আওয়ামী লীগের অপপ্রচারের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বার্থে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখছেন। এটা ঠিক যে, রাজনীতি ও কূটনীতির মারপ্যাঁচে অনেক সময় শিষ্টাচারের দেয়াল ভেঙে পড়ে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধী দলের প্রচার-অপপ্রচার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চারদিনের এই সফর শুরু হবে ২৩ জুন থেকে ২৬ জুন ২০২৬ পর্যন্ত। সফরকালে তিনি চীনের দালিয়ান শহরে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’ ফোরামে অংশগ্রহণ, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান চাও ল্যচির সাথে শীর্ষ বৈঠক করবেন। এরপর বিকেলে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। অন্যদিকে, টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফরগুলোর মধ্যে চীন সফরটি ছিল চরম লজ্জাজন্ক। শেখ হাসিনার ওই সফরটি ছিল ২০২৪ সালের ৮ জুলাই। চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের রাজধানী বেজিংয়ে যান শেখ হাসিনা। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ১১ জুলাই সকালে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে, অর্থাৎ ১০ জুলাই গভীর রাতে তিনি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসেন। শেখ হাসিনার ওই সফরে বাংলাদেশ যেভাবে অপমানিত হয়েছিল, তা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। বাধ্য হয়ে নির্ধারিত সময়সূচির আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। চীন সফর থেকে ফিরে আসার মাত্র ২৬ দিনের মাথায় শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতন ঘটে এবং তাঁর ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়।
তারেক রহমানের শিষ্টাচার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি যদি বিএনপির সরকারের আমলে ঘটতো এবং আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতো, তবে তারা এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো। খুব পরিকল্পিত উপায়ে প্রচারণা চালানো হতো যে—বিএনপি আমলের প্রধানমন্ত্রী যে দেশে গিয়ে অপমানিত হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী সেই দেশ থেকেই তাঁর সফল বিদেশ সফর শুরু করলেন! কিন্তু বিএনপি সম্ভবত একধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিচয় দিয়ে এই ধরনের সস্তা প্রচারণা থেকে বিরত থেকেছে।
কেন তড়িঘড়ি ফিরেছিলেন?
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক প্রত্যবর্তন নিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের হঠাৎ অসুস্থতার কারণে একজন মা হিসেবে সময় দিতে তিনি ক্ষণকালও বিলম্ব না করে রাতের ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন। তবে তার চীন সফরকালে কোনো কূটনৈতিক কর্মসূচি বাদ যায়নি।
কিন্ত হাছান মাহমুদের ওই ব্যাখ্যা দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বরং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা যে বিশাল অর্থনৈতিক প্রত্যাশা নিয়ে বেজিংয়ে গিয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় শেখ হাসিনা তীব্র অসন্তুষ্ট হয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করেন। বাংলাদেশ আশা করেছিল এই সফরে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার সমমানের ঋণ বা আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ নিশ্চিত হবে। কিন্তু চীন মাত্র ১ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ডলার) বা তার কাছাকাছি অঙ্কের নামমাত্র আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ব্যবধান এবং চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আশানুরূপ প্রটোকল না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে আসেন।
চীনের সাথে হাসিনার টানাপোড়েন
শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠে বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কে কতটুকু চির ধরেছে। সম্পর্কের এই শীতলতা বা টানাপোড়েন নানা দিক ছিল। বিশেষ করে- চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে অর্থায়ন ও কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে বাংলাদেশ এই প্রজেক্টে চীনকে বাদ দিয়ে ভারতকে যুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়। চীন সফর থেকে ফেরার পরপরই (১৩ জুলাই) শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানান, ভূরাজনৈতিক কারণে তিস্তা প্রকল্প ভারতকে দেওয়া হতে পারে। চীনের এই বড় ভূরাজনৈতিক চাওয়া পূরণ না হওয়া ছিল অন্যতম বড় ধাক্কা।
এছাড়াও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার এই সফরের কভারেজ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এমনকি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক না হওয়া এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকটি মাত্র ৩০ মিনিটের মতো সংক্ষিপ্ত হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল।
ভারতের সাথে অতিমাত্রার ঘনিষ্ঠতা
শেখ হাসিনার সাথে ভারত সরকারেরঅতিমাত্রার ঘনিষ্টতাও ছিল বেইজিংয়ের অসন্তুষ্টির অন্যতম একটি কারণ। চীন সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, ২০২৪ সালের জুনের শেষভাগে শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সেটিই ছিল তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর। সেখানে ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা, কানেক্টিভিটি এবং তিস্তা প্রকল্পের ব্যাপারে একাধিক কৌশলগত চুক্তি ও সমঝোতা হয়।
চীন এটিকে ভালোভাবে নেয়নি। বেইজিং মনে করেছে, শেখ হাসিনার সরকার ভারতের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং চীনকে কেবল “অর্থনৈতিক ব্যাংক” হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। ভারতের সাথে ঢাকার এই “অতিমাত্রার ঘনিষ্ঠতা” এবং দিল্লির প্রেসক্রিপশনে চলাচলের কারণেই বেইজিং ঢাকাকে বড় কোনো আর্থিক লাইফলাইন দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
আ. লীগের ফেসবুকে ‘উন্মাদনা’
ক্ষমতাসীন দল যদি শেখ হাসিনার সেই ব্যর্থ সফরকে সামনে নিয়ে আসতো, তবে তা কোনোভাবেই অযৌক্তিক হতো না। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের বিষয়ে সেই ন্যূনতম রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অতিসম্প্রতি এমন কিছু কুরুচিপূর্ণ ও উগ্র স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে (যা পরে তারা মুছে দিতে বাধ্য হয়), যা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে।
গণতান্ত্রিক দেশে সরকারবিরোধী দল হিসেবে ‘বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা’ করার চল দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগের বেলায় বিএনপি, কিংবা বিএনপির বেলায় আওয়ামী লীগ—এমনটা গত কয়েক দশক ধরেই করে আসছে। কিন্তু দলটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের এমন আক্রমণাত্মক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য দেখে মনে হয়, তাঁরা রাজনৈতিক বাস্তবতা হারিয়ে একধরনের মানসিক দেউলিয়াত্বে ভুগছেন।
সাউথ ব্লকের নজর
আওয়ামী লীগের অপপ্রচারের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বার্থে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখছেন। স্বভাবতই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিষয়গুলোর দিকে ভারতের সাউথ ব্লক (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) নজর রাখছে, যা একটি প্রতিবেশী দেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক কার্যক্রম।
তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সাউথ ব্লকের সূত্রের বরাতে স্পষ্ট জানিয়েছে—নরেন্দ্র মোদি সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরকে কোনোভাবেই ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। দিল্লি এই সফরকে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রয়াস হিসেবেই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
প্রবাসে বসে সস্তা রাজনীতি
অথচ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক কয়েকজন নেতা দলের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের যে কোনো বিষয়ে নীতিগত অবস্থানের কথা বিদেশে বসে এভাবে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া যায় না—এই ন্যূনতম বোধটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন দলটির প্রবাসে থাকা নেতারা।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি