ঢাকা ০৪:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দিয়ে ছাদে পাঠদান

অফিসকক্ষের ছাদের ওপর টিনের ছাপরা। সেখানে ঠাসাঠাসি করে বসে পাঠ নিচ্ছে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা।

তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা হয় তাদের। ভিজতে হয় বৃষ্টি এলে। অথচ ২০ লাখ টাকায় নির্মিত নতুন ভবনের সব শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছে দোকানঘর হিসেবে।

এমন অবস্থা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ফজুমিয়ারহাট মাতাব্বরনগর দারুচ্ছুনাত ফাজিল মাদরাসার।

মাদরাসা সূত্রে জানা যায়,১৯৮৬ সালে উপজেলার মাতাব্বরহাট এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মেঘনা নদীর ভাঙনে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার ফজুমিয়ারহাট এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ২৮ জন শিক্ষক ও কর্মচারী মিলে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহায়তা ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় শ্রেণিকক্ষ বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়।

তবে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরই ওই ছয়টি শ্রেণিকক্ষসহ প্রতিষ্ঠানটির মোট ৯টি কক্ষ মাসিক তিন হাজার টাকা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এতে তিন বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া ওঠে।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরনো বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে ছাদে ঠাসাঠাসি করে শিক্ষার্থীদের বসিয়ে তিন ক্লাসের পাঠদান চলছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ক, খ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠদান চলছে ছাদে ছাপড়ার নিচে। তিন ক্লাসের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পাঠ নিচ্ছে সেখানে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, রোদের তীব্রতায় ছাদে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে ক্লাস বন্ধ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। নইলে ভিজতে হয়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকার অভিভাবক ও বিশিষ্টজনদের না জানিয়ে গোপনে নিজের পছন্দের লোক নিয়ে গভর্নিং বডি গঠন করেছেন অধ্যক্ষ মাওলানা আলী হোছাইন। মাদরাসার শ্রেণিকক্ষও ভাড়া দিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে এলাকায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ভাড়া ও মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আয়ের কোনো টাকাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বা মাদরাসার উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

অভিভাবকরা বলছেন, ছাদে রোদের তাপে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ নেওয়া কঠিন। আবার বৃষ্টি হলে টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে। এতে দিনদিন শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরের পাবলিক পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক না হওয়ায় অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানটি ডুবে যাচ্ছে। তা ছাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও গভর্নিং বডির সভাপতির তদারকি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান দিনদিন খারাপ হচ্ছে।

অভিভাবক মো. আবদুর রব ও আনোয়ার হোসেন বলেন, মাদরাসার নিজস্ব ভবনের শ্রেণিকক্ষ দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়ে ওই টাকা কোন খাতে ব্যয় করছে, তার কোনো হিসাব দিচ্ছেন না অধ্যক্ষ।

তাদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অথচ নিজস্ব ভবন থাকার পরও শিক্ষার্থীদের ছাদে ঠাসাঠাসি করে বসিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

এ ব্যাপারে মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলী হোছাইন বলেন, এটা ঠিক যে, শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ছাদের ওপর আরেক তলা করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। সেটা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। নতুন ভবনের ৯টি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

কমলনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। তবে লক্ষ্মীপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘সরেজমিন গিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা দেওয়া হবে।

মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সম্রাট খীসা বলেন, শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি জানতাম না। আপনার কাছে শুনলাম। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দিয়ে ছাদে পাঠদান

আপডেট সময় ০৩:৩৪:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অফিসকক্ষের ছাদের ওপর টিনের ছাপরা। সেখানে ঠাসাঠাসি করে বসে পাঠ নিচ্ছে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা।

তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা হয় তাদের। ভিজতে হয় বৃষ্টি এলে। অথচ ২০ লাখ টাকায় নির্মিত নতুন ভবনের সব শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছে দোকানঘর হিসেবে।

এমন অবস্থা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ফজুমিয়ারহাট মাতাব্বরনগর দারুচ্ছুনাত ফাজিল মাদরাসার।

মাদরাসা সূত্রে জানা যায়,১৯৮৬ সালে উপজেলার মাতাব্বরহাট এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মেঘনা নদীর ভাঙনে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার ফজুমিয়ারহাট এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ২৮ জন শিক্ষক ও কর্মচারী মিলে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহায়তা ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় শ্রেণিকক্ষ বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়।

তবে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরই ওই ছয়টি শ্রেণিকক্ষসহ প্রতিষ্ঠানটির মোট ৯টি কক্ষ মাসিক তিন হাজার টাকা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এতে তিন বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া ওঠে।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরনো বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে ছাদে ঠাসাঠাসি করে শিক্ষার্থীদের বসিয়ে তিন ক্লাসের পাঠদান চলছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ক, খ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠদান চলছে ছাদে ছাপড়ার নিচে। তিন ক্লাসের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পাঠ নিচ্ছে সেখানে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, রোদের তীব্রতায় ছাদে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে ক্লাস বন্ধ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। নইলে ভিজতে হয়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকার অভিভাবক ও বিশিষ্টজনদের না জানিয়ে গোপনে নিজের পছন্দের লোক নিয়ে গভর্নিং বডি গঠন করেছেন অধ্যক্ষ মাওলানা আলী হোছাইন। মাদরাসার শ্রেণিকক্ষও ভাড়া দিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে এলাকায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ভাড়া ও মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আয়ের কোনো টাকাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বা মাদরাসার উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

অভিভাবকরা বলছেন, ছাদে রোদের তাপে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ নেওয়া কঠিন। আবার বৃষ্টি হলে টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে। এতে দিনদিন শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরের পাবলিক পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক না হওয়ায় অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানটি ডুবে যাচ্ছে। তা ছাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও গভর্নিং বডির সভাপতির তদারকি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান দিনদিন খারাপ হচ্ছে।

অভিভাবক মো. আবদুর রব ও আনোয়ার হোসেন বলেন, মাদরাসার নিজস্ব ভবনের শ্রেণিকক্ষ দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়ে ওই টাকা কোন খাতে ব্যয় করছে, তার কোনো হিসাব দিচ্ছেন না অধ্যক্ষ।

তাদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অথচ নিজস্ব ভবন থাকার পরও শিক্ষার্থীদের ছাদে ঠাসাঠাসি করে বসিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

এ ব্যাপারে মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলী হোছাইন বলেন, এটা ঠিক যে, শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ছাদের ওপর আরেক তলা করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। সেটা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। নতুন ভবনের ৯টি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

কমলনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। তবে লক্ষ্মীপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘সরেজমিন গিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা দেওয়া হবে।

মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সম্রাট খীসা বলেন, শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি জানতাম না। আপনার কাছে শুনলাম। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ