সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৪:২৭ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দুমুঠো ভাতের খোঁজে নরকবাস: রিক্তা হত্যা মামলায় পাউবোর সবিবুর বরখাস্ত পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তিন মাসের মধ্যে ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী মালয়েশিয়া থেকে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারে রাস লাফান গ্যাস টার্মিনালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিখোঁজ ১৮ ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া আসুন আমরা সবাই মিলে দেশের জন্য কিছু করার চিন্তা করি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার হুমকি দিলেন ট্রাম্প মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খোলার অনুরোধ তারেক রহমানের

স্মৃতিপটে মহীয়সী: রাজিয়া মজিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা
  • আপডেট সময় সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
  • ৪৭২ বার পড়া হয়েছে

বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এবং দেশের শিক্ষা বিস্তারে যে কজন মহীয়সী নারী নিজেদের মেধা ও কর্মের দ্যুতি ছড়িয়েছেন, একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ রাজিয়া মজিদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। একাধারে তিনি যেমন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি অবক্ষয়হীন ও বৈচিত্র্যময় লেখনী দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রেখে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন এই অকুতোভয় নারী। আজকের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই ক্ষণজন্মা গুণীজনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জন্মস্থান

রাজিয়া মজিদ ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়—তার পৈত্রিক নিবাস টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে হলেও, অন্য সূত্রে তার জন্ম জামালপুরের শ্যামপুর গ্রামে। তার পিতা ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক আব্দুস সবুর সিদ্দিকী এবং মাতা কামরুননেসা।

প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন ‍তিনি 

ফরিদপুরের হালিমা জুনিয়র মাদ্রাসা থেকে তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। ১৯৪৪ সালে (মতান্তরে ১৯৪০) এই মাদ্রাসা থেকেই পঞ্চম শ্রেণি (জুনিয়র মাদ্রাসা) পাস করেন। তিনি অবিভক্ত বাংলার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে সরকারি বৃত্তি ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী ঈশান ইনস্টিটিউট থেকে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাঙ্গুয়েজে মেরিটে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘মারহাবা পুরস্কার’ লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিখ্যাত লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯৪৮ সালে বিএ পাস করেন।

রাজিয়া মজিদ  ১৯৪৮ সালে ঢাকায় ফিরে আসার পর ১৯৫০-৫১ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিটি (বিএড) ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষা বিস্তারে চার দশক

রাজিয়া মজিদ তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব সুনামের সঙ্গে পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন  ভাষা বিশেষজ্ঞ। ১৯৫১-৫৪সাল পর্যন্ত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষা বিভাগে ‘বাংলা ভাষা স্পেশালিস্ট’ হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৫৫-৬১ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি ১৯৬২-৬৭ সাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগীয় সহকারী স্কুল পরিদর্শক এবং ১৯৬৩ সালে খুলনা বিভাগীয় গার্লস গাইডের বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৩-৬৬ সালপর্যন্ত তিনি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষিকা সমিতির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

রাজিয়া মজিদ দেশের বহু নামকরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি খুলনা সরকারি গার্লস হাইস্কুলে (বয়বা) ১৯৬৭-৭০ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-৭৬ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, ১৯৭৬-৮২ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ধানমণ্ডি কামরুননাহার সরকারি বালিকা বিদ্যালয় এবং ১৯৮২-৮৬ সাল পর্যন্ত  ঢাকা শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয-এ  প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২-৮৬ সাল পর্যন্ত রাজিয়া মজিদ বাংলাদেশ সরকারি শিক্ষক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। এর আগে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলা ‘আপওয়া’ (APWA)-এর জেলা সম্পাদক হিসেবেও সমাজসেবামূলক কাজ করেন।

সাহিত্য সাধনায় নিরবচ্ছিন্ন পথচলা

মাত্র ১০ বছর বয়স (১৯৪০ সাল) থেকে শুরু করে পঁয়ষট্টি বছর বয়স পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন এবং একাগ্রচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মগ্ন ছিলেন রাজিয়া মজিদ। সমাজ জীবনের অন্বেষা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং জীবনের গভীর অভিজ্ঞতা তার লেখার মূল উপজীব্য।

অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিলে’ তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে কলকাতার ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার ‘আগুনের ফুলকি’ পাতা, পরবর্তীতে বড়দের পাতা এবং বিখ্যাত ‘বেগম’ পত্রিকায় তার লেখা নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে।

১৯৪৮ সালে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, পাকিস্তানি খবর, মাহেনও, সাপ্তাহিক রোববার, সচিত্র বাংলাদেশ, চিত্রালী, নবারুণ, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক যুগান্তরসহ সমকালীন প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তার অজস্র লেখা প্রকাশিত হয়।

রাজিয়া মজিদ রেডিও এবং টেলিভিশনে তিনি একজন সফল নাট্যকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও ঢালিউডের বিখ্যাত ‘পেনশন’ ছায়াছবির কাহিনিকার হিসেবে তিনি দারুণ খ্যাতি অর্জন করেন।

রাজিয়া মজিদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে উপন্যাস (তমসা বলয়, দিনের স্বপ্ন, শতাব্দীর সূর্যশিখা, নক্ষত্রের পতন, সেই তুমি), গল্পগ্রন্থ (আকাশে অনেক রং, ভালবাসার সেই মেয়েটি), কিশোর সাহিত্য (সিন্দাবাদ) এবং বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি (মহাসাগরের মহাদেশ, করাচীর চিঠি) অন্যতম। তার ‘ভালবাসার সেই মেয়েটি’ গল্পগ্রন্থটি ২০০৮ সালে ইংরেজি ভাষায় ‘The Girl in Love’ নামে অনূদিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজিয়া মজিদের অবদান অনন্যসাধারণ। প্রতিকূল ও বিপজ্জনক পরিবেশের মধ্যেও নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বহু মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও স্ত্রীকে নিজের গৃহে আশ্রয় দান করেছিলেন।

অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ ও কৌশলগত সাহায্য করেছিলেন।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাময়িক ট্রেনিংয়ের গোপন ব্যবস্থাও করেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে রাজিয়া মজিদ বিশিষ্ট রাজনীতিক, সমাজসেবী এবং পাকিস্তান পার্লামেন্টের সদস্য (এমএনএ) এস এম আহমেদ মজিদ-এর সহধর্মিণী ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, বিয়ের মাত্র ছয় বছর পর তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর অকাল প্রয়াণের পর তিনি আর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। গভীর নিষ্ঠায় একমাত্র কন্যা নাজনীন মজিদ লিপি-কে বড় করে তোলেন, যিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজসেবা ও মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজিয়া মজিদ বহু জাতীয় পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে সাহিত্যে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের স্বর্ণপদক পুরস্কার,  ১৯৮৯ সালে ভাষা ও সাহিত্যে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

এছাড়াও রাজিয়া মজিদ ২০০৪ সালে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র পদক, ২০০৫ সালে বেগম পত্রিকা সম্মাননা, ২০০৫ সালে আল্পনা প্রকাশনী শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক পদক, ২০০৬ সালে সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য কবি জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক এবং ২০১০ সালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী হিসেবে জাতীয় সাহিত্য সংসদ পদকে ভূষিত হন।

মহাপ্রয়াণ

সুদীর্ঘ কর্মময় ও গৌরবোজ্জ্বল জীবনের অধিকারী এই মহীয়সী নারী ২০১৮ সালের ২২ জুন ঢাকার বনানীর নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুবার্ষিকীর এই লগ্নে আমাদের সমাজ ও সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা রাজিয়া মজিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তার কালজয়ী রচনাসমূহ আমাদের সমাজ জীবনের অন্বেষার মহৎ ছবি হয়ে যুগ যুগ ধরে আমাদের পথ দেখাবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com