মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম যেন রূপ নিয়েছিল এক চরম রোমাঞ্চ আর গোলবন্যার নাট্যমঞ্চে। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি শুধু ফুটবলের লড়াই রইল না, হয়ে উঠল আক্রমণ আর প্রত্যাবর্তনের এক শ্বাসরুদ্ধকর মহাকাব্য। ১০ গোলের এই রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থানটি নিজেদের করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। তবে থ্রি-লায়ন্সদের এই জয়োল্লাসের রাতেই ফুটবল ইতিহাসের অমরত্বের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ফরাসি যুবরাজ কাইলিয়ান এমবাপে; ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসিকে টপকে এখন তিনিই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের একক অধিপতি।
প্রথমার্ধে ইংলিশ ঝড় ও সাকা-বন্দনা: ম্যাচের শুরু থেকেই ফরাসি রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ। ঘড়ির কাঁটায় মাত্র ৩ মিনিট, তখনই ফরাসি দুর্গ ভেঙে ইংলিশদের উল্লাসে মাতান ডেক্লান রাইস। শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কনসা। এরপর শুরু হয় বুকায়ো সাকার জাদুকরী প্রদর্শনী। ৩৭ মিনিটে দলের তৃতীয় গোল করার পর, প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন এই ফরোয়ার্ড। ফলে ৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে ফ্রান্সকে ব্যাকফুটে ঠেলে হাসিমুখে বিরতিতে যায় থ্রি-লায়ন্সরা।
দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসিদের ফিনিক্স উত্থান ও এমবাপের ইতিহাস: ৪ গোলে পিছিয়ে পড়েও বিরতির পর এক অদম্য ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে ফ্রান্স। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কাণ্ডারি ছিলেন কাইলিয়ান এমবাপে। ম্যাচের ৪৮ মিনিটে তাঁর চমৎকার শট যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়, তখনই চলতি আসরের গোলদাতার তালিকায় সবার ওপরে উঠে যান তিনি। একই সাথে স্পর্শ করেন বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির গড়া ২১ গোলের মহাকীর্তি।
ফরাসিদের আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে ৫৪ মিনিটে ব্যবধান ৪-২ করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। এর ঠিক ৯ মিনিট পর, অর্থাৎ ৬৩ মিনিটে এমবাপে যখন নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক নতুন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে। চলতি আসরে এটি তাঁর ১০ম গোল এবং বিশ্বমঞ্চে সব মিলিয়ে ২২তম গোল! আর এই গোলের মাধ্যমে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন এককভাবে দখল করেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
শেষ মুহূর্তের রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা: ম্যাচ যখন ৪-৩ ব্যবধানে টানটান উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে, তখনই ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের স্মরণীয় হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বুকায়ো সাকা, ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ৫-৩ ব্যবধানে। কিন্তু ফরাসিরা হাল ছাড়েনি। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে (৯৬ মিনিট) উসমানে ডেম্বেলের দুর্দান্ত গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-৪! গ্যালারিতে তখন সমতায় ফেরার টানটান উত্তেজনা। তবে ফরাসিদের সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দেন জুড বেলিংহ্যাম। এর ঠিক দুই মিনিট পর (৯৮ মিনিট) তাঁর এক দৃষ্টিনন্দন ও চোখধাঁধানো গোলে ৬-৪ ব্যবধানের এক অবিস্মরণীয় জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।
মেসির সামনে মুকুট পুনরুদ্ধারের ডাক: দল হারলেও এমবাপের ব্যক্তিগত অর্জন চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তবে ইতিহাসের এই রোমাঞ্চকর লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। এমবাপের কেড়ে নেওয়া মুকুট পুনরুদ্ধার করার এক দারুণ সুযোগ এখনো টিকে আছে লিওনেল মেসির সামনে। আজকের স্বপ্নের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হচ্ছে মেসির আর্জেন্টিনা। সেই মহারণে আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক যদি জোড়া গোল করতে পারেন, তবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের ভাগীদার হবেন তিনি। আর যদি দেখা মেলে এক জাদুকরী হ্যাটট্রিকের, তবে এমবাপেকে টপকে চলতি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার একক ট্রফিটাও উঠবে ফুটবলের এই ক্ষুদে জাদুকরের হাতে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি
























