পুকুরপাড়ের নিমগাছ, শান বাঁধানো ঘাট, স্মৃতিজড়ানো চেয়ার-টেবিল—সবই আছে ফেনীর ফুলগাজীতে খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়িতে। নেই শুধু সেই মানুষটি, যার স্মৃতিকে ঘিরে এত আয়োজন। পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় ‘পুতুল’। মৃত্যুর পর এবারই তার প্রথম জন্মদিন। তাই আনন্দের বদলে বাড়িজুড়ে নেমে এসেছে শোক আর নীরবতা।
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ ১৫ আগস্ট। দিনটি উপলক্ষে তার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থানে দোয়া, মিলাদ মাহফিল ও স্মরণসভাসহ নানা কর্মসূচি নিয়েছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বছরখানেক আগেও এই দিনটিকে ঘিরে ফুলগাজীর বাড়িতে ছিল নানা আয়োজন ও উৎসবের আমেজ। এবার প্রিয়জনকে ছাড়া জন্মদিনটি পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষাদের।
খালেদা জিয়ার চাচাতো ভাই শামীম মজুমদার বলেন, তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তার অনুপস্থিতিতে এবারের জন্মদিন অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
পরিবারের সদস্যরাও বলছেন, বাড়ির প্রতিটি আঙিনা ও কোণায় কোণায় জড়িয়ে আছে খালেদা জিয়ার স্মৃতি। পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর তাকে স্মরণ করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও। তাদের ভাষায়, তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন আবেগ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক।
এক বিএনপি নেতা স্মৃতিচারণ করে বলেন, কারাগারে যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। গুলশানের কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও খালেদা জিয়া তার খোঁজ নিয়েছিলেন।
আরেক নেতা বলেন, গত বছর এই দিনে খালেদা জিয়া জীবিত ছিলেন, তাই আনন্দও ছিল। কিন্তু এবার খালেদা জিয়াকে ছাড়াই তার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও আন্দোলনের জন্য যে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন, তা ধারণ করার চেষ্টা করবেন নেতাকর্মীরা। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হবে।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে তাদের মাঝে নেই, তবে তিনি দেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তার কর্মময় জীবন ভবিষ্যতেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে প্রবেশ, এরপর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা চড়াই-উতরাইয়ে ভরা।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশ ও বিএনপির সংকটময় সময়ে রাজনীতিতে আসেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। গৃহবন্দিত্ব, কারাবাস ও নানা বাধার মধ্যেও তিনি রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে যান।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। গণতন্ত্রের আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ার গৌরবও অর্জন করেন তিনি।
তার নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে দেশে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। শিক্ষা, নারীশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারেও তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ছিল।
এরপর ১৯৯৬ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি খালেদা জিয়া।
দেশের বাইরে প্রস্থানের সুযোগ করে দিলেও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আর আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা। দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই।”
তার এই অবস্থানই দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাকে চিরকাল ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর প্রয়াণ
শেখ হাসিনার শাসনামলে জেল বন্দীদশায় প্রকৃত সময়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না পাওয়ায় দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর পর লাখো মানুষ জানাজায় অংশ নিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানান।
খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত দিনাজপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ (১৫ আগস্ট) তার জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া, মিলাদ মাহফিল ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।
নেতাকর্মীদের ভাষায়, খালেদা জিয়া আজ আর তাদের মাঝে নেই। তবে গণতন্ত্রের আন্দোলনে তার ভূমিকা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং আপসহীন অবস্থান তাকে মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস























