বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে কজন কবি নিজের মৌলিক ও স্বাতন্ত্র্যসূচক কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম আল মাহমুদ। আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি গ্রামীণ জনপদ, লোকজ উপাদান এবং চরের মানুষের জীবনসংগ্রামকে এক অনন্য নান্দনিকতায় রূপ দিয়েছেন। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করা এই মহান কবি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী বাঙালি কবি।
তিতাস তীরের চেনা ভুবন
মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ (যিনি সাহিত্য অঙ্গনে আল মাহমুদ নামে পরিচিত) ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মীর আবদুর রব এবং মায়ের নাম রওশন আরা মীর।
তিতাস নদীর অববাহিকায় কেটেছে কবির শৈশব ও কৈশোর। নদীর কলতান, চরের মানুষের জীবনযাত্রা, আর গ্রামীণ প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ তাঁর অবচেতনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যের মূল উপাদানে পরিণত হয়।
সংগ্রামী জীবন
আল মাহমুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পাঠশালা ও স্থানীয় বিদ্যালয়ে। পরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জর্জিয়াস হাইস্কুল ও নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। তবে কৈশোরেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি যুক্ত হন লিফলেট বিতরণের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রশাসনের রোষানলে পড়ে কবিকে নিজের এলাকা ছাড়তে হয়।
এই নির্বাসনই তাঁকে ঢাকার বুকে টেনে আনে এবং শুরু হয় তাঁর জীবনের চরম এক সংগ্রামী অধ্যায়। ঢাকায় এসে টিকে থাকার লড়াইয়ে তিনি বেছে নেন সাংবাদিকতার মতো কণ্টকাকীর্ণ পথ। ‘দৈনিক মিল্লাত’, ‘দৈনিক কাফেলা’ প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করার মধ্য দিয়ে যেমন তাঁর জীবিকা চলত, তেমনি সমানতালে চলত সাহিত্যচর্চা। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং প্রবাসী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বিখ্যাত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে আল মাহমুদ ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন মানুষ। সৈয়দা নাদিরা বেগমের সাথে তিনি বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। জীবনযুদ্ধের শত ঝঞ্ঝাবাত ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও কবি তাঁর পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন।
জীবনের বাঁক বদল
আল মাহমুদের জীবন মোটেও মসৃণ ছিল না। সত্তরের দশকে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ সম্পাদনার সময় তৎকালীন সরকারের কোপানলে পড়ে কবিকে কারাবরণ করতে হয়। এক বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটান। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর পেশাগত জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে অবসর নেন।
আর্থিক কষ্ট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দোলাচল এবং নানামুখী সামাজিক সমালোচনার মধ্য দিয়ে কবিকে দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। বিশেষ করে জীবনের শেষভাগে তাঁর রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সাহিত্যিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, যা কবিকে মানসিকভাবে বেশ কষ্ট দিত।
অমর সৃষ্টি: ‘সোনালী কাবিন’
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতাকে নাগরিক কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত করে মাটির ঘ্রাণে সিক্ত করেছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩) প্রকাশের পরপরই তিনি বোদ্ধা মহলের নজর কাড়েন। এরপর প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’।
তবে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘সোনালী কাবিন’ সনেটগুচ্ছ তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব এনে দেয়। গ্রামীণ রূপক, কাম-কলা, লোকজ শব্দচয়ন এবং শাশ্বত বাঙালি প্রেমের এমন অনবদ্য প্রকাশ বাংলা কবিতায় বিরল। এছাড়া তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ সহ অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৬৮) এবং দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ (১৯৮৭) লাভ করেন।
কবি আল মাহমুদের কালজয়ী সনেটগুচ্ছ ‘সোনালী কাবিন’-এর কয়েকটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত লাইন নিচে দেওয়া হলো, যেখানে তিনি লোকজ ঐতিহ্য, প্রেম ও দ্রোহকে অসাধারণ শব্দে বুনেছেন:
“আমার ঘরের পাশে ফেটেছে কি কার্পাসের ফল? রেণুভরা লতাটিরে জড়ালো কি আশ্লেষের নদী? তবে কেন কেঁদে ওঠে আমার এ বুকের পঞ্জর? কার লাগি এতকাল পুষেছি এ আর্যের আরতি?”
“ক্ষুধার্ত নদীর মতো বয়ে যায় আমাদের আয়ু, আমরা তো চরের মানুষ, আমাদের কোনো ঘর নেই। শুধু এই পলিমাটি, এই শস্য, এই নীল বায়ু আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের ভালোবাসার খেই।”
“শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রাঙা এ মাটির কসম, তোমারে চিনেছি আমি রক্তের ভেতরে বারে বার। তুমি তো আমার সেই চিরচেনা বাংলার মরম, যার লাগি দিতে পারি এ জীবন সহস্র হাজার।”
“বসন ওলোচ করো, হে চরের মেয়ে, নদী ও নারীর রূপ এক হয়ে মিশেছে এখানে। আমাদের প্রেম যেন ফসলের গান গেয়ে মিশে যায় এই মাটির অতল গহীনে।”
শেষ জীবনের ইতিকথা
জীবনের শেষ দিনগুলো কবির জন্য অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও কষ্টের ছিল। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ, দৃষ্টিহীনতা এবং একাকীত্ব কবিকে গ্রাস করেছিল। ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। অবশেষে ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আল মাহমুদ শারীরিক অবয়বে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ‘সোনালী কাবিন’ কিংবা ‘লোক লোকান্তর’-এর শব্দমালা বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি


























