সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন

ভোটের মুখে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’: তারেক রহমানকে ঘিরে সেই মিডিয়া ট্রায়াল

বাংলা৭১নিউজ রিপোর্ট
  • আপডেট সময় সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ১৫৬৬ বার পড়া হয়েছে

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে তারেক রহমান ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই)-এর কথিত যোগাযোগ নিয়ে যে ধরনের সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এমন নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত একতরফা রিপোর্টে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠেছিল। পরবর্তিতে বেরিয়ে আসে-  বিএনপিকে ঠেকাতে এ ধরণের আজগুবি রিপোর্টের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকার ৪শ’ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল।

​তৎকালীন সেই সংবাদিকতা, তথ্যের উৎস এবং পরিবেশনার ধরনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।

সময়টা ২০১৮ সাল। জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচন। দেশব্যপী সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি’র জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের একটি অংশ, পুলিশ বিভাগ, ৬৪ জেলার জেলাপ্রশাসক, পুলিশের এসপি, এএসপি ও ওসি, গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ, তথা কথিত সিভিল সোসাইটি বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে। দিনের ভোট রাতে করার সকল পরিকল্পনা পাকাপোক্ত হয়ে যায়।

একথা ঠিক যে, যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দল বা নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব। তবে পেশাদার সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে উপস্থাপন করা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে প্রকাশিত ‘আইএসআই সংযোগ’ সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রে দেশের বহু শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

তথ্যের একতরফা উৎস ও যাচাইহীন সাংবাদিকতা

​এই প্রচারণার সবচেয়ে দুর্বল দিকটি ছিল তথ্যের উৎস। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যম কোনো স্বাধীন অনুসন্ধান ছাড়াই কেবল “গোয়েন্দা সূত্র” বা “গোপন নথি”-র ওপর ভিত্তি করে হুবহু একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করে।

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও দৈনিক কালের কণ্ঠ এই দুই শীর্ষ দৈনিক ২১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও আক্রমণাত্মক উপায়ে খবরটি প্রথম পাতায় প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করে। কিন্তু অডিও রেকর্ডের দাবি করা হলেও তার কোনো অকাট্য বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ সাধারণ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। যা ছিল হলুদ সাংবাদিকতার একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। বসুন্ধরা ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের মালিকদের সরাসরি নির্দেশেই এমন হলুদ সাংবাদিকতা হয়েছিল।

​বাংলা ট্রিবিউন ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এই অনলাইন পোর্টালগুলো দুবাই বৈঠকের তারিখ ও সময়সহ খুঁটিনাটি বিবরণ ধারাবাহিক আকারে প্রকাশ করতে থাকে। সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী এই ধরনের সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা অন্য কোনো স্বাধীন উৎস থেকে যাচাই করা আবশ্যক হলেও, তা করা হয়নি। এগুলো করা হয়েছিল শুধুমাত্র বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে না দেওয়ার এক গভীর চক্রান্ত।

​অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য উপেক্ষিত

​পেশাদার সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান নীতি হলো ‘ফেয়ারনেস’ বা ন্যায্যতা। কারো বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললে তার বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে হয়।

​দৈনিক জনকণ্ঠ এবং দৈনিক ভোরের কাগজ এই পত্রিকাগুলো তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেদনগুলোতে তারেক রহমানকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ও শিরোনাম ব্যবহার করে। সেখানে অভিযুক্ত পক্ষের (বিএনপি বা তারেক রহমান) আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যকে হয় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল, না হয় খবরের একেবারে শেষ অংশে নামমাত্র স্থান দেওয়া হয়েছিল।

​টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে একাত্তর টিভি, সময় টিভি ও ডিবিসি নিউজ এই স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো প্রাইম টাইম টকশো এবং বিশেষ ভিজ্যুয়াল রিপোর্টে এই কথিত বৈঠকগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে আলোচনা সাজিয়েছিল। লাইভ আলোচনায় একতরফাভাবে বিষোদগার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা মিডিয়া ট্রায়াল-এর শামিল।

​রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত টাইমিং

​গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এই রিপোর্টগুলোর প্রকাশের সময় বা টাইমিং ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ২১ ও ২২ ডিসেম্বর এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলা এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি প্রমাণ বা আদালতের রায় ছাড়াই একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্বাচনের মুখে “রাষ্ট্রদ্রোহী” বা “বিদেশি এজেন্টের” সমার্থক করে তোলার এই প্রবণতাকে অনেক বিশ্লেষক ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বা ‘প্রোপাগান্ডা জার্নালিজম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

​ব্যতিক্রমী ভূমিকা

​তৎকালীন এই একতরফা প্রচারণার বিপরীতে দৈনিক প্রথম আলো ও নিউ এইজ এর মতো কিছু পত্রিকা কিছুটা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছিল। তারা এই ধরনের গোয়েন্দা-ভিত্তিক সংবেদনশীল তথ্য সরাসরি নিজেদের অনুসন্ধান হিসেবে না ছেপে, বরং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বক্তব্য হিসেবে নিরপেক্ষ দূরত্বের সাথে প্রকাশ করেছিল। তবে দৈনিক নয়া দিগন্ত একে বিএনপির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবে তুলে ধরেছিল।

পুনশ্চ

​২০১৮ সালের ডিসেম্বরের সেই দিনগুলোতে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে দেশের মূলধারার একটি বড় অংশের মিডিয়া যেভাবে উৎসবিহীন এবং একতরফা তথ্যকে “লিড নিউজ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, তা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার একটি বড় বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক চাপের মুখে কিংবা নিজস্ব দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের এমন নীতিনৈতিকতাহীন আচরণ পাঠক ও দর্শকের কাছে গণমাধ্যমের নিজস্ব নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেই দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com