চারশত পঞ্চান্ন বছরের এক ধ্রুপদী মহাকাব্য, যে প্রেমের স্থাপত্য রচনা করা করেছিলেন এক প্রেমময়ী সম্রাজ্ঞী। তবে সেই অমর কীর্তি কি আজ ইতিহাসের পাতা ছেড়ে মিশে যাচ্ছে দিল্লির বিষাক্ত বাতাসে? বলছি মোগল সম্রাট হুমায়ুনের ঐতিহাসিক সমাধিসৌধের কথা।
তাজমহল যদি হয় স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসার অমর নিশান, তবে দিল্লিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধিসৌধটি হলো স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এক গভীর অনুরাগের চিহ্ন। সম্রাজ্ঞী বেগা বেগম সাড়ে চারশত বছর আগে লাল বেলেপাথর আর শুভ্র মার্বেল পাথরে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ভারত উপমহাদেশের প্রথম বিশাল বাগান-সমাধিসৌধ। অথচ কালের পরিক্রমায় সেই ঐতিহাসিক বিস্ময় আজ নিভৃত কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে। দিল্লির বাতাস এখন আর নিছক বাতাস নেই, তা যেন রূপ নিয়েছে এক অদৃশ্য এসিডে।
আইআইটি-রুরকি এবং আইআইটি-কানপুরের সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এক নির্মম সত্য। দূষণের বিষাক্ত থাবায় ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই অমূল্য নিদর্শন। গবেষণার তথ্য বলছে, বাতাসে ভেসে থাকা সালফার ডাই-অক্সাইড, ধূলিকণা আর আর্দ্রতার সাথে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করছে জিপসাম। আর সেই জিপসামের সাথে যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটার কালি আর ধাতব কণা মিলে এই লাল পাথরের ওপর তৈরি করেছে এক ভয়ংকর কুচকুচে কালো আস্তরণ।
যে অংশগুলো বৃষ্টির সরাসরি স্পর্শ পায় না, সেখানে এই বিষাক্ত আস্তরণ জমেছে সবচেয়ে পুরু হয়ে। এটি কেবল বাহ্যিক কোনো দাগ নয়; এই ডাইনি আস্তরণ ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে চার শতকের প্রাচীন বেলেপাথরকে, যা স্মৃতিস্তম্ভটিকে ঠেলে দিচ্ছে চিরতরে মুছে যাওয়ার মুখে।
তাজমহলকে বাঁচাতে আগ্রায় ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চলাচলে কত বিধিনিষেধ, কত শত কঠোর প্রহর! অথচ যার অলঙ্করণ আর জ্যামিতিক নকশাকে অনুকরণ করে তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য তাজমহল, সেই হুমায়ুনের সমাধিসৌধ ক্ষয়ের পথে দিল্লির বিষাক্ত ধোঁয়াশার রাজত্বে। পরিবেশবান্ধব পরিবহন আর সময়মতো বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণের ছোঁয়া না পেলে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই ভালোবাসার স্মৃতি হয়তো অকালেই হারিয়ে যাবে ইতিহাসের নিকষ কালো অন্ধকারে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস

























