ঢাকা ১১:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালজয়ী কথাশিল্পী প্যারীচাঁদ মিত্র: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

কালজয়ী কথাশিল্পী প্যারীচাঁদ মিত্র। ছবি এআই দিয়ে বানানো

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে যিনি একাকী পথ কেটে তৈরি করেছিলেন আধুনিক গদ্যের মহাসড়ক, তিনি প্যারীচাঁদ মিত্র। ছদ্মনাম ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ হলেও তাঁর কাজের মহিমা লুকিয়ে রাখার সাধ সাধ্যের অতীত ছিল। ১৮১৪ সালের ২২ জুলাই তিলত্তমা কলকাতার বুক চিরে যার আগমন ঘটেছিল, তিনি কেবল একটি যুগের সাহিত্যিক নন; তিনি ছিলেন এক অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটানো দীপ্ত আলোকমশাল।

কলকাতার এক সচ্ছল ও ঐতিহ্যবাহী বণিক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। তাঁর পিতা রামনারায়ণ মিত্র ছিলেন তৎকালীন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত কাগজ ও হুন্ডি ব্যবসায়ী। পিতার ব্যবসায়িক সাফল্য ও পারিবারিক সমৃদ্ধি তাঁর শৈশবকে অর্থকষ্ট থেকে দূরে রাখলেও, তাঁদের আত্মিক শিকড় প্রোথিত ছিল হুগলির শান্ত-স্নিগ্ধ পাণিসেহালা গ্রামে। ভ্রাতা কিশোরীচাঁদ মিত্রের সান্নিধ্য ও প্রগতিশীল পারিবারিক আবহাওয়া শৈশব থেকেই প্যারীচাঁদের মেধা ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে তোলে।

সংস্কৃত পাঠশালার প্রথাগত শিক্ষা কিংবা গৃহশিক্ষক মুন্সির কাছে ফারসি পাঠের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হলেও, তাঁর জীবনচেতনার আসল পরিবর্তন ঘটে হিন্দু কলেজে। সেখানে তিনি পাশে পান মুক্তচিন্তার রূপকার হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে। ডিরোজিওর সাহচর্য ও ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের প্রভাব তাঁর ভেতর এক বৈপ্লবিক মানসিকতার জন্ম দেয়।

প্যারীচাঁদের সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল না; তাঁর আসল সংগ্রাম ছিল তৎকালীন সমাজের আড়ষ্টতা, কুসংস্কার ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে। ১৮৩৮ সালে জ্ঞানান্বেষণ সভার সাথে যুক্ত হয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধরেন। একদিকে ব্যবসায়িক জগতে সফলতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সমাজের রক্ষণশীল মহলের চক্ষুশূল হওয়ার ঝুঁকি-  দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

ব্যবসায়িক জীবনে আমদানি-রপ্তানি ও চালের ব্যবসা করে অঢেল অর্থের মালিক হলেও, প্যারীচাঁদ সমাজের অবহেলিত মানুষের বঞ্চনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই দেখা কেবল নিরব দর্শকের মতো ছিল না; তাঁর কলম আছড়ে পড়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তৎকালীন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথার সুযোগ নিয়ে জমিদাররা যখন সাধারণ প্রজাদের শুষে নিচ্ছিল, তখন তিনি রচনা করেন তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘The Zemindar and Ryots’। এতে তিনি শোষিত কৃষকদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে শাসকশ্রেণীকে কাঠগড়ায় তোলেন।

 তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশি ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থার সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন রুখতে তিনি একক সংগ্রাম চালিয়েছিলেন এবং সাফল্য অর্জন করেছিলেন।

নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহের সমর্থন এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের মতো ভয়াবহ বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন।

কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির একজন সাধারণ লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে নিজ মেধা ও নিষ্ঠায় পরবর্তীতে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি পদে উন্নীত হন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য পদ অলঙ্কৃত করেন।

কিন্তু সাহিত্যের দরবারে তিনি অমর হয়ে রইলেন ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের মাধ্যমে। পণ্ডিতি ভাষার শৃৃঙ্খল ভেঙে সাধারণ মানুষের রূপক ও চলতি ভাষাকে (‘আলালী ভাষা’) তিনি সাহিত্যের পাতায় রূপ দেন। তাঁর হাত ধরেই প্রথম কোনো উপন্যাস ইংরেজিতে (The Spoiled Child) অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান পায়। এর পর ‘মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়’, ‘যৎকিঞ্চিৎ’, ‘রামারঞ্জিকা’, ‘বামাতোষিণী’, ‘অভেদী’, ‘আধ্যাত্মিকা’ ও ‘ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত’ রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন।

জীবনের শেষভাগে এসে ব্যবসায়িক জগতের কোলাহল থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেন এই অনন্যসাধক। সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা ও ঈশ্বরচিন্তায় তাঁর শেষ জীবন কেটেছিল অত্যন্ত শান্ত ও দার্শনিক ভাবধারায়। পশুক্লেশ নিবারণী সভার কাজ থেকে শুরু করে বেথুন সোসাইটি ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির মতো সংগঠনের মাধ্যমে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানব কল্যাণে ব্রতী ছিলেন।

অবশেষে ১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর কলকাতায় ক্ষণজন্মা এই সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারকের জীবনাবসান ঘটে। দেহাবসান হলেও তাঁর রেখে যাওয়া ‘আলালী ভাষা’, সাবলীল গদ্য ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা আজও বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তাঁর এই শুভ জন্মদিনে আমরা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি বাংলা কথাসাহিত্যের এই প্রথম স্থপতিকে। যার সৃষ্টিশীল চেতনা ও প্রগতিশীল জীবনবোধ চিরকাল বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের পথ দেখাবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসিইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কালজয়ী কথাশিল্পী প্যারীচাঁদ মিত্র: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট সময় ০৯:৫৮:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে যিনি একাকী পথ কেটে তৈরি করেছিলেন আধুনিক গদ্যের মহাসড়ক, তিনি প্যারীচাঁদ মিত্র। ছদ্মনাম ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ হলেও তাঁর কাজের মহিমা লুকিয়ে রাখার সাধ সাধ্যের অতীত ছিল। ১৮১৪ সালের ২২ জুলাই তিলত্তমা কলকাতার বুক চিরে যার আগমন ঘটেছিল, তিনি কেবল একটি যুগের সাহিত্যিক নন; তিনি ছিলেন এক অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটানো দীপ্ত আলোকমশাল।

কলকাতার এক সচ্ছল ও ঐতিহ্যবাহী বণিক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। তাঁর পিতা রামনারায়ণ মিত্র ছিলেন তৎকালীন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত কাগজ ও হুন্ডি ব্যবসায়ী। পিতার ব্যবসায়িক সাফল্য ও পারিবারিক সমৃদ্ধি তাঁর শৈশবকে অর্থকষ্ট থেকে দূরে রাখলেও, তাঁদের আত্মিক শিকড় প্রোথিত ছিল হুগলির শান্ত-স্নিগ্ধ পাণিসেহালা গ্রামে। ভ্রাতা কিশোরীচাঁদ মিত্রের সান্নিধ্য ও প্রগতিশীল পারিবারিক আবহাওয়া শৈশব থেকেই প্যারীচাঁদের মেধা ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে তোলে।

সংস্কৃত পাঠশালার প্রথাগত শিক্ষা কিংবা গৃহশিক্ষক মুন্সির কাছে ফারসি পাঠের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হলেও, তাঁর জীবনচেতনার আসল পরিবর্তন ঘটে হিন্দু কলেজে। সেখানে তিনি পাশে পান মুক্তচিন্তার রূপকার হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে। ডিরোজিওর সাহচর্য ও ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের প্রভাব তাঁর ভেতর এক বৈপ্লবিক মানসিকতার জন্ম দেয়।

প্যারীচাঁদের সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল না; তাঁর আসল সংগ্রাম ছিল তৎকালীন সমাজের আড়ষ্টতা, কুসংস্কার ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে। ১৮৩৮ সালে জ্ঞানান্বেষণ সভার সাথে যুক্ত হয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধরেন। একদিকে ব্যবসায়িক জগতে সফলতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সমাজের রক্ষণশীল মহলের চক্ষুশূল হওয়ার ঝুঁকি-  দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

ব্যবসায়িক জীবনে আমদানি-রপ্তানি ও চালের ব্যবসা করে অঢেল অর্থের মালিক হলেও, প্যারীচাঁদ সমাজের অবহেলিত মানুষের বঞ্চনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই দেখা কেবল নিরব দর্শকের মতো ছিল না; তাঁর কলম আছড়ে পড়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তৎকালীন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথার সুযোগ নিয়ে জমিদাররা যখন সাধারণ প্রজাদের শুষে নিচ্ছিল, তখন তিনি রচনা করেন তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘The Zemindar and Ryots’। এতে তিনি শোষিত কৃষকদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে শাসকশ্রেণীকে কাঠগড়ায় তোলেন।

 তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশি ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থার সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন রুখতে তিনি একক সংগ্রাম চালিয়েছিলেন এবং সাফল্য অর্জন করেছিলেন।

নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহের সমর্থন এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের মতো ভয়াবহ বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন।

কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির একজন সাধারণ লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে নিজ মেধা ও নিষ্ঠায় পরবর্তীতে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি পদে উন্নীত হন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য পদ অলঙ্কৃত করেন।

কিন্তু সাহিত্যের দরবারে তিনি অমর হয়ে রইলেন ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের মাধ্যমে। পণ্ডিতি ভাষার শৃৃঙ্খল ভেঙে সাধারণ মানুষের রূপক ও চলতি ভাষাকে (‘আলালী ভাষা’) তিনি সাহিত্যের পাতায় রূপ দেন। তাঁর হাত ধরেই প্রথম কোনো উপন্যাস ইংরেজিতে (The Spoiled Child) অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান পায়। এর পর ‘মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়’, ‘যৎকিঞ্চিৎ’, ‘রামারঞ্জিকা’, ‘বামাতোষিণী’, ‘অভেদী’, ‘আধ্যাত্মিকা’ ও ‘ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত’ রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন।

জীবনের শেষভাগে এসে ব্যবসায়িক জগতের কোলাহল থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেন এই অনন্যসাধক। সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা ও ঈশ্বরচিন্তায় তাঁর শেষ জীবন কেটেছিল অত্যন্ত শান্ত ও দার্শনিক ভাবধারায়। পশুক্লেশ নিবারণী সভার কাজ থেকে শুরু করে বেথুন সোসাইটি ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির মতো সংগঠনের মাধ্যমে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানব কল্যাণে ব্রতী ছিলেন।

অবশেষে ১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর কলকাতায় ক্ষণজন্মা এই সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারকের জীবনাবসান ঘটে। দেহাবসান হলেও তাঁর রেখে যাওয়া ‘আলালী ভাষা’, সাবলীল গদ্য ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা আজও বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তাঁর এই শুভ জন্মদিনে আমরা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি বাংলা কথাসাহিত্যের এই প্রথম স্থপতিকে। যার সৃষ্টিশীল চেতনা ও প্রগতিশীল জীবনবোধ চিরকাল বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের পথ দেখাবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসিইচবি