ঢাকা ০১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়নে যেতে হবে : অর্থমন্ত্রী

রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর অর্থনীতিতে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও পরিহার রোধ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করা হবে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব সম্মেলন শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশের সম্মেলন নয়, এটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের একটি প্ল্যাটফর্ম। কীভাবে নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, সেই পথ নির্ধারণে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো অত্যন্ত কম কর-জিডিপি অনুপাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। এ হার বিশ্বের অন্যতম নিম্ন। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির আকার বাড়লেও সে অনুযায়ী রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। এই ব্যবধান কমাতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর শুধু করের বোঝা বাড়ালে হবে না। বরং করের আওতা বাড়াতে হবে, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করতে হবে, কর ফাঁকি ও পরিহার বন্ধ করতে হবে এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের কমপ্লায়েন্স বাড়াতে হবে।

রাজস্ব প্রশাসনে সরকারের নেওয়া সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগ হবে সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’। বিশেষজ্ঞ এই সংস্থা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে ‘অ্যাকশন টিম’, যারা রাজস্ব আদায় করবে এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকের মতো দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, এ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়। উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ থেকেই করতে হবে।

রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো হলো আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্ব। এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাদের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি সম্পূর্ণ ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ও ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা। এরই মধ্যে ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং পদ্ধতির মতো বিভিন্ন ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সরকার ব্যবসায়ীদের পথের কাঁটা নয়, বরং প্রবৃদ্ধি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে চায়। তবে ব্যবসায়ীদের সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা রাজস্ব পরিহারের সংস্কৃতিতে থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে সৎ করদাতারা যাতে নিরুৎসাহিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্বেই রাজস্ব খাতের এই সংস্কার সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না, নিজস্ব অর্থায়নে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম এবং ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়নে যেতে হবে : অর্থমন্ত্রী

আপডেট সময় ১২:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর অর্থনীতিতে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও পরিহার রোধ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করা হবে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব সম্মেলন শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশের সম্মেলন নয়, এটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের একটি প্ল্যাটফর্ম। কীভাবে নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, সেই পথ নির্ধারণে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো অত্যন্ত কম কর-জিডিপি অনুপাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। এ হার বিশ্বের অন্যতম নিম্ন। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির আকার বাড়লেও সে অনুযায়ী রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। এই ব্যবধান কমাতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর শুধু করের বোঝা বাড়ালে হবে না। বরং করের আওতা বাড়াতে হবে, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করতে হবে, কর ফাঁকি ও পরিহার বন্ধ করতে হবে এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের কমপ্লায়েন্স বাড়াতে হবে।

রাজস্ব প্রশাসনে সরকারের নেওয়া সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগ হবে সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’। বিশেষজ্ঞ এই সংস্থা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে ‘অ্যাকশন টিম’, যারা রাজস্ব আদায় করবে এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকের মতো দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, এ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়। উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ থেকেই করতে হবে।

রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো হলো আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্ব। এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাদের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি সম্পূর্ণ ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ও ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা। এরই মধ্যে ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং পদ্ধতির মতো বিভিন্ন ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সরকার ব্যবসায়ীদের পথের কাঁটা নয়, বরং প্রবৃদ্ধি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে চায়। তবে ব্যবসায়ীদের সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা রাজস্ব পরিহারের সংস্কৃতিতে থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে সৎ করদাতারা যাতে নিরুৎসাহিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্বেই রাজস্ব খাতের এই সংস্কার সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না, নিজস্ব অর্থায়নে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম এবং ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ