বিশ্বজুড়ে নিরপেক্ষ এবং দ্রুততম সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে যে নামটি আজ সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, তা হলো ‘রয়টার্স’। কিন্তু এই বিশাল সংবাদ সাম্রাজ্যের পেছনে ছিলেন একজন দূরদর্শী ও অদম্য স্বপ্নদ্রষ্টা- পল জুলিয়াস রয়টার। আজ তাঁর জন্মদিন। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের এই দিকপালকে।
আজ থেকে দুই শতাব্দীরও বেশি আগে জন্ম নেওয়া এই মানবের হাত ধরেই সংবাদ বিনিময়ে প্রযুক্তির প্রথম বিপ্লব ঘটেছিল। যখন মানুষ চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করত, তখন তিনি পায়রা এবং বৈদ্যুতিক তার (টেলিগ্রাম) ব্যবহার করে পুরো ইউরোপের ব্যবসার চিত্র বদলে দিয়েছিলেন।
পল রয়টার ১৮১৬ সালের ২১ জুলাই জার্মানির কাসেল শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম ছিল ইসরাইল বের জোসেফাট। তাঁর বাবা ছিলেন একজন র্যাবাই (ধর্মীয় শিক্ষক)। ছোটবেলা থেকেই রয়টার ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী ও মেধানির্ভর। যৌবনের শুরুতে তিনি গটিংগেন শহরে নিজের চাচার ব্যাংকে কাজ শুরু করেন।
সেখানে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস এর সাথে, যিনি তখন তারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। এই বিজ্ঞানীর সংস্পর্শেই রয়টার বুঝতে পেরেছিলেন- ভবিষ্যতে তথ্যই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ১৮৪৫ সালে তিনি প্যারিসে চলে যান এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন পল জুলিয়াস রয়টার।
অদম্য সংগ্রাম ও সংবাদ জগতের সূচনা ১৮৪৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় রয়টার বার্লিন থেকে রাজনৈতিক প্যামফ্লেট ছাপানোর কারণে সরকারের নজরে পড়েন এবং ফ্রান্সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। প্যারিসে তিনি বিখ্যাত ফরাসি সংবাদ সংস্থা ‘এজেন্স অ্যাভাস’ (বর্তমানে এএফপি)- এ অনুবাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৮৪৯ সালে তিনি নিজের উদ্যোগে একটি সংবাদ সংস্থা খোলার চেষ্টা করেন। তখন জার্মানির আখেন ও বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এর মধ্যে টেলিগ্রাফ লাইন বন্ধ ছিল। রয়টার এখানে এক অনন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। তিনি ২০০টি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পায়রা কিনে নেন!
টেলিগ্রাফ যেখানে থামত, সেখান থেকে পায়রা উড়িয়ে শেয়ার বাজার ও খবরের বার্তা আধা ঘণ্টায় পৌঁছে যেত, যেখানে ট্রেনে লাগত কয়েক ঘণ্টা। এই অভাবনীয় দ্রুততার কারণে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের কাছে রয়টার্স নামটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
১৮৫১ সালে রয়টার ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং লন্ডনে ‘রয়টার্স অফিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে তিনি কেবল আর্থিক বাজারের শেয়ার দর ও বাণিজ্যিক খবর কেনাবেচা করতেন। সংবাদ সংস্থার সূচনা ১৮৫১লন্ডনে রয়টার্স অফিস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্টক এক্সচেঞ্জের খবরের লেনদেন শুরু হয়। ১৮৫৮ সালে যুক্তরাজ্যের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রসমূহ (যেমন মনিং পোস্ট)) প্রথম রয়টার্সের সাধারণ সংবাদ সেবা গ্রহণ করতে শুরু করে।
১৮৫৯ সালে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ সবার আগে কভার করে রয়টার্স বিশ্বজুড়ে রাতারাতি খ্যাতি অর্জন করে। ১৮৭০ এর দশকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে তারের মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত ও দূরপ্রাচ্যে রয়টার্সের নেটওয়ার্ক বিস্তার লাভ করে।
১৮৪৫ সালে পল রয়টার ইডা মারিয়া এলিজাবেথ ক্লেমেন্টাইন ম্যাগনাস-কে বিয়ে করেন। এই দম্পতির চার সন্তান ছিল- হারবার্ট, জর্জ, অ্যালফ্রেড এবং ক্লিমেন্টাইন। তাঁর বড় ছেলে হারবার্ট রয়টার পরবর্তীতে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে কোম্পানির দায়িত্ব নেন।
সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৮৭১ সালে জার্মানির ডিউক অফ সাক্সে-কোবার্গ-গোথা তাঁকে ‘ব্যারন’ খেতাবে ভূষিত করেন। পরবর্তীতে ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়াও তাঁকে সমমানের মর্যাদা প্রদান করেন।
জীবনের শেষভাগে শারীরিক অসুস্থতার কারণে রয়টার্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা থেকে অবসর নেন এবং ফ্রান্সের নিস শহরে বসবাস শুরু করেন। ১৮৯৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে এই মহান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন।
পল রয়টার একটি মূলমন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আর তা হলো- “সংবাদ হবে নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং সত্য।” আজও প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তাঁর গড়ে তোলা সেই সংবাদ সংস্থা সাংবাদিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিশ্বজুড়ে কাজ করে যাচ্ছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে বিশ্ব গণমাধ্যমের এই যুগান্তকারী নায়কের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি
























