ঢাকা ০১:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রতিবাদে সিপিবির বিক্ষোভ Logo উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংলাপের প্রস্তাব লি জে মিয়ংয়ের Logo মাদরাসায় ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৫ শিক্ষার্থী Logo মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশজুড়ে ৫ দিন ভারী বৃষ্টির আভাস Logo ৫৮২ টনের ম্যাগনেট দিয়ে ‘কৃত্রিম সূর্য’ তৈরী করছে চীন Logo রাস্তা বন্ধ করে এনসিপির সমাবেশ, ক্ষেপে গেলেন পথচারী Logo ভারতের স্বাধীনতা দিবসে বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ Logo অক্টোবরেই চালু হবে ৫ বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল : প্রধানমন্ত্রী Logo বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তার কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য Logo মা-বাবা হারানো অদম্য তাসফিয়া, ১০ বছর পর হাতিয়ার স্কুলে একমাত্র জিপিএ-৫

ইতিহাসের কাঁটা মুকুট ও এক অদম্য সূর্যসন্তান: শ্রাবণের কান্নায় মহীয়সী নেত্রীর জন্মবার্ষিকী

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। শান্ত দিঘির মতো নিটোল রূপ নিয়ে ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ির এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নিয়েছিল এক কন্যাসন্তান—খালেদা খানম পুতুল। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের স্নেহের ছায়ায় গড়ে ওঠা সেই ছোট্ট পুতুল কি তখন জানতেন, একদিন পুরো বাংলাদেশ তাকে চিনবে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাণ্ডারি হিসেবে?

দিনাজপুরের মুদিপাড়ার দিনগুলো পেরিয়ে ফেনীর শ্রীপুরের রক্তধারা গায়ে মেখে তিনি বড় হয়েছেন এক শান্ত, রূপসী ও মায়াবী নারী হিসেবে। এরপর জীবনে এলেন তরুণ সেনানায়ক জিয়াউর রহমান। গৃহবধূর শান্ত আলোয় বাঁধলেন ঘর, মাতৃত্বের মমতায় কোল আলো করে এলো দুই সন্তান—তারেক ও আরাফাত। সাধারণ এক সেনাপতি-জায়া হিসেবে লালন করছিলেন নিজের ছোট্ট স্বপ্নগুলোকে।

১৯৭১ সালে শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। তৎকালীন সেনাপতি জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন দুই অবুঝ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও পাক হানাদার বাহিনীর বন্দিশালায় কাটাতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। একদিকে স্বামীর জন্য উদ্বেগ, অন্যদিকে সন্তানদের মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে রাখা—সেই অগ্নিপরীক্ষাতেই অঙ্কুরিত হয়েছিল তাঁর ভেতরের এক অদম্য প্রতিবাদী শক্তি।

শ্রাবণের অশ্রুধারায় গণতন্ত্রের এই অদম্য কাণ্ডারির জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া লড়াই, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস আর দেশের মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মহাকাব্য বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। কারানির্যাতন, স্বজন হারানোর বেদনা আর জীবনভর অগণিত চক্রান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি।

রাজপথের লড়াইয়ে আ: লীগ-জামায়াতে বিশ্বাসঘাতকতা
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক নির্মম বুলেটের আঘাতে নিহত হলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। শান্ত গৃহবধূ পুতুলের কাঁধে এক লহমায় নেমে এলো পুরো জাতির শোক ও এক রাজনৈতিক দলের বেঁচে থাকার দায়।

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা অচিরেই রূপ নিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিশিখায়। ঘরে অবরুদ্ধ থাকা সেই নারী রাজপথে নেমে এলেন সেনাপতি হয়ে। রাজপথের ধুলোবালি, পুলিশি টিয়ারশেল, আর গ্রেপ্তারের ভয় তাকে দমাতে পারেনি একচুলও। আপসহীনতার প্রতীক হয়ে ১৯৮৪ সালে হলেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

১৯৮০-র দশকে যখন জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার দেশ আঁকড়ে ধরেছিল, তখন তৎকালীন বিরোধী শক্তির অনেক রাজনৈতিক দলই আপসের পিচ্ছিল পথে হেঁটেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দিতে জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয় ও আঁতাত করে। কিন্তু দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অটল, পর্বতসম দৃঢ়। শত চাপ, জামায়াতের বিশ্বাসঘাতকতা ও আওয়ামী লীগের যুগপৎ আন্দোলনের নাটক সত্ত্বেও তিনি কোনোদিন স্বৈরাচারের সাথে আপস করেননি। অবশেষে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালে অবাধ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও জনগণের বিপুল ভালোবাসায় তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

জামায়াতের বিএনপি হঠাও ষড়যন্ত্র
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পায় (সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি)। সে সময় জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে বাহির থেকে সমর্থন দিয়েছিল এবং বিনিময়ে দুটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছিল। ১৯৯৩ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামী সংসদে ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর দাবিতে বিল জমা দিতে শুরু করে। ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে জামায়াত হাত মেলায় আওয়ামী লীগের সাথে।
ঐ নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ তুলে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে একদফা দাবিতে পরিণত করে। জামায়াত এই সুযোগকে কাজে লাগায়। নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা এবং বিএনপিকে চাপে ফেলার লক্ষ্য থেকে জামায়াত ও জাতীয় পার্টি—উভয় দলই আওয়ামী লীগের সাথে একই ইস্যুতে একাত্মতা প্রকাশ করে।

১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করে। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতসহ বিরোধী সব দল জাতীয় সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করে। ১৯৯৫ সালের পুরো সময়জুড়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে রাজপথে লাগাতার হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে অচল করে তোলার চেষ্টা করে।

১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনের পর যখন বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে, তখন জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে তাল মিলিয়ে সেই নির্বাচন বর্জন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত আওয়ামী লীগের তৈরি করা জোয়ারের অনুকূলে বিএনপির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং বিএনপিকে হারানো ছক কষে। ওই নির্বাচনে জামায়াতের চক্রান্তের কাছে বিএনপিকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল।

জামায়াতের নেতারা বিএনপি’র প্রথম সরকারে অন্তর্ভুক্ত না হলেও ২০০১ সালের ৪-দলীয় জোট সরকারের আমলে (১৯৯৯ সালে জোট গঠনের পর) মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারে জামায়াতের মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মূলত নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো, একক শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং বিএনপিকে ক্ষমতাহীন করে নিজেদের রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো—এই কৌশলগত হিসাব থেকেই ১৯৯৫ সালে জামায়াতে ইসলামী তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আওয়ামী লীগের যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে একে জামায়াতের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা এবং পরবর্তীতে ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপির সাথে জোট গঠনকে রাজনীতির চরম আদর্শহীন সমীকরণ হিসেবে দেখা হয়।

‘এক-এগারো’ ও মঈন-ফখরুদ্দীনের নীলনক্সা
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (‘এক-এগারো’) ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত তথাকথিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের ক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কালো ও বিতর্কিত অধ্যায়। বাহ্যিকভাবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং “রাজনীতি সংস্কারের” কথা বলা হলেও, মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বৃহৎ ও জনপ্রিয় দল বিএনপিকে ধ্বংস করা এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর পটভূমি তৈরি করা।

ক্ষমতা দখলের পরপরই মঈন-ফখরুদ্দীন সরকার তথাকথিত ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নে নেমে পড়ে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই বড় নেত্রীকে মাইনাস করে নতুন রাজনৈতিক কিংস পার্টি (যেমন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর ‘পিডিপি’) প্রতিষ্ঠা করা।

তবে বাস্তবতার ক্ষেত্রে এই নীল নকশার সম্পূর্ণ আঘাতটি গিয়ে পড়ে বিএনপির ওপর। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর অদম্য সাহসিকতা ও স্পষ্ট ঘোষণা—”এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমার মৃত্যু”— সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়।

বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বশূন্য করতে এবং খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে তাঁর দুই সন্তান জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। পঙ্গু করে দেওয়া হয় তারেক রহমানকে। অবশেষে দু’জনকেই জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে ডা. জুবাইদা রহমানকে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করেছিল। যার ঘৃণ্য উদ্দেশ্য ছিল- বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি করা এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা। এলক্ষ্যেই তারা সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের মেধাবী চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমানকে ঢাকা থেকে দূরবর্তী নাগরপুরে বদলি করেছিল। এই বদলি আদেশ মেনে নিয়ে ডা. জুবাইদা রহমান নাগরপুরে যান এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেছিলেন।

এরপরও মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের নীলনক্সা থেমে থাকেনি। চালানো হয় বিএনপি ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র। দলটির ভেতরে সংস্কারপন্থী গ্রুপ তৈরি করে বিএনপিকে বিভক্ত করার প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্র চালায় এই অসাংবিধানিক সরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আচরণ শুরু থেকেই দুই দলের প্রতি দুই রকম ছিল। শেখ হাসিনাকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁর প্রতি সরকারের মনোভাব এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একাংশের সাথে সেনাসমর্থিত সরকারের গোপন সমঝোতা বা “সেফ এক্সিট” সংক্রান্ত আলোচনা চলছিল।

শেখ হাসিনা নিজেই বেশ কয়েকটি বক্তব্যে এক-এগারোর এই অবৈধ সরকারকে নিজেদের আন্দোলনের “ফসল” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাদের সব কর্মকাণ্ডের আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের সবচাইতে বড় নীল নকশা বাস্তবায়িত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ভোটার তালিকা নবায়ন, আসন পুনর্বিন্যাস এবং প্রশাসনিক পদে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের বসিয়ে নির্বাচনকে একতরফা করার সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মূলত ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি যেতে চায়নি। কিন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন আহমেদ) এবং আন্তর্জাতিক মহল (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন)।

ওই নির্বাচনে তৎকালীন প্রভাবশালী সেনাকর্তারা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আসন বন্টন ও ফলাফল কীভাবে আসবে তার একটি সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করেছিল। এই ছকের অংশ হিসাবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য রাখা, মূল নেতাদের কারাগারে বন্দি রাখা এবং প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করে বিএনপিকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।

নির্বাচনের দিন ভোট ডাকাতি, কারচুপি ও প্রশাসনের নগ্ন হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগকে ব্যাপক আসনে জিতানো হয় এবং বিএনপি’র ভরাডুবি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

এই ষড়যন্ত্রের অন্য একটি কারণ ছিল। আর তা ছিল তাদের ‘সেফ এক্সিট’। মঈন-ফখরুদ্দীন চক্র খুব ভালো করেই জানত, অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল এবং রাজনীতিকদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার জন্য গণতান্ত্রিক সরকার আসলে তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের এই আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, ক্ষমতায় আসলে এক-এগারোর সরকারের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
এই “সেফ এক্সিট” পাওয়ার চুক্তি অনুযায়ী তারা অত্যন্ত মসৃণভাবে শেখ হাসিনার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের এই অসাংবিধানিক নীল নকশার ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে বাংলাদেশে ১৫ বছরের দীর্ঘ শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী ও একদলীয় শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। গণতন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দেশের প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার যে বীজ এক-এগারোর অবৈধ সরকার রোপণ করেছিল, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার সেটিকে পূর্ণ রূপ দিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।

বন্দিদশা ও হাসিনাশাসনের পৈশাচিকতা
পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ২০১৩ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় তাঁর গুলশান কার্যালয়ের সামনে সারি সারি বালির বস্তা ফেলে, ট্রাক ও কাঁটাতার দিয়ে তাঁকেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। কার্যালয়ের পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।

এরপর সাজানো মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে ২০১৮ সালে বয়োবৃদ্ধ এই নেত্রীকে পাঠানো হয় নির্জন ও ভেজা পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। শারীরিক অসুস্থতায় যখন তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল, তখনো মেলেনি ন্যূনতম মানবিক চিকিৎসা। লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের ভয়াবহ জটিলতা নিয়ে তিল তিল করে কারাকক্ষেই নিঃশেষ করা হয়েছে তাঁকে।

বিদেশের উন্নত চিকিৎসায় বাধা দিতে শতরকম চক্রান্ত চালানো হয়েছে, যা যেকোনো বিবেকবান মানুষের বুকে রক্তক্ষরণ ঘটায়। মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেওয়ার প্রতিটি আয়োজন সত্ত্বেও তাঁর চোখে ছিল না কোনো করুণার ভিক্ষা; ছিল শুধু দেশের প্রতি এক নিবিড় অটল ভালোবাসা। তাইতো সেদিন এই অকুতোভয় নেত্রী দৃঢ় কন্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন-
“আমি জেল-জুলুমকে ভয় পাই না, আমি ভয় পাই আমার দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের হারিয়ে যাওয়াকে।”

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর প্রহসনের নির্বাচন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন ছিল না; বরং তা ছিল দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে নিশ্চিহ্ন করার এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা স্থায়ী করার এক নজিরবিহীন ও সুগভীর চক্রান্ত।

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একতরফাভাবে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা বাতিল করে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম চক্রান্তটি রচনা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অধীনে প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করা।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও তৎকালীন জোট বর্জন করলে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের নাটক সাজানো হয়। ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনেই কোনো ভোটগ্রহণ ছাড়া সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দেশের জনগণের চরম প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও এই ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাদখল স্থায়ী করে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নজিরবিহীন জেল-জুলুম ও গুম-খুনের রাজত্ব শুরু হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল ইতিহাসের অন্যতম নিপুণ চক্রান্ত। বিএনপির মূল চালিকাশক্তি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে বন্দি করা হয়।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, প্রার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নগ্নভাবে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা হয়।

২৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে অর্থাৎ ভোটের নির্ধারিত দিনের আগের রাতেই পুলিশ, আনসার ও সরকারি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ব্যালট বাক্সে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়। ইতিহাসে এটি “নিশিরাতের ভোট” বা “রাতের ভোট” নামে কুখ্যাতি পায়।

বিএনপিকে ইচ্ছাকৃতভাবে মাত্র কয়েকটি আসনে বিজয়ী দেখিয়ে বাকি সব আসন আওয়ামী লীগ ও তার গৃহপালিত বিরোধী দলকে দিয়ে দেওয়া হয়।

সুদীর্ঘ ১৫ বছরের নির্যাতন সহ্য করে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বিএনপি একদফা দাবিতে রাজপথে অভাবনীয় আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের নীলনকশা ছিল বিএনপিকে যেভাবেই হোক নির্বাচনের বাইরে রাখা এবং একটি ভুয়া নির্বাচনের বৈধতা তৈরি করা।

নির্বাচনের ঠিক আগে ২০২৩ সালের শেষদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মীকে একযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে এবং নেতৃত্বশূন্য করতে প্রতিদিন বিচার বিভাগকে দিয়ে সাজানো মামলায় নেতাদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় নির্বাচনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটার উপস্থিতির ভুয়া দৃশ্য তৈরি করতে আওয়ামী লীগ নিজেদের দলের লোকদেরই নির্দলীয় ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে দাঁড় করায়। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি “আমি আর ডামি”-র নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।

হাসিনামুক্ত বাংলাদেশে মহামানবীর কণ্ঠস্বর
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর যখন চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা ও প্রতিশোধের অগ্নিকুণ্ড জ্বলে ওঠার উপক্রম হয়েছিল, তখন হাসপাতাল শয্যায় শুয়ে থাকা এই অদম্য নেত্রীই শোনালেন শান্তির অমিয় বাণী।

দেশের মানুষকে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে, প্রতিহিংসা ভুলে গিয়ে শান্তিময় দেশ গড়ার ঐতিহাসিক আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন-
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। দীর্ঘ দিন অসুস্থতার পর আপনাদের সামনে কথা বলতে পারার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা ক্রমান্বয়ে ফ্যাসিবাদী ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। যে বীর সন্তানেরা মরণপণ সংগ্রাম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি শত শত শহীদের প্রতি। এই বিজয় আমাদের সামনে এনে দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার। দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আমাদের এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। ছাত্র-তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণরা যে স্বপ্নের জন্য রক্ত ঝরিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শান্তিময়, প্রগতিশীল ও সাম্যের ভিত্তিতে এক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আসুন আমরা তরুণদের হাতকে শক্তিশালী করি। ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়—ভালোবাসা ও শান্তির মাধ্যমে আমাদের একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।আল্লাহ আমাদের সবার সহায় হোন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।”

তার এই ভাষণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নিজের জীবনের ওপর হওয়া সমস্ত পৈশাচিক অত্যাচার ভুলে গিয়েও তিনি চেয়েছেন কেবল একটি নিরাপদ ও শান্ত বাংলাদেশ।

মহাপ্রস্থান ও কোটি জনতার চোখে জল
অবশেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে ওপারে পাড়ি জমালেন এই আপসহীন দেশনেত্রী। রাজধানী এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে পাশে ছিলেন তাঁর পরম স্নেহের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি।

স্বজনদের অশ্রুসজল চোখে আর কোটি জনতার হাহাকারে ভেসে গেল পুরো বাংলাদেশ। তাঁর জানাজায় ঢল নেমেছিল কোটি মানুষের। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য— দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসে অঝোর ধারায় কাঁদছিল তাদের প্রিয় নেত্রীর জন্য। আকাশে-বাতাসে কেবল একটিই সুর ধ্বনিত হচ্ছিল— বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, ইতিহাস যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন এই ‘আপসহীন’ সূর্যসন্তানের ত্যাগ, অপমান সয়ে যাওয়ার মহত্ত্ব ও অদম্য সংগ্রাম এ দেশের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রতিবাদে সিপিবির বিক্ষোভ

ইতিহাসের কাঁটা মুকুট ও এক অদম্য সূর্যসন্তান: শ্রাবণের কান্নায় মহীয়সী নেত্রীর জন্মবার্ষিকী

আপডেট সময় ০৬:১৫:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। শান্ত দিঘির মতো নিটোল রূপ নিয়ে ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ির এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নিয়েছিল এক কন্যাসন্তান—খালেদা খানম পুতুল। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের স্নেহের ছায়ায় গড়ে ওঠা সেই ছোট্ট পুতুল কি তখন জানতেন, একদিন পুরো বাংলাদেশ তাকে চিনবে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাণ্ডারি হিসেবে?

দিনাজপুরের মুদিপাড়ার দিনগুলো পেরিয়ে ফেনীর শ্রীপুরের রক্তধারা গায়ে মেখে তিনি বড় হয়েছেন এক শান্ত, রূপসী ও মায়াবী নারী হিসেবে। এরপর জীবনে এলেন তরুণ সেনানায়ক জিয়াউর রহমান। গৃহবধূর শান্ত আলোয় বাঁধলেন ঘর, মাতৃত্বের মমতায় কোল আলো করে এলো দুই সন্তান—তারেক ও আরাফাত। সাধারণ এক সেনাপতি-জায়া হিসেবে লালন করছিলেন নিজের ছোট্ট স্বপ্নগুলোকে।

১৯৭১ সালে শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। তৎকালীন সেনাপতি জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন দুই অবুঝ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও পাক হানাদার বাহিনীর বন্দিশালায় কাটাতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। একদিকে স্বামীর জন্য উদ্বেগ, অন্যদিকে সন্তানদের মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে রাখা—সেই অগ্নিপরীক্ষাতেই অঙ্কুরিত হয়েছিল তাঁর ভেতরের এক অদম্য প্রতিবাদী শক্তি।

শ্রাবণের অশ্রুধারায় গণতন্ত্রের এই অদম্য কাণ্ডারির জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া লড়াই, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস আর দেশের মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মহাকাব্য বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। কারানির্যাতন, স্বজন হারানোর বেদনা আর জীবনভর অগণিত চক্রান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি।

রাজপথের লড়াইয়ে আ: লীগ-জামায়াতে বিশ্বাসঘাতকতা
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক নির্মম বুলেটের আঘাতে নিহত হলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। শান্ত গৃহবধূ পুতুলের কাঁধে এক লহমায় নেমে এলো পুরো জাতির শোক ও এক রাজনৈতিক দলের বেঁচে থাকার দায়।

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা অচিরেই রূপ নিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিশিখায়। ঘরে অবরুদ্ধ থাকা সেই নারী রাজপথে নেমে এলেন সেনাপতি হয়ে। রাজপথের ধুলোবালি, পুলিশি টিয়ারশেল, আর গ্রেপ্তারের ভয় তাকে দমাতে পারেনি একচুলও। আপসহীনতার প্রতীক হয়ে ১৯৮৪ সালে হলেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

১৯৮০-র দশকে যখন জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার দেশ আঁকড়ে ধরেছিল, তখন তৎকালীন বিরোধী শক্তির অনেক রাজনৈতিক দলই আপসের পিচ্ছিল পথে হেঁটেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দিতে জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয় ও আঁতাত করে। কিন্তু দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অটল, পর্বতসম দৃঢ়। শত চাপ, জামায়াতের বিশ্বাসঘাতকতা ও আওয়ামী লীগের যুগপৎ আন্দোলনের নাটক সত্ত্বেও তিনি কোনোদিন স্বৈরাচারের সাথে আপস করেননি। অবশেষে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালে অবাধ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও জনগণের বিপুল ভালোবাসায় তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

জামায়াতের বিএনপি হঠাও ষড়যন্ত্র
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পায় (সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি)। সে সময় জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে বাহির থেকে সমর্থন দিয়েছিল এবং বিনিময়ে দুটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছিল। ১৯৯৩ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামী সংসদে ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর দাবিতে বিল জমা দিতে শুরু করে। ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে জামায়াত হাত মেলায় আওয়ামী লীগের সাথে।
ঐ নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ তুলে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে একদফা দাবিতে পরিণত করে। জামায়াত এই সুযোগকে কাজে লাগায়। নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা এবং বিএনপিকে চাপে ফেলার লক্ষ্য থেকে জামায়াত ও জাতীয় পার্টি—উভয় দলই আওয়ামী লীগের সাথে একই ইস্যুতে একাত্মতা প্রকাশ করে।

১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করে। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতসহ বিরোধী সব দল জাতীয় সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করে। ১৯৯৫ সালের পুরো সময়জুড়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে রাজপথে লাগাতার হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে অচল করে তোলার চেষ্টা করে।

১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনের পর যখন বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে, তখন জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে তাল মিলিয়ে সেই নির্বাচন বর্জন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত আওয়ামী লীগের তৈরি করা জোয়ারের অনুকূলে বিএনপির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং বিএনপিকে হারানো ছক কষে। ওই নির্বাচনে জামায়াতের চক্রান্তের কাছে বিএনপিকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল।

জামায়াতের নেতারা বিএনপি’র প্রথম সরকারে অন্তর্ভুক্ত না হলেও ২০০১ সালের ৪-দলীয় জোট সরকারের আমলে (১৯৯৯ সালে জোট গঠনের পর) মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারে জামায়াতের মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মূলত নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো, একক শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং বিএনপিকে ক্ষমতাহীন করে নিজেদের রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো—এই কৌশলগত হিসাব থেকেই ১৯৯৫ সালে জামায়াতে ইসলামী তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আওয়ামী লীগের যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে একে জামায়াতের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা এবং পরবর্তীতে ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপির সাথে জোট গঠনকে রাজনীতির চরম আদর্শহীন সমীকরণ হিসেবে দেখা হয়।

‘এক-এগারো’ ও মঈন-ফখরুদ্দীনের নীলনক্সা
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (‘এক-এগারো’) ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত তথাকথিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের ক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কালো ও বিতর্কিত অধ্যায়। বাহ্যিকভাবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং “রাজনীতি সংস্কারের” কথা বলা হলেও, মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বৃহৎ ও জনপ্রিয় দল বিএনপিকে ধ্বংস করা এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর পটভূমি তৈরি করা।

ক্ষমতা দখলের পরপরই মঈন-ফখরুদ্দীন সরকার তথাকথিত ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নে নেমে পড়ে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই বড় নেত্রীকে মাইনাস করে নতুন রাজনৈতিক কিংস পার্টি (যেমন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর ‘পিডিপি’) প্রতিষ্ঠা করা।

তবে বাস্তবতার ক্ষেত্রে এই নীল নকশার সম্পূর্ণ আঘাতটি গিয়ে পড়ে বিএনপির ওপর। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর অদম্য সাহসিকতা ও স্পষ্ট ঘোষণা—”এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমার মৃত্যু”— সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়।

বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বশূন্য করতে এবং খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে তাঁর দুই সন্তান জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। পঙ্গু করে দেওয়া হয় তারেক রহমানকে। অবশেষে দু’জনকেই জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে ডা. জুবাইদা রহমানকে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করেছিল। যার ঘৃণ্য উদ্দেশ্য ছিল- বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি করা এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা। এলক্ষ্যেই তারা সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের মেধাবী চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমানকে ঢাকা থেকে দূরবর্তী নাগরপুরে বদলি করেছিল। এই বদলি আদেশ মেনে নিয়ে ডা. জুবাইদা রহমান নাগরপুরে যান এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেছিলেন।

এরপরও মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের নীলনক্সা থেমে থাকেনি। চালানো হয় বিএনপি ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র। দলটির ভেতরে সংস্কারপন্থী গ্রুপ তৈরি করে বিএনপিকে বিভক্ত করার প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্র চালায় এই অসাংবিধানিক সরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আচরণ শুরু থেকেই দুই দলের প্রতি দুই রকম ছিল। শেখ হাসিনাকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁর প্রতি সরকারের মনোভাব এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একাংশের সাথে সেনাসমর্থিত সরকারের গোপন সমঝোতা বা “সেফ এক্সিট” সংক্রান্ত আলোচনা চলছিল।

শেখ হাসিনা নিজেই বেশ কয়েকটি বক্তব্যে এক-এগারোর এই অবৈধ সরকারকে নিজেদের আন্দোলনের “ফসল” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাদের সব কর্মকাণ্ডের আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের সবচাইতে বড় নীল নকশা বাস্তবায়িত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ভোটার তালিকা নবায়ন, আসন পুনর্বিন্যাস এবং প্রশাসনিক পদে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের বসিয়ে নির্বাচনকে একতরফা করার সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মূলত ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি যেতে চায়নি। কিন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন আহমেদ) এবং আন্তর্জাতিক মহল (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন)।

ওই নির্বাচনে তৎকালীন প্রভাবশালী সেনাকর্তারা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আসন বন্টন ও ফলাফল কীভাবে আসবে তার একটি সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করেছিল। এই ছকের অংশ হিসাবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য রাখা, মূল নেতাদের কারাগারে বন্দি রাখা এবং প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করে বিএনপিকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।

নির্বাচনের দিন ভোট ডাকাতি, কারচুপি ও প্রশাসনের নগ্ন হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগকে ব্যাপক আসনে জিতানো হয় এবং বিএনপি’র ভরাডুবি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

এই ষড়যন্ত্রের অন্য একটি কারণ ছিল। আর তা ছিল তাদের ‘সেফ এক্সিট’। মঈন-ফখরুদ্দীন চক্র খুব ভালো করেই জানত, অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল এবং রাজনীতিকদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার জন্য গণতান্ত্রিক সরকার আসলে তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের এই আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, ক্ষমতায় আসলে এক-এগারোর সরকারের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
এই “সেফ এক্সিট” পাওয়ার চুক্তি অনুযায়ী তারা অত্যন্ত মসৃণভাবে শেখ হাসিনার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের এই অসাংবিধানিক নীল নকশার ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে বাংলাদেশে ১৫ বছরের দীর্ঘ শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী ও একদলীয় শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। গণতন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দেশের প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার যে বীজ এক-এগারোর অবৈধ সরকার রোপণ করেছিল, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার সেটিকে পূর্ণ রূপ দিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।

বন্দিদশা ও হাসিনাশাসনের পৈশাচিকতা
পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ২০১৩ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় তাঁর গুলশান কার্যালয়ের সামনে সারি সারি বালির বস্তা ফেলে, ট্রাক ও কাঁটাতার দিয়ে তাঁকেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। কার্যালয়ের পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।

এরপর সাজানো মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে ২০১৮ সালে বয়োবৃদ্ধ এই নেত্রীকে পাঠানো হয় নির্জন ও ভেজা পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। শারীরিক অসুস্থতায় যখন তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল, তখনো মেলেনি ন্যূনতম মানবিক চিকিৎসা। লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের ভয়াবহ জটিলতা নিয়ে তিল তিল করে কারাকক্ষেই নিঃশেষ করা হয়েছে তাঁকে।

বিদেশের উন্নত চিকিৎসায় বাধা দিতে শতরকম চক্রান্ত চালানো হয়েছে, যা যেকোনো বিবেকবান মানুষের বুকে রক্তক্ষরণ ঘটায়। মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেওয়ার প্রতিটি আয়োজন সত্ত্বেও তাঁর চোখে ছিল না কোনো করুণার ভিক্ষা; ছিল শুধু দেশের প্রতি এক নিবিড় অটল ভালোবাসা। তাইতো সেদিন এই অকুতোভয় নেত্রী দৃঢ় কন্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন-
“আমি জেল-জুলুমকে ভয় পাই না, আমি ভয় পাই আমার দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের হারিয়ে যাওয়াকে।”

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর প্রহসনের নির্বাচন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন ছিল না; বরং তা ছিল দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে নিশ্চিহ্ন করার এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা স্থায়ী করার এক নজিরবিহীন ও সুগভীর চক্রান্ত।

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একতরফাভাবে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা বাতিল করে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম চক্রান্তটি রচনা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অধীনে প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করা।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও তৎকালীন জোট বর্জন করলে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের নাটক সাজানো হয়। ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনেই কোনো ভোটগ্রহণ ছাড়া সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দেশের জনগণের চরম প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও এই ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাদখল স্থায়ী করে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নজিরবিহীন জেল-জুলুম ও গুম-খুনের রাজত্ব শুরু হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল ইতিহাসের অন্যতম নিপুণ চক্রান্ত। বিএনপির মূল চালিকাশক্তি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে বন্দি করা হয়।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, প্রার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নগ্নভাবে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা হয়।

২৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে অর্থাৎ ভোটের নির্ধারিত দিনের আগের রাতেই পুলিশ, আনসার ও সরকারি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ব্যালট বাক্সে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়। ইতিহাসে এটি “নিশিরাতের ভোট” বা “রাতের ভোট” নামে কুখ্যাতি পায়।

বিএনপিকে ইচ্ছাকৃতভাবে মাত্র কয়েকটি আসনে বিজয়ী দেখিয়ে বাকি সব আসন আওয়ামী লীগ ও তার গৃহপালিত বিরোধী দলকে দিয়ে দেওয়া হয়।

সুদীর্ঘ ১৫ বছরের নির্যাতন সহ্য করে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বিএনপি একদফা দাবিতে রাজপথে অভাবনীয় আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের নীলনকশা ছিল বিএনপিকে যেভাবেই হোক নির্বাচনের বাইরে রাখা এবং একটি ভুয়া নির্বাচনের বৈধতা তৈরি করা।

নির্বাচনের ঠিক আগে ২০২৩ সালের শেষদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মীকে একযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে এবং নেতৃত্বশূন্য করতে প্রতিদিন বিচার বিভাগকে দিয়ে সাজানো মামলায় নেতাদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় নির্বাচনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটার উপস্থিতির ভুয়া দৃশ্য তৈরি করতে আওয়ামী লীগ নিজেদের দলের লোকদেরই নির্দলীয় ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে দাঁড় করায়। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি “আমি আর ডামি”-র নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।

হাসিনামুক্ত বাংলাদেশে মহামানবীর কণ্ঠস্বর
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর যখন চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা ও প্রতিশোধের অগ্নিকুণ্ড জ্বলে ওঠার উপক্রম হয়েছিল, তখন হাসপাতাল শয্যায় শুয়ে থাকা এই অদম্য নেত্রীই শোনালেন শান্তির অমিয় বাণী।

দেশের মানুষকে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে, প্রতিহিংসা ভুলে গিয়ে শান্তিময় দেশ গড়ার ঐতিহাসিক আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন-
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। দীর্ঘ দিন অসুস্থতার পর আপনাদের সামনে কথা বলতে পারার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা ক্রমান্বয়ে ফ্যাসিবাদী ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। যে বীর সন্তানেরা মরণপণ সংগ্রাম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি শত শত শহীদের প্রতি। এই বিজয় আমাদের সামনে এনে দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার। দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আমাদের এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। ছাত্র-তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণরা যে স্বপ্নের জন্য রক্ত ঝরিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শান্তিময়, প্রগতিশীল ও সাম্যের ভিত্তিতে এক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আসুন আমরা তরুণদের হাতকে শক্তিশালী করি। ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়—ভালোবাসা ও শান্তির মাধ্যমে আমাদের একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।আল্লাহ আমাদের সবার সহায় হোন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।”

তার এই ভাষণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নিজের জীবনের ওপর হওয়া সমস্ত পৈশাচিক অত্যাচার ভুলে গিয়েও তিনি চেয়েছেন কেবল একটি নিরাপদ ও শান্ত বাংলাদেশ।

মহাপ্রস্থান ও কোটি জনতার চোখে জল
অবশেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে ওপারে পাড়ি জমালেন এই আপসহীন দেশনেত্রী। রাজধানী এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে পাশে ছিলেন তাঁর পরম স্নেহের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি।

স্বজনদের অশ্রুসজল চোখে আর কোটি জনতার হাহাকারে ভেসে গেল পুরো বাংলাদেশ। তাঁর জানাজায় ঢল নেমেছিল কোটি মানুষের। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য— দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসে অঝোর ধারায় কাঁদছিল তাদের প্রিয় নেত্রীর জন্য। আকাশে-বাতাসে কেবল একটিই সুর ধ্বনিত হচ্ছিল— বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, ইতিহাস যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন এই ‘আপসহীন’ সূর্যসন্তানের ত্যাগ, অপমান সয়ে যাওয়ার মহত্ত্ব ও অদম্য সংগ্রাম এ দেশের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি