যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কার্যত “সমাপ্ত” বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবারের এই আকস্মিক ঘোষণার পর মার্কিন প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টি আবারও এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। সামনেই কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এমন সময়ে একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধে নতুন করে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ট্রাম্পের জন্য এক নতুন “রাজনৈতিক চোরবালি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া তাঁর পক্ষে বেশ কঠিন হবে।
রিপাবলিকানদের ভরাডুবির শঙ্কা
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর পর থেকেই রিপাবলিকানরা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। তবে আকস্মিকভাবে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ায় দলটির ভেতর নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
রিপাবলিকান নেতারা আগেই হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছিলেন যে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা নির্বাচনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন ভোটারদের বড় অংশ যে যুদ্ধের বিরোধী, সেই যুদ্ধের দায় মাথায় নিয়েই রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনে লড়তে হচ্ছে। তারা যেমন এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারছেন না, তেমনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের থেকে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে দূরে সরিয়ে নেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ভোটারদের অস্বস্তি জীবনযাত্রার ব্যয়
সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম চড়চড় করে বাড়তে শুরু করেছে, যার ধাক্কা লেগেছে বুধবারের আর্থিক বাজারগুলোতেও।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনকারী সংগঠন মেইন স্ট্রিট পার্টনারশিপ-এর প্রধান সারা চেম্বারলিন বলেন: “যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা নভেম্বরে রিপাবলিকানদের জন্য নিশ্চিতভাবেই বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে। ভোটারদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের এই মৌসুমে যদি আবারও জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”
চেম্বারলিনের মতে, এখন রিপাবলিকানদের সামনে একমাত্র পথ হলো- এই যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়াকে ট্রাম্পের একটি বাধ্যতামূলক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং এর সম্পূর্ণ দায় ইরানের ওপর চাপানো।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির ভরাডুবি
সাম্প্রতিক একাধিক জাতীয় জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান সংকট মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকায় তীব্র অসন্তুষ্ট। ফক্স নিউজ পরিচালিত জুন মাসের এক জরিপে ৫৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
একই জরিপে ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশ একে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলে মত দিয়েছেন।
টমাস ম্যাসি’র ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট
যুদ্ধবিরতি বাতিল হওয়ার পর থেকে অধিকাংশ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তারা একদিকে ট্রাম্পের আনুগত্য রক্ষা এবং অন্যদিকে নিজেদের নির্বাচনী এলাকার যুদ্ধবিরোধী জনমতের চাপের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন।
তবে কয়েকজন রিপাবলিকান প্রকাশ্যে দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম টমাস ম্যাসি, যিনি মে মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীর কাছে হেরে যান। বুধবার ম্যাসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে লেখেন: “আমি হাসপাতালে ভর্তি সিনেটর মিচ ম্যাককনেলের সঙ্গে কথা বলেছি। ম্যাককনেল নাকি আমাকে বলেছেন—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে হবে, ইসরায়েলকে সহায়তা বন্ধ করতে হবে, আদালতের অনুমতি ছাড়া আমেরিকানদের ওপর নজরদারি বন্ধ করতে হবে, আর আমার প্রাইমারি নির্বাচনের ফল নিয়ে তিনি সত্যিই দুঃখিত।”
ডেমোক্র্যাটদের তীব্র আক্রমণ
এদিকে ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তারা একে ট্রাম্পের “পছন্দের যুদ্ধ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ড্যান গোল্ডম্যান এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন: “খাদ্য, বাসাভাড়া এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন ট্রাম্পের বেপরোয়া ইরান যুদ্ধের কারণে আমেরিকানদের এখন বিমান ভ্রমণের জন্যও আরও বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। তিনি শুধু সেই জীবনযাত্রার সংকটকেই আরও গভীর করেছেন, যা সমাধানের অঙ্গীকার করেছিলেন।”
একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন’ অনুযায়ী একটি প্রস্তাব পাসের দাবি নতুন করে তুলেছেন, যাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখলে প্রেসিডেন্টকে বাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য করা যায়।
ট্রাম্পের নতুন হুমকি
তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিয়ে ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনও চলতে পারে। তবে একইসঙ্গে তিনি ইরানের নেতাদের কটূক্তি করে ভবিষ্যৎ আলোচনাকে “সময়ের অপচয়” বলে মন্তব্য করেন।
বুধবার তিনি জনসমক্ষে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ও অবকাঠামো ধ্বংসের চূড়ান্ত হুমকি দিয়ে বলেন: “এক দিনের মধ্যেই আমরা ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস করে দিতে পারি। তাদের সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানা রয়েছে, প্রয়োজন হলে সেগুলোও ধ্বংস করব… এমনকি খার্গ দ্বীপও হয়তো আমরা দখল করে নেব!”
বাংলা৭১নিউজ/সূত্র: পার্সটুডে/























