘ঢাক আর ঢোলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ঢাক আকারে বড় এবং শুধু এক পাশে বাজানো হয়। ঢোল বাজানো হয় দুই পাশে। ঢাকের বোলই প্রধান ভূমিকা পালন করে; ঢোল ও কাঁসরের বোল কেবল ঢাকের সঙ্গে সংগত করে।’

আশিষ আরো বলেন, ‘দেবী দুর্গা ও কালীর পূজার সঙ্গে এটি চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়; দুজনই শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক।’

কিশোর কমল দাসের হাতে ছিল ঝুনঝুনি। তার ভাষ্য, ‘আমি এটা সিজন্যাল (মৌসুম) করি। পূজো শেষে সেলুনে নাপিতের কাজে ফিরে যাব।’

উজানচরের ঢাকির দলটিকে ভাড়া করা হয়েছে ৬৫ হাজার টাকায়। ‘এই চুক্তিতে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা দুটোতেই বাজন অন্তর্ভুক্ত। দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর কালীপূজা।’

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রতন কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর একই দল ভাড়া করি না। বাজনার মান দেখে তাদের নিয়োগ দিই।’

উপজেলার সাহা পাড়ার মন্দিরের মণ্ডপে ঢাকির আরেকটি দল শুধু দুর্গাপূজায় বাজানোর জন্য ৪৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। দলের বাদ্যকর রমেশ বিশ্বাস বলেন, ‘পূজা ব্যস্ততম মৌসুম, যা আমাদের বছরের ৯ মাস ব্যস্ত রাখে। বিয়ে, জন্মদিন, খতনা, এমনকি রাজনৈতিক সমাবেশের মতো অনুষ্ঠানে আমাদের ভাড়া করা হয়। এলাকায় এদল ব্যান্ড পার্টি নামে পরিচিত।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

ইশরাকের অভিযান চালানো সেই স্পটে যৌথ অভিযান, আটক ১৫ জনের কারাদণ্ড

মণ্ডপে শোভিত প্রতিমা, কানে কানে উৎসব পৌঁছে দিচ্ছে ঢাক

আপডেট সময় ০১:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বুড়ো আঙুল, তর্জনী আর মধ্যমা—তিন আঙুলে দুই কাঠি। ঢাকে কাঠির আঘাত পড়ার সময় আঙুলগুলো নড়তে থাকে প্রজাপতির ডানার মতো।

পূজার বাদ্য নামে পরিচিত এই ঢাক বাজানো হচ্ছে শত শত বছর ধরে, একই ধারায়।

বাদ্যকরদের অন্যতম উপাদান ঢাক। সঙ্গে ঢোল, কাঁসি, করতাল, মন্দিরা, খঞ্জনি, সানাই, বাঁশি, ঝনঝনি।

দুর্গাপূজার সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে অন্যতম আকর্ষণ বাদ্যযন্ত্রের দল।

পূজা মৌসুমে বাদ্যকররা তাদের বাড়ি ছেড়ে ছুটে আসেন মণ্ডপে মণ্ডপে। এতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মণ্ডপও তার ব্যতিক্রম নয়।

দিনভর কেউ ঢাক-ঢোল, বাঁশি, কাঁসি, ঝুনঝুনি (ঝুমুর) বাজান।

ছন্দ থাকে একই, কিন্তু লয় বদলায়—কখনো দ্রুত, কখনো মধ্য, কখনো আবার ধীর লয়।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে বাজানো বাদ্যকররা এসেছেন পাশের কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে। উপজেলায় এ বছর অন্তত ৪৬টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব হচ্ছে যেখানে বাজানোর জন্য ৭০ থেকে ৮০ জন বেশি ঢাকি প্রয়োজন।

সন্ধ্যায় উপজেলার উজানচর মণ্ডপে ধূপের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে একদল ভক্ত তখন দেবী দুর্গা ও তার পরিবার—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও মহিষাসুর-এর বেদির সামনে নৃত্য করছিলেন। সন্ধ্যার এই নৃত্যের নাম আরতি।

সেখানে ঢাক বাজাচ্ছিলেন সমীর দাস।

ঢাকি সমীরের ভাষ্য, ‘ঢাকের এই ছন্দের মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে, যা প্রত্যেক বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, এটা রক্তে ঢেউ তোলে।’

আরেক বাদ্যকর স্বপন দাসে ভাষায়, পূজার এই ছন্দ বাজানো হয় ছয়-আট মাত্রার চক্রে, যা ঝুমুর তালের মতো। তিনি বলেন, ‘এটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কারণ ঝুমুর তাল হলো বিশ্বের সব ধরনের লোক সংগীতের অন্তর্নিহিত মৌলিক ছন্দ। এটা এমন এক ছন্দ-কাঠামো, যার সঙ্গে গোটা বিশ্ব আত্মিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে।’

সোমবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাঞ্ছারামপুরের জমিদার বাড়ির পূজামণ্ডপে বাজাচ্ছিল চার ঢাকির একটি দল। দলটি এসেছে নরসিংদির মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রাম থেকে। ছোট দলটি বাজাচ্ছিল দুটি ঢাক, একটি ঢোল ও একটি কাঁসর ঘণ্টা নিয়ে।

দলটির নেতা আশিষ কুমার বলেন, ‘ঢাক আর ঢোলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ঢাক আকারে বড় এবং শুধু এক পাশে বাজানো হয়। ঢোল বাজানো হয় দুই পাশে। ঢাকের বোলই প্রধান ভূমিকা পালন করে; ঢোল ও কাঁসরের বোল কেবল ঢাকের সঙ্গে সংগত করে।’

আশিষ আরো বলেন, ‘দেবী দুর্গা ও কালীর পূজার সঙ্গে এটি চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়; দুজনই শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক।’

কিশোর কমল দাসের হাতে ছিল ঝুনঝুনি। তার ভাষ্য, ‘আমি এটা সিজন্যাল (মৌসুম) করি। পূজো শেষে সেলুনে নাপিতের কাজে ফিরে যাব।’

উজানচরের ঢাকির দলটিকে ভাড়া করা হয়েছে ৬৫ হাজার টাকায়। ‘এই চুক্তিতে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা দুটোতেই বাজন অন্তর্ভুক্ত। দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর কালীপূজা।’

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রতন কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর একই দল ভাড়া করি না। বাজনার মান দেখে তাদের নিয়োগ দিই।’

উপজেলার সাহা পাড়ার মন্দিরের মণ্ডপে ঢাকির আরেকটি দল শুধু দুর্গাপূজায় বাজানোর জন্য ৪৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। দলের বাদ্যকর রমেশ বিশ্বাস বলেন, ‘পূজা ব্যস্ততম মৌসুম, যা আমাদের বছরের ৯ মাস ব্যস্ত রাখে। বিয়ে, জন্মদিন, খতনা, এমনকি রাজনৈতিক সমাবেশের মতো অনুষ্ঠানে আমাদের ভাড়া করা হয়। এলাকায় এদল ব্যান্ড পার্টি নামে পরিচিত।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ