ইসলামে বিয়েকে শুধু সামাজিক বন্ধন হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটি মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত ও সুন্দর করার একটি বৈধ পথ। কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমে মানুষ বৈধভাবে জীবনসঙ্গী লাভ করে, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করতে পারে এবং পরিবার ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে সমাজে নৈতিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিয়ের উল্লেখযোগ্য ১০টি উপকারিতা তুলে ধরা হলো—
১. দ্বীন ও চরিত্র রক্ষায় সহায়ক
বিয়ে মানুষের দ্বীন ও চরিত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রচলিত একটি হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, বিয়ে করলে মানুষের দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ হয়; এরপর বাকি অর্ধেকের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করা উচিত।
এ ছাড়া মহানবী (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, তাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে অধিক সহায়ক। (সহিহ বুখারি)
২. নবীজির সুন্নত পালনের সুযোগ
বিয়ে নবী-রাসুলদের জীবনাচারের অংশ। মহানবী (সা.) নিজে বিয়ে করেছেন এবং সাহাবিদেরও বিয়ের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে সামর্থ্যবান যুবকদের বিয়ে করার নির্দেশ দিয়ে তিনি এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
তাই ইসলামে বিয়েকে শুধু সামাজিক রীতি হিসেবে নয়, বরং সুন্নাহসম্মত জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবেও দেখা হয়।
৩. গুনাহ থেকে বাঁচতে সহায়তা করে
মানুষের স্বাভাবিক যৌন চাহিদাকে ইসলাম অস্বীকার করেনি; বরং তা পূরণের বৈধ পথ হিসেবে বিয়েকে নির্ধারণ করেছে। বিয়ে মানুষকে অবৈধ সম্পর্ক ও যৌন অনাচার থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে সহায়ক। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, তাকে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি)
৪. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতা তৈরি হয়
কোরআনে দাম্পত্য সম্পর্ককে আল্লাহর একটি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে—তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে; আর তিনি তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২১)
দাম্পত্য জীবনের এই ভালোবাসা ও মমতা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
৫. দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি আসে
বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রশান্তি ও স্বস্তির সম্পর্ক তৈরি হওয়া। সুরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে।
অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবন শুধু একসঙ্গে বসবাসের বিষয় নয়; বরং এটি মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দয়ার সম্পর্ক।
৬. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য নিরাপত্তা ও আশ্রয়
কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বোঝাতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি উপমা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদিত ও সুরক্ষিত রাখে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের জন্য নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও আস্থার আশ্রয় হতে পারেন। একে অপরের দুর্বলতা গোপন রাখা, বিপদে পাশে থাকা এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
৭. রিজিক ও কল্যাণের আশার কারণ
বিয়ে জীবনে রিজিক ও কল্যাণ লাভের একটি মাধ্যম হতে পারে। কোরআনে অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, তারা দরিদ্র হলে তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দাও। তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত: ৩২)
এর অর্থ এই নয় যে বিয়ের পর প্রত্যেকের আর্থিক অবস্থা একইভাবে পরিবর্তিত হবে। বরং এ আয়াত আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর পক্ষ থেকে রিজিকের আশাবাদী হওয়ার শিক্ষা দেয়।
৮. বৈধ সন্তান ও বংশধারা প্রতিষ্ঠিত হয়
বিয়ের মাধ্যমে বৈধ পরিবার ও সন্তান-সন্ততির ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জীবনসঙ্গীদের মাধ্যমে সন্তান ও নাতি-নাতনি দান করেছেন। (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৭২)
সন্তান শুধু বংশধারা অব্যাহত রাখে না; সঠিক ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিকতার মাধ্যমে তারা সমাজে কল্যাণের ধারাও এগিয়ে নিতে পারে।
৯. নেককার জীবনসঙ্গী আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগী হন
ইসলামে নেককার জীবনসঙ্গীর গুরুত্ব অনেক বেশি। মহানবী (সা.) বলেছেন, দুনিয়ার সামগ্রীর মধ্যে নেককার স্ত্রী সর্বোত্তম সম্পদ। (সহিহ মুসলিম)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, কোনো নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর বৈধ অধিকার আদায় করে, তাকে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে বলা হবে। (মিশকাতুল মাসাবিহ)
এ থেকে বোঝা যায়, নেককার জীবনসঙ্গী দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর করার পাশাপাশি আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমলের পথে সহযোগী হতে পারেন।
১০. নেককার সন্তানের দোয়া মৃত্যুর পরও উপকারে আসে
সন্তান নেককার ও আল্লাহভীরু হয়ে বেড়ে উঠলে তার দোয়া বাবা-মায়ের জন্য মৃত্যুর পরও উপকারের কারণ হতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ একজন নেককার সন্তান বাবা-মায়ের জন্য শুধু দুনিয়াতেই নয়, পরকালেও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























