ঢাকা ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজ বন্ধু দিবস

যে সম্পর্কের নেই বয়স, নেই কোনো সীমানা

‘বন্ধু, খবর কী বল? কতদিন দেখা হয়নি।’

একটি মাত্র বাক্যই যেন বহু বছরের দূরত্ব মুছে দিতে পারে। বন্ধুত্ব এমনই এক সম্পর্ক, যার কোনো বয়স নেই, নেই রক্তের বন্ধনের বাধ্যবাধকতা। সমবয়সীদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তেমনি বয়সে ছোট-বড় কিংবা ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষও হতে পারেন পরম বন্ধু। এই সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস, আন্তরিকতা আর একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার।

আজ আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে। যদিও এমন একটি সম্পর্ককে নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তারিখে বেঁধে রাখা যায় না। তারপরও এই দিনটি পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, স্মৃতি রোমন্থন কিংবা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

কীভাবে এলো বন্ধু দিবস?

বন্ধু দিবসের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩০ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বন্ধু দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা হাওয়ার্ড হল ২ আগস্টকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বন্ধুদের শুভেচ্ছা কার্ড, ফুল ও উপহার বিনিময়ের প্রচার চালান। তবে ক্রেতাদের আগ্রহ কম থাকায় সেই উদ্যোগ খুব বেশি সফল হয়নি।

পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারকে ‘জাতীয় বন্ধু দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ধীরে ধীরে দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

আরেকটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি ঘটনার প্রতিবাদে এক ব্যক্তি তার বন্ধুর মৃত্যুর পরদিন আত্মহত্যা করেন। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েও বন্ধু দিবস জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালে সেখানে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধু দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাবও আসে প্যারাগুয়ে থেকেই।

২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছরের ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এখনও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে আগস্টের প্রথম রবিবারই বন্ধু দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।

বদলে গেছে উদযাপনের ধরন

একসময় বন্ধু দিবসে শুভেচ্ছা কার্ড, চকলেট কিংবা ছোট উপহার বিনিময়ের প্রচলন ছিল। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পুরোনো ছবির কোলাজ, স্মৃতিচারণ, বন্ধুদের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা আড্ডার ছবি শেয়ার করেই দিনটি উদযাপন করেন অনেকেই।

কেন প্রয়োজন বন্ধুত্ব?

মনোবিশ্লেষকদের মতে, বন্ধুত্ব শুধু বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের প্রায় সব সম্পর্কেই বন্ধুত্বের প্রয়োজন রয়েছে। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কেও বন্ধুত্ব থাকলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাস আরও গভীর হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ধীরে ধীরে একাকী করে তুলছে। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাটিয়ে উঠতে আন্তরিক বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, বন্ধুহীন মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। মানুষের জীবনে এমন একজন প্রয়োজন, যার কাছে নিজের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখবে। এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানুষকে একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।

সম্পর্কের নামই বন্ধুত্ব

সত্যিকারের বন্ধুত্বে অহংকার নেই, হিংসা নেই, নেই কোনো হিসাব-নিকাশ। মনের সঙ্গে মনের মিল থেকেই জন্ম নেয় এই সম্পর্ক। অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব।

তাই বন্ধু দিবস শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়; এটি প্রিয় মানুষদের মনে করিয়ে দেওয়ারও দিন—জীবনের ব্যস্ততা যতই বাড়ুক, সত্যিকারের বন্ধু কখনও পুরোনো হয় না।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

আজ বন্ধু দিবস

যে সম্পর্কের নেই বয়স, নেই কোনো সীমানা

আপডেট সময় ১১:৪২:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

‘বন্ধু, খবর কী বল? কতদিন দেখা হয়নি।’

একটি মাত্র বাক্যই যেন বহু বছরের দূরত্ব মুছে দিতে পারে। বন্ধুত্ব এমনই এক সম্পর্ক, যার কোনো বয়স নেই, নেই রক্তের বন্ধনের বাধ্যবাধকতা। সমবয়সীদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তেমনি বয়সে ছোট-বড় কিংবা ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষও হতে পারেন পরম বন্ধু। এই সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস, আন্তরিকতা আর একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার।

আজ আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে। যদিও এমন একটি সম্পর্ককে নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তারিখে বেঁধে রাখা যায় না। তারপরও এই দিনটি পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, স্মৃতি রোমন্থন কিংবা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

কীভাবে এলো বন্ধু দিবস?

বন্ধু দিবসের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩০ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বন্ধু দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা হাওয়ার্ড হল ২ আগস্টকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বন্ধুদের শুভেচ্ছা কার্ড, ফুল ও উপহার বিনিময়ের প্রচার চালান। তবে ক্রেতাদের আগ্রহ কম থাকায় সেই উদ্যোগ খুব বেশি সফল হয়নি।

পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারকে ‘জাতীয় বন্ধু দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ধীরে ধীরে দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

আরেকটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি ঘটনার প্রতিবাদে এক ব্যক্তি তার বন্ধুর মৃত্যুর পরদিন আত্মহত্যা করেন। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েও বন্ধু দিবস জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালে সেখানে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধু দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাবও আসে প্যারাগুয়ে থেকেই।

২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছরের ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এখনও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে আগস্টের প্রথম রবিবারই বন্ধু দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।

বদলে গেছে উদযাপনের ধরন

একসময় বন্ধু দিবসে শুভেচ্ছা কার্ড, চকলেট কিংবা ছোট উপহার বিনিময়ের প্রচলন ছিল। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পুরোনো ছবির কোলাজ, স্মৃতিচারণ, বন্ধুদের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা আড্ডার ছবি শেয়ার করেই দিনটি উদযাপন করেন অনেকেই।

কেন প্রয়োজন বন্ধুত্ব?

মনোবিশ্লেষকদের মতে, বন্ধুত্ব শুধু বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের প্রায় সব সম্পর্কেই বন্ধুত্বের প্রয়োজন রয়েছে। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কেও বন্ধুত্ব থাকলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাস আরও গভীর হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ধীরে ধীরে একাকী করে তুলছে। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাটিয়ে উঠতে আন্তরিক বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, বন্ধুহীন মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। মানুষের জীবনে এমন একজন প্রয়োজন, যার কাছে নিজের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখবে। এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানুষকে একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।

সম্পর্কের নামই বন্ধুত্ব

সত্যিকারের বন্ধুত্বে অহংকার নেই, হিংসা নেই, নেই কোনো হিসাব-নিকাশ। মনের সঙ্গে মনের মিল থেকেই জন্ম নেয় এই সম্পর্ক। অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব।

তাই বন্ধু দিবস শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়; এটি প্রিয় মানুষদের মনে করিয়ে দেওয়ারও দিন—জীবনের ব্যস্ততা যতই বাড়ুক, সত্যিকারের বন্ধু কখনও পুরোনো হয় না।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস