ঢাকা ০৪:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর দাপট, আক্রান্ত প্রায় ২ হাজার

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। চলতি বছরের (১০ সেপ্টেম্বর) বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮৫ জন।

বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের (১০ সেপ্টেম্বর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৩ জন।

এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৩৫ জন, নাজিরপুরে ১৪, নেছারাবাদে ১৫, কাউখালীতে ১০, ভান্ডারিয়ায় ১৪ এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৮৮২ জন।

হাসপাতাল ভিত্তিক হিসাবে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৮৮০ জন।

এ ছাড়া ভান্ডারিয়ায় ৩৭৩, নেছারাবাদে ৩৩৯, নাজিরপুরে ১৭৪, কাউখালীতে ১৩৫ এবং মঠবাড়িয়ায় ৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে দেখা দিয়েছে শয্যা ও জায়গার সংকট। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় কিছু রোগীকে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সালমা আক্তার বলেন, ‘দুই-তিন দিন ধরে খুব অসুস্থ।

শরীর দুর্বল, ক্লান্তি ও বমি ভাব যাচ্ছে না। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় থাকার জায়গা ও সেবা পেতে সমস্যা হচ্ছে।’

রহিমা বেগম জানান, তার নাতি গত দুই-তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু হাসপাতালে কোনো সিট খালি না থাকায় ফ্লোরেই চাঁদর বিছিয়ে নাতিকে নিয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে আমরা খুবই কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে আছেন বলে জানান তিনি।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ডেঙ্গু রোগী মশারি ব্যবহারে নিয়ম মানছেন না। দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে অসচেতনতার কারণে তা সরিয়ে রাখছেন।

তবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৩৮ জন। ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস-১ কিট, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছেন।

এদিকে পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনুসন্ধানে সম্প্রতি মাঠে কাজ করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল। তাদের অনুসন্ধানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার বিভিন্ন উৎস শনাক্ত হয়েছে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলায় প্রচুর সুপারি ও নারিকেলগাছ থাকায় কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবেও এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।

সিভিল সার্জন জানান, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন রয়েছে। বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিটও সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পৌরসভা ও জেলা পরিষদও বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, শহরের নালা ও ড্রেনে নিয়মিত স্প্রে করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর দাপট, আক্রান্ত প্রায় ২ হাজার

আপডেট সময় ০৩:৩১:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। চলতি বছরের (১০ সেপ্টেম্বর) বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮৫ জন।

বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের (১০ সেপ্টেম্বর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৩ জন।

এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৩৫ জন, নাজিরপুরে ১৪, নেছারাবাদে ১৫, কাউখালীতে ১০, ভান্ডারিয়ায় ১৪ এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৮৮২ জন।

হাসপাতাল ভিত্তিক হিসাবে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৮৮০ জন।

এ ছাড়া ভান্ডারিয়ায় ৩৭৩, নেছারাবাদে ৩৩৯, নাজিরপুরে ১৭৪, কাউখালীতে ১৩৫ এবং মঠবাড়িয়ায় ৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে দেখা দিয়েছে শয্যা ও জায়গার সংকট। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় কিছু রোগীকে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সালমা আক্তার বলেন, ‘দুই-তিন দিন ধরে খুব অসুস্থ।

শরীর দুর্বল, ক্লান্তি ও বমি ভাব যাচ্ছে না। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় থাকার জায়গা ও সেবা পেতে সমস্যা হচ্ছে।’

রহিমা বেগম জানান, তার নাতি গত দুই-তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু হাসপাতালে কোনো সিট খালি না থাকায় ফ্লোরেই চাঁদর বিছিয়ে নাতিকে নিয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে আমরা খুবই কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে আছেন বলে জানান তিনি।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ডেঙ্গু রোগী মশারি ব্যবহারে নিয়ম মানছেন না। দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে অসচেতনতার কারণে তা সরিয়ে রাখছেন।

তবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৩৮ জন। ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস-১ কিট, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছেন।

এদিকে পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনুসন্ধানে সম্প্রতি মাঠে কাজ করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল। তাদের অনুসন্ধানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার বিভিন্ন উৎস শনাক্ত হয়েছে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলায় প্রচুর সুপারি ও নারিকেলগাছ থাকায় কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবেও এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।

সিভিল সার্জন জানান, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন রয়েছে। বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিটও সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পৌরসভা ও জেলা পরিষদও বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, শহরের নালা ও ড্রেনে নিয়মিত স্প্রে করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ