ঢাকা ০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo মেট্রোরেল ডিপোর ভিডিও ধারণের অভিযোগে কর্মীকে পুলিশে দিল ডিএমটিসিএল Logo যমুনা ও বাঙালি নদীতে পানি বৃদ্ধি, ভাঙন আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ Logo জেনার সাথে জড়িত প্রমাণ হলে এমপির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক: হারুনুর রশিদ Logo বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার: জ্বালানিমন্ত্রী Logo নৈতিক স্খলন প্রমাণিত, জামায়াতের এমপি নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার Logo মেগা প্রকল্পে অনিয়ম-বিলম্ব সহ্য নয়, ১৮০ দিনের বিশেষ সংস্কারে সরকার Logo ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ প্রকল্প নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভা Logo ভারতের আন্দোলনে ঠিক যেন বাংলাদেশের দৃশ্য! Logo জ্বালানি তেল নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে: জ্বালানি বিভাগ Logo প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ

ভারতের আন্দোলনে ঠিক যেন বাংলাদেশের দৃশ্য!

কয়েকদিন ধরেই ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রতিবেশী দেশের এই উত্তপ্ত দিনগুলো বাংলাদেশের মানুষকে এক অদ্ভুত ও পরিচিত স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দুই বছর আগে এই জুলাইয়েই বাংলাদেশের ছাত্ররা যেভাবে কোটা সংস্কার ও মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন, ঠিক একই প্রতিচ্ছবি এখন দেখা যাচ্ছে ভারতের বুকে।

চিকিৎসাবিদ্যা ও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারতের তরুণ সমাজ ফুঁসে উঠেছে। এই আন্দোলনের তীব্রতা এবং সরকারের দমনপীড়নের ধরন দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাদৃশ্য তৈরি করেছে।

অপমানজনক মন্তব্য থেকে শুরু

এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, যা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের একটি ঐতিহাসিক মোড়কে মনে করিয়ে দেয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত করে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য করেছিলেন। সেই একটি মন্তব্য যেভাবে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে আঘাত করেছিল এবং আন্দোলনকে গণবিস্ফোরণে রূপ দিয়েছিল, অনেকটা একই ঘটনা ঘটেছে ভারতেও।

যুব আন্দোলনে রণক্ষেত্র দিল্লি: এবার কি টলে যাবে মোদী সরকার?

সেখানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দেশটির বেকার ও আন্দোলনরত তরুণদের উদ্দেশ্য করে এক মন্তব্যে ‘তেলাপোকা’ (Cockroaches) বা সমাজের পরজীবী হিসেবে তুলনা করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে আসা এই চরম অপমানকে ভারতের তরুণ সমাজ মেনে নেয়নি।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেভাবে হাসিনার মন্তব্যের জবাবে নিজেদের ‘রাজাকার’ স্লোগানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ভারতের তরুণরাও ঠিক তেমনি এই অপমানকে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপান্তর করেছে।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক মিম (Meme) তৈরির মাধ্যমে ক্ষোভের প্রকাশ শুরু হলেও, বর্তমানে এটি ভারতের ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম বৃহত্তম যুব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

রাজপথে পুলিশি নির্যাতন ও হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব

গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির অধীনে ভারতীয় পার্লামেন্ট অভিমুখে এক বিশাল মিছিল শুরু করে। মিছিলটি পার্লামেন্টের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

পুলিশের জলকামান ও বর্বরোচিত পিটুনিতে শতাধিক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে দিল্লির বেশকিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই দমনপীড়নের ভেতরেই আরেকটি ভয়ংকর দৃশ্য সাধারণ মানুষের নজরে এসেছে, যা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনস্থলে বহু পুলিশ সদস্যকে দেখা গেছে যারা কাপড়ে সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে রেখেছিলেন এবং তাদের পোশাকে কোনো নেমপ্লেট ছিল না।

শুধু তাই নয়, পুলিশের পাশাপাশি লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র হাতে একদল সাদা পোশাকের অজ্ঞাত পরিচয়ধারী ব্যক্তিও ভারতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালায়। বাংলাদেশে যেভাবে হেলমেট পরিহিত এবং সাদা পোশাকের দলীয় ক্যাডাররা ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়েছিল, দিল্লিতেও ঠিক একইভাবে এই অজ্ঞাত যুবকরা পুলিশের ছায়াতলে থেকে আন্দোলনকারীদের পিটিয়েছে।

‘গোদি মিডিয়া’ বয়কট ও দুয়োধ্বনি

বাংলাদেশে আন্দোলনের সময় যেভাবে শিক্ষার্থীরা মূলধারার চাটুকার ও সরকারপন্থি গণমাধ্যমকে বর্জন করেছিল, ঠিক একই দৃশ্য এখন দিল্লির রাজপথেও দেখা যাচ্ছে। ভারতের মূলধারার ডানপন্থি এবং করপোরেট মিডিয়াগুলোকে আন্দোলনস্থলে দেখামাত্রই শিক্ষার্থীরা ‘গোদি মিডিয়া গো ব্যাক’ স্লোগান দিচ্ছেন।

এই সংবাদমাধ্যমগুলো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’ বা ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও বুম নামিয়ে ফেলতে বাধ্য করছেন।

এর বিপরীতে ভারতের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা স্বাধীন ইউটিউব চ্যানেল, বিকল্প গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর ভরসা রাখছেন।

ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে গণমানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন

ভারতের এই আন্দোলন এখন আর শুধু পরীক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি অনেকটাই গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হলেও এই আন্দোলনে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে। তাতে সমর্থন দিয়ে পথে নেমেছে কংগ্রেস, সিপিআই (এম), সমাজবাদী পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলোও।

তীব্র গরম এবং পুলিশের টিয়ারগ্যাসের মধ্যেও দিল্লির সাধারণ নাগরিক, রিকশাচালক, ছোট ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে আন্দোলনস্থলে পানি, খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ সরবরাহ করছেন। আন্দোলনের সামনের সারিতে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ব্যারিকেড ভাঙার লড়াই আলাদাভাবে নজর কাড়ছে, ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবেও।

বিনোদন জগতের তারকাদের সমর্থন

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে যেভাবে দেশের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও নির্মাতারা রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক একই চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে ভারতেও। বলিউডের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন তারকা, স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং জনপ্রিয় ওটিটি (OTT) অভিনেতারা দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে পোস্ট দিচ্ছেন।

শাবানা আজমি-প্রকাশ রাজের মতো অনেক তারকা প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের এই লড়াইকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকে সরাসরি আন্দোলনস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

অবশ্য কঙ্গনা রনৌতের মতো কিছু তারকা রাজনীতিবিদ মোদী সরকারের পক্ষেও সাফাই গাইছেন।

ভারতের বিনোদন জগতের তারকাদের এমন সাহসী অবস্থান আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংস্কার থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও সরকারের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে মোড় দিয়েছে। দিল্লির রাজপথে এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের দাবি উঠছে। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘মোদি হটাও, দেশ বাঁচাও’ এবং ‘দফা এক দাবি এক, মোদীর পদত্যাগ’।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে যেভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন পরবর্তীতে একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছিল, ভারতের এই আন্দোলনও ঠিক একই পথ অনুসরণ করছে।

নরেন্দ্র মোদীর তৃতীয় মেয়াদের সরকারের শুরুতে এই বিশাল ছাত্র ও যুব আন্দোলন সরকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দমনপীড়ন চালিয়ে এই যুব সমাজের ক্ষোভ আর স্তব্ধ করা সম্ভব নয়।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য প্রিন্টদ্য ওয়্যার

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

মেট্রোরেল ডিপোর ভিডিও ধারণের অভিযোগে কর্মীকে পুলিশে দিল ডিএমটিসিএল

ভারতের আন্দোলনে ঠিক যেন বাংলাদেশের দৃশ্য!

আপডেট সময় ০৫:৫৪:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

কয়েকদিন ধরেই ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রতিবেশী দেশের এই উত্তপ্ত দিনগুলো বাংলাদেশের মানুষকে এক অদ্ভুত ও পরিচিত স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দুই বছর আগে এই জুলাইয়েই বাংলাদেশের ছাত্ররা যেভাবে কোটা সংস্কার ও মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন, ঠিক একই প্রতিচ্ছবি এখন দেখা যাচ্ছে ভারতের বুকে।

চিকিৎসাবিদ্যা ও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারতের তরুণ সমাজ ফুঁসে উঠেছে। এই আন্দোলনের তীব্রতা এবং সরকারের দমনপীড়নের ধরন দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাদৃশ্য তৈরি করেছে।

অপমানজনক মন্তব্য থেকে শুরু

এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, যা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের একটি ঐতিহাসিক মোড়কে মনে করিয়ে দেয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত করে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য করেছিলেন। সেই একটি মন্তব্য যেভাবে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে আঘাত করেছিল এবং আন্দোলনকে গণবিস্ফোরণে রূপ দিয়েছিল, অনেকটা একই ঘটনা ঘটেছে ভারতেও।

যুব আন্দোলনে রণক্ষেত্র দিল্লি: এবার কি টলে যাবে মোদী সরকার?

সেখানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দেশটির বেকার ও আন্দোলনরত তরুণদের উদ্দেশ্য করে এক মন্তব্যে ‘তেলাপোকা’ (Cockroaches) বা সমাজের পরজীবী হিসেবে তুলনা করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে আসা এই চরম অপমানকে ভারতের তরুণ সমাজ মেনে নেয়নি।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেভাবে হাসিনার মন্তব্যের জবাবে নিজেদের ‘রাজাকার’ স্লোগানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ভারতের তরুণরাও ঠিক তেমনি এই অপমানকে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপান্তর করেছে।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক মিম (Meme) তৈরির মাধ্যমে ক্ষোভের প্রকাশ শুরু হলেও, বর্তমানে এটি ভারতের ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম বৃহত্তম যুব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

রাজপথে পুলিশি নির্যাতন ও হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব

গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির অধীনে ভারতীয় পার্লামেন্ট অভিমুখে এক বিশাল মিছিল শুরু করে। মিছিলটি পার্লামেন্টের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

পুলিশের জলকামান ও বর্বরোচিত পিটুনিতে শতাধিক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে দিল্লির বেশকিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই দমনপীড়নের ভেতরেই আরেকটি ভয়ংকর দৃশ্য সাধারণ মানুষের নজরে এসেছে, যা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনস্থলে বহু পুলিশ সদস্যকে দেখা গেছে যারা কাপড়ে সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে রেখেছিলেন এবং তাদের পোশাকে কোনো নেমপ্লেট ছিল না।

শুধু তাই নয়, পুলিশের পাশাপাশি লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র হাতে একদল সাদা পোশাকের অজ্ঞাত পরিচয়ধারী ব্যক্তিও ভারতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালায়। বাংলাদেশে যেভাবে হেলমেট পরিহিত এবং সাদা পোশাকের দলীয় ক্যাডাররা ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়েছিল, দিল্লিতেও ঠিক একইভাবে এই অজ্ঞাত যুবকরা পুলিশের ছায়াতলে থেকে আন্দোলনকারীদের পিটিয়েছে।

‘গোদি মিডিয়া’ বয়কট ও দুয়োধ্বনি

বাংলাদেশে আন্দোলনের সময় যেভাবে শিক্ষার্থীরা মূলধারার চাটুকার ও সরকারপন্থি গণমাধ্যমকে বর্জন করেছিল, ঠিক একই দৃশ্য এখন দিল্লির রাজপথেও দেখা যাচ্ছে। ভারতের মূলধারার ডানপন্থি এবং করপোরেট মিডিয়াগুলোকে আন্দোলনস্থলে দেখামাত্রই শিক্ষার্থীরা ‘গোদি মিডিয়া গো ব্যাক’ স্লোগান দিচ্ছেন।

এই সংবাদমাধ্যমগুলো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’ বা ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও বুম নামিয়ে ফেলতে বাধ্য করছেন।

এর বিপরীতে ভারতের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা স্বাধীন ইউটিউব চ্যানেল, বিকল্প গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর ভরসা রাখছেন।

ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে গণমানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন

ভারতের এই আন্দোলন এখন আর শুধু পরীক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি অনেকটাই গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হলেও এই আন্দোলনে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে। তাতে সমর্থন দিয়ে পথে নেমেছে কংগ্রেস, সিপিআই (এম), সমাজবাদী পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলোও।

তীব্র গরম এবং পুলিশের টিয়ারগ্যাসের মধ্যেও দিল্লির সাধারণ নাগরিক, রিকশাচালক, ছোট ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে আন্দোলনস্থলে পানি, খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ সরবরাহ করছেন। আন্দোলনের সামনের সারিতে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ব্যারিকেড ভাঙার লড়াই আলাদাভাবে নজর কাড়ছে, ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবেও।

বিনোদন জগতের তারকাদের সমর্থন

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে যেভাবে দেশের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও নির্মাতারা রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক একই চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে ভারতেও। বলিউডের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন তারকা, স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং জনপ্রিয় ওটিটি (OTT) অভিনেতারা দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে পোস্ট দিচ্ছেন।

শাবানা আজমি-প্রকাশ রাজের মতো অনেক তারকা প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের এই লড়াইকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকে সরাসরি আন্দোলনস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

অবশ্য কঙ্গনা রনৌতের মতো কিছু তারকা রাজনীতিবিদ মোদী সরকারের পক্ষেও সাফাই গাইছেন।

ভারতের বিনোদন জগতের তারকাদের এমন সাহসী অবস্থান আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংস্কার থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও সরকারের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে মোড় দিয়েছে। দিল্লির রাজপথে এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের দাবি উঠছে। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘মোদি হটাও, দেশ বাঁচাও’ এবং ‘দফা এক দাবি এক, মোদীর পদত্যাগ’।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে যেভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন পরবর্তীতে একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছিল, ভারতের এই আন্দোলনও ঠিক একই পথ অনুসরণ করছে।

নরেন্দ্র মোদীর তৃতীয় মেয়াদের সরকারের শুরুতে এই বিশাল ছাত্র ও যুব আন্দোলন সরকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দমনপীড়ন চালিয়ে এই যুব সমাজের ক্ষোভ আর স্তব্ধ করা সম্ভব নয়।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য প্রিন্টদ্য ওয়্যার

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ