ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান। তার দেশে আসার পরিকল্পনার খবরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ইচ্ছা প্রকাশ এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। একদিকে পলাতক নেত্রীর দেশে ফিরে আইনি লড়াই বা আত্মসমর্পণের ঘোষণা, অন্যদিকে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে তার সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের রাজপথ ও আদালতের দাবি- সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে চলছেএক চরম অনিশ্চয়তা ও টানটান উত্তেজনা।
গণ-অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনার পলায়ন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে তার টানা ১৫ বছরের শাসনের। বর্তমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
তার চলে যাওয়ার পর গত বছরের (২০২৫ সালের) ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এছাড়া বর্তমানে সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ৬৬৩টি মামলা চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই সরাসরি হত্যা মামলা। এই আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই রয়টার্সে তার দেশে ফেরার বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক বক্তব্য ও দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা তাদের কঠোর অবস্থান ও আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।
বিএনপি’র অবস্থান: বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই প্রসঙ্গে দলের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের দায়ে আদালতে ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তিনি বলেন, “হাসিনা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেটি তাদের দলীয় বিষয়। তবে জনগণ চায় তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার রায় যেন কার্যকর হয়। বর্তমানে আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং সরকার এতে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না।”
জামায়াতে ইসলামীর আশঙ্কা
শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পেছনে গভীর কোনো রহস্য বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি এই প্রক্রিয়ায় সরকারের ভেতরের কারও সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “হাসিনার এই ঘোষণার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে। আমরা সন্দেহ করছি, বর্তমান সরকারের ভেতরের কোনো অংশ হয়তো আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনীতিতে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে।”
এনসিপি’র কঠোর হুশিয়ারি
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এ বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, তবে তা কেবল তার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার জন্যই হবে। একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার দেওয়া বা কর্মসূচি ঘোষণার আইনগত অধিকার নেই।”
নাহিদ ইসলাম আরও যোগ করেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। তাই ভারতের দিল্লির প্রতি কঠোর ও কূটনৈতিক বার্তা পাঠানোর জন্য তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি



























