বিশ্বকাপ ফুটবলে পরাশক্তি দেশগুলোর মাঠের লড়াই মানেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের বাড়তি উন্মাদনা। এই রোমাঞ্চ ও উত্তেজনাকে টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে এবং শীর্ষ দলগুলোকে বেশি সময় টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে একটি বিশেষ কাঠামো চালু করেছিল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া সেই নতুন নিয়মের সরাসরি প্রভাব ও সুফল এখন দেখা যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে।
সেমিফাইনালের আগে মুখোমুখি হচ্ছে না শীর্ষ ৪ দল
ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের ড্র এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল সেমিফাইনালের আগে কোনোভাবেই একে অপরের মুখোমুখি না হয়। এই নিয়মের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রুপ পর্বে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারলে শীর্ষ দলগুলোর জন্য ফাইনালে ওঠার পথ তুলনামূলক সহজ করে দেওয়া।
ড্রয়ের সময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিল স্পেন, দ্বিতীয় স্থানে আর্জেন্টিনা, তৃতীয় স্থানে ফ্রান্স এবং চতুর্থ স্থানে ইংল্যান্ড। নতুন বিন্যাস অনুযায়ী, র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল স্পেন এবং দুই নম্বর দল আর্জেন্টিনাকে ড্রয়ের দুটি ভিন্ন অংশে রাখা হয়। একইভাবে বিপরীত অংশে রাখা হয় ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে।
শর্ত পূরণ করে কোয়ার্টার ফাইনালে ‘বিগ ফোর’
ফিফার এই সিডিং পদ্ধতির সুবিধা পাওয়ার পেছনে একটি বড় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। শর্তটি ছিল – শীর্ষ চার দলকে অবশ্যই নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে আসতে হবে।
শর্ত পূরণে কোনো ভুল করেনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ চার পরাশক্তি। স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড- চার দলই গ্রুপসেরা হয়ে শেষ ষোলোর বাধা পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে। ফলে ফিফার করা নকআউট পর্বের পরিকল্পনাটি এখন পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে।
সেমিফাইনালে সম্ভাব্য দুই ‘হাইভোল্টেজ’ লড়াই
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে কোয়ার্টার ফাইনালে এই চার দলই ভিন্ন ভিন্ন এবং তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছে। শেষ আটের লড়াইয়ে দলগুলোর লাইনআপ:
-
স্পেন বনাম বেলজিয়াম
-
আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড
-
ফ্রান্স বনাম মরক্কো
-
ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে
বর্তমান ফর্ম ও শক্তির বিচারে কোয়ার্টার ফাইনালের এই চার ম্যাচেই যথাক্রমে স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে ফেবারিট ধরা হচ্ছে। তারা সবাই নিজ নিজ ম্যাচে জয় পেলে সেমিফাইনালেই ফুটবলবিশ্ব দেখতে পাবে দুটি অতি-কাঙ্ক্ষিত হাইভোল্টেজ দ্বৈরথ- স্পেন বনাম ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড।
ফিফার ‘সিডিং’ পদ্ধতি
টুর্নামেন্টের শুরুতেই বড় দলগুলোর পারস্পরিক বিদায় এড়াতে এবং শেষ দিকে আকর্ষণীয় ম্যাচ উপহার দিতেই ফিফা এই কাঠামো বেছে নিয়েছে। এই ধরনের ‘সিডিং’ পদ্ধতি অবশ্য ক্রীড়াবিশ্বে নতুন নয়। টেনিসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট ‘উইম্বলডন’-এ দীর্ঘদিন ধরে এই নীতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এমনকি ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন ফরম্যাটেও শীর্ষ দলগুলোর সম্ভাব্য মুখোমুখি হওয়ার সময় নির্ধারণে অনুরূপ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। গত গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপেও এই একই ধরনের র্যাঙ্কিংভিত্তিক বিন্যাস দেখা গিয়েছিল, যে আসরের ফাইনালে প্যারিস সেন্ট জার্মেইকে (পিএসজি) হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ইংলিশ ক্লাব চেলসি।
বিতর্কের মুখে ফিফা
ফিফার এই নতুন নিয়ম যেখানে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে রোমাঞ্চ তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি বড় দলগুলোর প্রতি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থার পক্ষপাতিত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কও উসকে দিয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বড় দলগুলোকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রেখে বাণিজ্যিক ফায়দা লুটতেই ফিফা এই অতিরিক্ত সুবিধা দিচ্ছে।
চলতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার লড়াইকে কেন্দ্র করে এই সিডিং ও রেফারিং বিতর্ক আরও জোরালো রূপ নিয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই নিয়ম ছোট দলগুলোর রূপকথা রচনার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















