সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশি নিহত, সবাই সিলেটের বাসিন্দা তৃণমূলের সেবায় আগ্রহী নন আইনজীবীরা, বাড়ানো হবে ফি : সংসদে আইনমন্ত্রী গৃহকর্মী রিক্তার মৃত্যু: বরখাস্ত হচ্ছেন পাউবো কর্মকর্তা সবিবুর ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের মৃত্যুতে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর শোক জামায়াত আমিরের সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে : বাণিজ্যমন্ত্রী মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে দুই বছর লাগবে: অর্থমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কি সোমবারই পদত্যাগ করছেন এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেবে সরকার

দশ তলার ছাদ নাকি নির্মমতার আড়াল? পাউবোর ‘টাকা খাদক’ সবিবুরের বাসায় শিশু হত্যা!

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা
  • আপডেট সময় শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
  • ৭৯৭ বার পড়া হয়েছে
পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান

ভোর ৬টা। ধানমন্ডির ৯/এ সড়কের শান্ত সকালটা আচমকাই কেঁপে ওঠে এক বিভীষিকাময় পতনের শব্দে। বিলাসবহুল একটি বহুতল ভবনের নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় ৯ বছরের এক শিশুকে— নাম রিক্তা মণি। প্রত্যন্ত সুনামগঞ্জ থেকে অভাবের তাড়নায় যে শিশুটি এসেছিল দুমুঠো ভাতের আশায়, তার শেষ ঠিকানা হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমানের ১০ তলার ফ্ল্যাটে কাজ করত রিক্তা। প্রকৌশলীর পরিবারের দাবি, এটি ‘দুর্ঘটনা’ বা ‘আত্মহত্যা’। কিন্তু নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল এবং এই কর্মকর্তার অন্ধকার অতীত এক ভিন্ন গল্পের ইশারা দিচ্ছে। টাকার জোরে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া যাঁর পুরোনো অভ্যাস, এটি কি সেই ক্ষমতার দম্ভে ঘটা এক নির্মম হত্যাকাণ্ড?

মৃত্যুর ঠিক আগে কী ঘটেছিল? মায়ের কাছে সেই শেষ আকুতি

অনুসন্ধানে জানা যায়, রিক্তা মণি ধানমন্ডির ওই প্রকৌশলীর বাসায় ভালো ছিল না। অভাবের কারণে এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সে এই শহরের জাঁকজমকে পা রেখেছিল। কিন্তু মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে মায়ের কাছে ফোনে কেঁদে কেঁদে রিক্তা বলেছিল— “আমি আর এখানে কাজ করব না, আমাকে নিয়ে যাও।”

মেয়ের কান্না শুনে মা-বাবা তাকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গৃহকর্তার স্ত্রী ফারাহ নুসরাত বর্ণি রিক্তাকে ছাড়তে রাজি হননি। উল্টো হুমকি দিয়ে বসেন, মেয়েকে নিয়ে যেতে হলে উল্টো ১০ হাজার টাকা দিতে হবে! অভাবী দিনমজুর বাবার পক্ষে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। আর তার কয়েকদিনের মাথাতেই মিলল রিক্তার লাশ।

 সুরতহালের অসঙ্গতি ও সিসিটিভি ফুটেজ

ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওপর থেকে রিক্তা নিচে পড়ে যাচ্ছে। তবে ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরাটি কেবল তৃতীয় তলা পর্যন্ত কভার করায় ঠিক কোন তলা থেকে এবং কীভাবে সে পড়ল, তা এখনও রহস্যাবৃত।

তবে রিক্তার নিথর দেহই এখন সবচেয়ে বড় সাক্ষী। পুলিশের প্রাথমিক সুরতহালে দেখা গেছে: শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের পুরনো ও নতুন চিহ্ন রয়েছে। তার বাম হাতটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাঙা হাত ও আঘাতের চিহ্নগুলো কি ওপর থেকে আছড়ে পড়ার কারণে হয়েছে, নাকি মৃত্যুর আগেই তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছিল— তা ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে।

নেপথ্য কাহিনী: দুর্নীতিগ্রস্ত সবিবুর ও পাউবোর ‘টাকা খাদক’ সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে সবিবুর রহমানের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। জানা গেছে, এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) মামলা রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ অর্থ দিয়ে তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন।

মহাপরিচালক এনায়েতের আস্কারা ও শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য

দুদকে মামলা থাকা সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সবিবুর রহমানকে সমস্ত অভিযোগ থেকে অবৈধভাবে খালাস করে দেন। শুধু তাই নয়, বিধি লঙ্ঘন করে সর্বশেষ তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে ‘অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী’ বানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই পুরো জালিয়াতি ও পদোন্নতি নাটকের মূল কারিগর বা মাস্টারমাইন্ড হলেন পাউবোর মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ। দুর্নীতির এই অভয়ারণ্যে থেকে অসৎ কর্মকর্তা সবিবুর রহমান নামে-বেনামে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। টাকার জোরে যিনি পুরো বিভাগকে পকেটে পুরেছেন, তাঁর বাসাতেই নির্মম শিকার হতে হলো ৯ বছরের এক অবুঝ শিশুকে।

এব্যপারে পাউবোর মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ এর সাথে অসংখ্যবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বিলাসবহুল একটি বহুতল ভবনের নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ৯ বছরের শিশু রিক্তা মণি

বিচারের কাঠগড়ায় ক্ষমতা: ২ দিনের রিমান্ডে প্রকৌশলী দম্পতি

এই নির্মম ঘটনায় রিক্তার বাবা মো. শাহিন বাদী হয়ে ধানমন্ডি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর ২০ জুন (শনিবার) পুলিশ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী ফারাহ নুসরাত বর্ণিকে গ্রেপ্তার করে।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে, বিচারক মো. ইসমাইল তাদের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সবিবুরের প্রভাব ও অবৈধ অর্থের জোরে জামিনের জোর চেষ্টা চালালেও রাষ্ট্রপক্ষের তীব্র বিরোধিতায় আদালত তা নামঞ্জুর করেন। বর্তমানে ধানমন্ডি মডেল থানার এসআই শাহনেওয়াজ বাপ্পি আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তদন্তের মূল ফোকাস এখন দুটি বিষয়ে— মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে ফ্ল্যাটের ভেতর কী ঘটেছিল এবং এর পেছনে কোনো আলামত ধ্বংসের চেষ্টা ছিল কিনা।

আইন বনাম বাস্তবতা: গৃহকর্মী সুরক্ষা কি কেবলই কাগজে?

রিক্তা মণির এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের শিশু অধিকার ও গৃহকর্মী সুরক্ষার কঙ্কালসার রূপটি আবারও সামনে এনেছে। মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের জন্য এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন ‘আইন’ পাস হয়নি। ২০১৫ সালের ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ কেবলই একটি ‘নীতিমালা’, কোনো কঠোর আইন নয়।

১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ দেওয়া যেখানে নিষিদ্ধ, সেখানে ৯ বছরের রিক্তা কীভাবে ৩১ মাস ধরে এক দুর্নীতিগ্রস্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাসায় নির্যাতিত হচ্ছিল, সেই প্রশ্ন এখন নাগরিক সমাজের।

শেষ কথা

একটি ৯ বছরের শিশুর স্বপ্ন, আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি পিষে গেছে ধানমন্ডির পিচঢালা রাস্তায়। যে কর্মকর্তা অবৈধ টাকার জোরে দুর্নীতি ও দুদকের মামলা ধামাচাপা দিতে পারেন, তিনি যে এই হত্যাকাণ্ডকেও ধামাচাপা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন— তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাউবো মহাপরিচালক এনায়েতসহ যে সিন্ডিকেট এই দুর্নীতিবাজকে এতদিন আড়াল করে এসেছে, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। ক্ষমতার দাপট আর আভিজাত্যের দেয়াল ভেঙে রিক্তা মণির অসহায় দিনমজুর পরিবার কি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিচার পাবে? নাকি বরাবরের মতোই টাকার জোরে পার পেয়ে যাবেন সবিবুর রহমান? উত্তর জানতে চোখ থাকবে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com