বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত ক্রীড়া আসর ফুটবল বিশ্বকাপের মহাসমাপ্তি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, এরপরই জানা যাবে আগামী চার বছরের জন্য ফুটবলের মুকুট কার মাথায় উঠছে। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে রোববার রাত একটায় মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি—গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
ইতিহাস, পরিসংখ্যান আর আবেগের মিশেলে এই ফাইনালটি রূপ নিয়েছে এক আধুনিক মহাকাব্যে। একদিকে আলবিসেলেস্তেদের চতুর্থ শিরোপা ও টানা দুইবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, অন্যদিকে স্প্যানিশদের শতভাগ ফাইনাল জয়ের রেকর্ড ধরে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা হওয়ার হাতছানি।
সেরা আক্রমণ বনাম সেরা রক্ষণ: মাঠের ভেতরের আসল দ্বৈরথ
এই টুর্নামেন্টে দুই দলের যাত্রাপথ রূপকথার চেয়ে কম নয়। দুই দলই অপরাজিত থেকে ফাইনালে পা রেখেছে, তবে তাদের কৌশল আর খেলার ধরন সম্পূর্ণ বিপরীত।
আর্জেন্টিনার অপরাজেয় মানসিকতা: নক-আউট পর্বে প্রতি ম্যাচেই আর্জেন্টিনা লিখেছে কামব্যাকের অবিশ্বাস্য গল্প। মিশরের বিপক্ষে ২-০ তে পিছিয়ে থেকে ৩-২ ব্যবধানের জয় কিংবা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের নাটকীয় জয়—আর্জেন্টিনা প্রমাণ করেছে তাদের স্নায়ু কতটা শক্ত। ৭ ম্যাচে ১৯ গোল দিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তকমাটি এখন তাদেরই।
স্পেনের নিখুঁত ফুটবল বিজ্ঞান: অন্যদিকে স্পেন ফাইনালে এসেছে কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই, মাঠের ওপর পূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখে। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা টুর্নামেন্টে গোল খেয়েছে মাত্র একটি! টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে মাঠে নামা স্পেনের রক্ষণভাগকে ভাঙা যে কারো জন্যই এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
সংক্ষেপে ফাইনাল: বলা চলে, রোববারের ফাইনালটি হতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের সেরা আক্রমণভাগের সাথে সেরা রক্ষণভাগের এক আদিম লড়াই।
মাঝমাঠের দখল ও রণকৌশল: স্কালোনি বনাম ফুয়েন্তে
দুই দলেরই খেলার মূল ভিত্তি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। গড়ে ৬০ শতাংশ বলের দখল রাখা দুই দলই পাসিং ফুটবলে অবিশ্বাস্য পারদর্শিতা দেখিয়েছে।
লিওনেল স্কালোনির ৪-৩-৩ ছকে মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পাউল, এনজো ফের্নান্দেজ ও মাক এলিস্টাররা যেমন খেলা গড়ছেন, তেমনি উইংয়েও ত্রাস ছড়াচ্ছেন। আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজের তীব্র প্রেসিং ক্ষমতা স্পেনের রক্ষণ ভাঙতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিপরীতে, লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্প্যানিশ আর্মাডাও চলছে ৪-৩-৩ ছকে। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের নিখুঁত পাসিং আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ যেন এক আধুনিক রোবোটিক যন্ত্রের মতো কাজ করছে। বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ধৈর্যহারা করাই তাদের মূল দর্শন।
১৯ বছর পর সেই ‘শিশু’ এখন প্রতিপক্ষ: মেসি-ইয়ামাল রূপকথা
এই ফাইনালের সবচেয়ে আবেগময় এবং সুন্দর গল্পটি লুকিয়ে আছে ২০০৭ সালের একটি ছবিতে। একটি দাতব্য প্রচারণামূলক ফটোশুটে তরুণ লিওনেল মেসির কোলে দেখা গিয়েছিল এক নিষ্পাপ শিশুকে। ১৯ বছর পর সেইদিনের সেই শিশুই আজকের স্পেনের বিস্ময় বালক—লামিন ইয়ামাল!
৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি মেসি যখন ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়েও ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে টুর্নামেন্টের শীর্ষ গোলদাতা, ঠিক তখন সবে ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। এই ফাইনাল তাই কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়, এটি টুর্নামেন্টের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ (গড় বয়স ২৮.৬২) বনাম অন্যতম তরুণ (গড় বয়স ২৬.১৯) দলের চিরন্তন লড়াই—তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন: ৯৬ বছর পরের কাকতালীয় ঘটনা
আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইয়ের ইতিহাস সমানে সমান। ১৪ বারের দেখায় দুই দলই জিতেছে ৬টি করে ম্যাচ। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের দেখা হয়েছিল মাত্র একবার—১৯৬৬ সালের গ্রুপ পর্বে, যেখানে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল। নক-আউট পর্বে এটিই তাদের প্রথম ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ।
একই সাথে, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের পর (আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে) এই প্রথম ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ একই ভাষাভাষী দেশ। ঔপনিবেশিক ইতিহাস আর স্প্যানিশ ভাষার এই লড়াই মাঠের উত্তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।
মহাতারকাদের মেলা: ফুটবলের আঙিনায় বিনোদনের মহাবিস্ফোরণ
কেবল মাঠের খেলাই নয়, ৪৮ দলের এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের সমাপনী আয়োজনও হচ্ছে নজিরবিহীন। ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে পোস্ট ম্যালোনের হেডলাইনার পারফরম্যান্সের সাথে উপস্থিত থাকবেন টম ক্রুজ, রবি উইলিয়ামসের মতো তারকারা।
আর বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হওয়া ‘হাফটাইম শো’-তে কোল্ডপ্লের ক্রিস মার্টিনের কিউরেশনে মঞ্চ কাঁপাবেন ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস এবং জাস্টিন বিবার।
শেষ বাঁশি কার পক্ষে বাজবে?
আর্জেন্টিনার মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর তীব্র আবেগ আর একতাবদ্ধ শৈল্পিক ফুটবল জিতবে, নাকি স্পেনের নিখুঁত ফুটবল বিজ্ঞান আর শৃঙ্খলা শেষ হাসি হাসবে? উত্তর মিলবে নিউ জার্সির সবুজ গালিচায়, যেখানে রচিত হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি






















