চট্টগ্রামে পাহাড়ে বাস করছেন লক্ষাধিক মানুষ। প্রতি বছর পাহাড় ধসে গড়ে ১৩ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন রাতে সাতটি পাহাড় ধসে মারা যায় ১২৭ জন। দেড় যুগেও বাস্তবায়িত হয়নি ৩৬ সুপারিশ। কক্সবাজারে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলায় পাহাড়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে এক লাখের মতো মানুষ বসবাস করছে। রাঙামাটিতে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ে বাড়ছে উৎকন্ঠা।
চলছে মাইকিং। খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করছে ২ সহস্রাধিক পরিবার।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে অবৈধভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের জীবনে কালরাত এসেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতে সেই রাতে সাতটি পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি হয়। এরপর পাহাড়ধস ঠেকাতে করা হয় বিশেষ কমিটি। নেওয়া হয় ৩৬ দফা সুপারিশ।
পরবর্তী দেড় যুগে প্রতি বছর গড়ে ১৩ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও এসব সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদ সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষতি এড়ানো যাচ্ছে না। সবার আগে এত বছরেও কেন সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি সেটার কারণ খোঁজা দরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বর্ষায় পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি হলেও সারা বছর প্রশাসন এ ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। বর্ষার সময় জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যেতে ব্যাপক মাইকিং করা হয়। খোলা হয় পুনর্বাসনকেন্দ্র। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েক দিন অবৈধ বসবাসকারীদের সরাতে তৎপর সংস্থাগুলো। গতকাল ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, ধসের জন্য কেবল বৃষ্টি ও প্রকৃতি দায়ী নয়। এর পেছনে মনুষ্যসৃষ্ট কারণও আছে। পাহাড় কাটা, বৃক্ষনিধন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, পাহাড়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা না করাসহ নানা কারণে ধসের ঘটনা ঘটছে। তবে সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে অন্তত ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, গত ১৯ বছরে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পাহাড় ধসে প্রতি বছর গড়ে ১৩ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন নগরীর মতিঝরনা, কুসুমবাগ, কাছিয়ারঘোনা, লেডিস ক্লাবসহ সাতটি পাহাড় ধসে এক দিনেই ১২৭ জনের মৃত্যু হয়।
পরের বছরের আগস্টে মতিঝরনা পাহাড় ধসে ১২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালে বাটালি হিল ধসে ১৭ জন, ২০১২ সালে একাধিক পাহাড় ধসে ২৪ জন, ২০১৩ সালে আবারও মতিঝরনা পাহাড়ের পাশে দেয়াল ধসে ২ জন, ২১ সেপ্টেম্বর মাঝিরঘোনা পাহাড়ে ২ জন, ২০১৮ সালে ফিরোজ শাহ কলোনি পাহাড়ে ৪ জন, ২০১৯ সালে কুসুমবাগ পাহাড়ে ১ জন, ২০২২ সালে ৪ জনসহ আড়াই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।
২০০৭ সালে পাহাড় ধসের পর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে পাহাড়ধস ও প্রাণহানি প্রতিরোধে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি করা হয়। ওই কমিটির উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে ছিল পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ন্যাড়া পাহাড়ে জরুরি বনায়ন, পাহাড়ের পাশে গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, মতিঝরনা ও বাটালি হিলের পাদদেশে সব অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ, পাহাড়ের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো হাউজিং প্রকল্প না করা, নগরীকে পর্যায়ক্রমে নগর লাগোয়া পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার দিকে সম্প্রসারণ ইত্যাদি।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোর সভায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের অবৈধ পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংযোগকারী বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এ ছাড়া রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে ৫ হাজার ৩৩২টি স্থাপনার তালিকা করেছে সংস্থাটি। শুধু এসব পাহাড়েই ৫০ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। বিভিন্ন সময়ে এসব পাহাড়ে অভিযান চালিয়েও তাদের সরানো যায়নি।
কক্সবাজার : জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও দমকল বাহিনীর তথ্যমতে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলায় পাহাড়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে এক লাখের মতো মানুষ বসবাস করছে। কক্সবাজারের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ১২ হাজার ৬০৫ একর বনভূমি ব্যক্তি পর্যায়ে দখল হয়েছে। যেখানে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
দক্ষিণ বন বিভাগের প্রায় ১৫ হাজার একর বনভূমিজুড়ে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বন বিভাগের এই পাহাড়ি এলাকায় এক লাখ মানুষের বসবাস। এদিকে গতকাল দুপুরে কক্সবাজার শহরতলির দরিয়ানগর এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে কক্সবাজারে চলতি বর্ষায় পাহাড় ধসে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাঙামাটি : টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। মানুষের জানমাল রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জেলা তথ্য অফিসের সহায়তায় মাইকিং অব্যাহত রাখা হয়েছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, টানা বৃষ্টি অব্যাহত আছে। তবে জেলার ১০টি উপজেলার কোথাও পাহাড় ধসে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের নিরাপদে সরে যেতে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মানুষের জানমাল রক্ষা করতে মাঠে কাজ করছে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক দল। প্রায় ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা আছে।
খাগড়াছড়ি : জেলার ৯টি উপজেলায় দুই সহস্রাধিক পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস করছে। পাহাড় কাটারোধে জেলা প্রশাসন প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকে। তবু এখানে পাহাড় কাটা থেমে নেই। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মারুফ জানান, গত এক বছরে ৩৬টি অভিযান চালানো হয়েছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ
























