ঢাকা ০১:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo নিয়তির অদ্ভুত খেলা: লামিন ইয়ামালকে নিয়ে যা বললেন লিওনেল মেসি Logo হামলা তীব্র হবে ইরানে, আরো ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন Logo প্রযুক্তির জালে মাদক: সাইবার অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ বার্তা মৃত্যুদণ্ড Logo স্মৃতির করিডোরে শুধুই শূন্যতা: এক আলোকবর্তিকার অকালে বিদায় Logo বন্দী যখন নিজেই এক জলন্ত বিপ্লব: যাঁর মুক্তির দাবিতে কেঁপেছিল বিশ্ব Logo দাবানলের ধোঁয়ায় বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে শঙ্কা Logo চীনের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ ট্রাম্পের, তবুও… Logo ঝড়ো হাওয়ার শঙ্কায় ৪ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল Logo ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো মেক্সিকো Logo সরকারের ৫ মাস পূর্তি, আজ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
কালো মানুষের অধিকারের সূর্য ম্যান্ডেলার জন্মদিন আজ

বন্দী যখন নিজেই এক জলন্ত বিপ্লব: যাঁর মুক্তির দাবিতে কেঁপেছিল বিশ্ব

আজ ১৮ জুলাই, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মহানায়ক, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

মাটির দেয়াল আর কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চলা শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে নেলসন ম্যান্ডেলা একটি জাতিকে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শতাব্দি-সেরা মুক্তিসংগ্রামী নেতা। এককথায় শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্য। ১৯৬৪ সালের রিভোনিয়া ট্রায়ালে দেওয়া ঐতিহাসিক জবানবন্দিতে নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “আমি এমন এক গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছি যেখানে সব মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সমান সুযোগ নিয়ে একসাথে বাঁচবে। এটি এমন এক আদর্শ যার জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাই এবং যা আমি অর্জন করতে চাই। তবে প্রয়োজন হলে, এই আদর্শের জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।”

২০০৯ সালে জাতিসংঘ এই মহান নেতার মানবতাবোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ জুলাই দিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

জন্ম ও শৈশব

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকেই-এর মভেজো নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। ‘রোলিহ্লাহ্লা’ নামের অর্থ ছিল ‘গাছের ডাল ভাঙা’ বা সহজ কথায় ‘ঝামেলা সৃষ্টিকারী’- যা পরবর্তীতে তাঁর বিপ্লবী জীবনের সাথে এক অদ্ভুত সমান্তরাল রেখা তৈরি করেছিল। ম্যান্ডেলা ছিলেন থেম্বু রাজপরিবারের শাখা বংশের সন্তান। তাঁর নয় বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর, থেম্বুল্যান্ডের শাসক জংগিন্তাবা ডালিন্ডিবো তাঁকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেন। রাজকীয় পরিবেশে বড় হলেও রাজসুখের মোহ তাঁকে অন্ধ করতে পারেনি।

বর্ণবাদের ক্রূর রূপ

ফোর্ট হেয়ার ইউনিভার্সিটি ও পরবর্তীতে উইটওয়াটারসরান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার সময় ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের চরম বর্ণবাদী রূপ খুব কাছ থেকে দেখেন। কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব ভূমিতেই পরবাসী করে রাখা, ভোট প্রদানের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সামান্য কারণে পশুর মতো নির্যাতন করা- এসব ঘটনা তাঁর তরুণ মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯৪৪ সালে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) যুব লীগে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

বর্নবাদবিরোধী আন্দোলন

প্রথম দিকে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী হলেও, শ্বেতাঙ্গ সরকারের তীব্র দমনপীড়ন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার ঘটনা ম্যান্ডেলার কৌশল বদলে দেয়। ১৯৬১ সালে এএনসি-র সশস্ত্র শাখা ‘উমখন্তো উই সিযওয়ে’ (এমকে) বা ‘দেশের বল্লম’ গঠিত হলে তিনি এর কমান্ডার হন। এরপর থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রপক্ষের নির্মম নির্যাতন। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী পুলিশ।

দীর্ঘ কারাবরণ

১৯৬২ সালে ম্যান্ডেলা গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৪ সালে ঐতিহাসিক ‘রিভোনিয়া ট্রায়ালে’ অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর জীবনের দীর্ঘ ও মূল্যবান ২৭টি বছর কেটে যায় কারান্তরালে। এর মধ্যে ১৮ বছরই কেটেছে কুখ্যাত রবেন দ্বীপের একটি স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ও ছোট এক নির্জন প্রকোষ্ঠে। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি পাথরের খনিতে কাজ করতে হতো তাঁকে। তীব্র রোদে চোখের ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের মনোবল হারাননি; বরং কারাগারকেই বানিয়েছিলেন তাঁর মুক্তিসংগ্রামের অন্য এক পাঠশালা।

বিশ্বজনমতের জোয়ার

ম্যান্ডেলার আপসহীন লড়াই শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবিতে আশির দশকে বিশ্বজুড়ে তীব্র গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী। অবশেষে বিশ্বজনমতের কাছে মাথা নত করে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক ম্যান্ডেলাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ১৯৯৩ সালে বর্ণবাদ অবসান ও শান্তির দূত হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট

১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ১০ মে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ক্ষমতা পেয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি বেছে নেননি; বরং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে শত্রুতার দেয়াল ভেঙে গড়ে তোলেন এক ‘রামধনু জাতি’। ৫ বছর দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার পর ১৯৯৯ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

পারিবারিক জীবন

ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল উত্থান-পতনে ভরা। তিনি তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম বিয়ে হয় ইভলিন মেসের সাথে, যা ১৯৫৮ সালে ভেঙে যায়। এরপর ১৯৫৮ সালে তিনি বিয়ে করেন উইনি মাদিকিজেলাকে, যিনি ম্যান্ডেলার কারাবাসের দীর্ঘ সময়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে মাঠে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দূরত্বের কারণে ১৯৯৬ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। অবশেষে ১৯৯৮ সালে, নিজের ৮০তম জন্মদিনে ম্যান্ডেলা মোজাম্বিকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সামোরা মাচেলের বিধবা পত্নী গ্রাসা মাচেলকে বিয়ে করেন, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন।

শেষ জীবন

রাজনীতি থেকে অবসরের পরও ম্যান্ডেলা এইডস প্রতিরোধ এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। জীবনের শেষভাগে ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দীর্ঘ রোগভোগ ও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে জোহানেসবার্গে এই মহান নেতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে থমকে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব।

আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা

নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল একটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের আশার আলো এবং ক্ষমা ও বন্ধুত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ এই মহান নেতার মানবতাবোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ জুলাই দিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

আজকের এই দিনে, বিশ্বের যেখানেই অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্য মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, সেখানেই ম্যান্ডেলার আদর্শ অনুপ্রেরণার মূল উৎস। বর্ণবাদের অন্ধকার দূর করা এই মহান সূর্যসন্তানের ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

নিয়তির অদ্ভুত খেলা: লামিন ইয়ামালকে নিয়ে যা বললেন লিওনেল মেসি

কালো মানুষের অধিকারের সূর্য ম্যান্ডেলার জন্মদিন আজ

বন্দী যখন নিজেই এক জলন্ত বিপ্লব: যাঁর মুক্তির দাবিতে কেঁপেছিল বিশ্ব

আপডেট সময় ১২:২৮:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

আজ ১৮ জুলাই, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মহানায়ক, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

মাটির দেয়াল আর কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চলা শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে নেলসন ম্যান্ডেলা একটি জাতিকে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শতাব্দি-সেরা মুক্তিসংগ্রামী নেতা। এককথায় শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্য। ১৯৬৪ সালের রিভোনিয়া ট্রায়ালে দেওয়া ঐতিহাসিক জবানবন্দিতে নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “আমি এমন এক গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছি যেখানে সব মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সমান সুযোগ নিয়ে একসাথে বাঁচবে। এটি এমন এক আদর্শ যার জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাই এবং যা আমি অর্জন করতে চাই। তবে প্রয়োজন হলে, এই আদর্শের জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।”

২০০৯ সালে জাতিসংঘ এই মহান নেতার মানবতাবোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ জুলাই দিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

জন্ম ও শৈশব

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকেই-এর মভেজো নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। ‘রোলিহ্লাহ্লা’ নামের অর্থ ছিল ‘গাছের ডাল ভাঙা’ বা সহজ কথায় ‘ঝামেলা সৃষ্টিকারী’- যা পরবর্তীতে তাঁর বিপ্লবী জীবনের সাথে এক অদ্ভুত সমান্তরাল রেখা তৈরি করেছিল। ম্যান্ডেলা ছিলেন থেম্বু রাজপরিবারের শাখা বংশের সন্তান। তাঁর নয় বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর, থেম্বুল্যান্ডের শাসক জংগিন্তাবা ডালিন্ডিবো তাঁকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেন। রাজকীয় পরিবেশে বড় হলেও রাজসুখের মোহ তাঁকে অন্ধ করতে পারেনি।

বর্ণবাদের ক্রূর রূপ

ফোর্ট হেয়ার ইউনিভার্সিটি ও পরবর্তীতে উইটওয়াটারসরান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার সময় ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের চরম বর্ণবাদী রূপ খুব কাছ থেকে দেখেন। কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব ভূমিতেই পরবাসী করে রাখা, ভোট প্রদানের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সামান্য কারণে পশুর মতো নির্যাতন করা- এসব ঘটনা তাঁর তরুণ মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯৪৪ সালে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) যুব লীগে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

বর্নবাদবিরোধী আন্দোলন

প্রথম দিকে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী হলেও, শ্বেতাঙ্গ সরকারের তীব্র দমনপীড়ন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার ঘটনা ম্যান্ডেলার কৌশল বদলে দেয়। ১৯৬১ সালে এএনসি-র সশস্ত্র শাখা ‘উমখন্তো উই সিযওয়ে’ (এমকে) বা ‘দেশের বল্লম’ গঠিত হলে তিনি এর কমান্ডার হন। এরপর থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রপক্ষের নির্মম নির্যাতন। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী পুলিশ।

দীর্ঘ কারাবরণ

১৯৬২ সালে ম্যান্ডেলা গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৪ সালে ঐতিহাসিক ‘রিভোনিয়া ট্রায়ালে’ অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর জীবনের দীর্ঘ ও মূল্যবান ২৭টি বছর কেটে যায় কারান্তরালে। এর মধ্যে ১৮ বছরই কেটেছে কুখ্যাত রবেন দ্বীপের একটি স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ও ছোট এক নির্জন প্রকোষ্ঠে। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি পাথরের খনিতে কাজ করতে হতো তাঁকে। তীব্র রোদে চোখের ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের মনোবল হারাননি; বরং কারাগারকেই বানিয়েছিলেন তাঁর মুক্তিসংগ্রামের অন্য এক পাঠশালা।

বিশ্বজনমতের জোয়ার

ম্যান্ডেলার আপসহীন লড়াই শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবিতে আশির দশকে বিশ্বজুড়ে তীব্র গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী। অবশেষে বিশ্বজনমতের কাছে মাথা নত করে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক ম্যান্ডেলাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ১৯৯৩ সালে বর্ণবাদ অবসান ও শান্তির দূত হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট

১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ১০ মে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ক্ষমতা পেয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি বেছে নেননি; বরং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে শত্রুতার দেয়াল ভেঙে গড়ে তোলেন এক ‘রামধনু জাতি’। ৫ বছর দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার পর ১৯৯৯ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

পারিবারিক জীবন

ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল উত্থান-পতনে ভরা। তিনি তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম বিয়ে হয় ইভলিন মেসের সাথে, যা ১৯৫৮ সালে ভেঙে যায়। এরপর ১৯৫৮ সালে তিনি বিয়ে করেন উইনি মাদিকিজেলাকে, যিনি ম্যান্ডেলার কারাবাসের দীর্ঘ সময়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে মাঠে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দূরত্বের কারণে ১৯৯৬ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। অবশেষে ১৯৯৮ সালে, নিজের ৮০তম জন্মদিনে ম্যান্ডেলা মোজাম্বিকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সামোরা মাচেলের বিধবা পত্নী গ্রাসা মাচেলকে বিয়ে করেন, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন।

শেষ জীবন

রাজনীতি থেকে অবসরের পরও ম্যান্ডেলা এইডস প্রতিরোধ এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। জীবনের শেষভাগে ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দীর্ঘ রোগভোগ ও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে জোহানেসবার্গে এই মহান নেতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে থমকে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব।

আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা

নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল একটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের আশার আলো এবং ক্ষমা ও বন্ধুত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ এই মহান নেতার মানবতাবোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ জুলাই দিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

আজকের এই দিনে, বিশ্বের যেখানেই অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্য মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, সেখানেই ম্যান্ডেলার আদর্শ অনুপ্রেরণার মূল উৎস। বর্ণবাদের অন্ধকার দূর করা এই মহান সূর্যসন্তানের ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি