দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে-বিদেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দের আদেশ থাকলেও, এর ৮০ শতাংশ স্থাবর সম্পদে রিসিভার নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। ফলে মালিকানা কাগজে-কলমে অবরুদ্ধ থাকলেও অভিযুক্তরাই কৌশলে এসব সম্পদের সুবিধা ভোগ করছেন।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী গুলশান-২-এর ৭১ নম্বর সড়কে ‘ইস্টার্ন হারমোনি’ ভবনের একটি ফ্ল্যাটের মালিক ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। ২০২৫ সালে আদালত এটি জব্দের আদেশ দিলেও সেখানে এখনও রিসিভার নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সেগুনবাগিচায় শেখ রেহানার নামে থাকা একটি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ থাকলেও এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তা বুঝে নিতে পারেনি দুদক।
দুদকের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে দেশে রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। তবে এই বিপুল সম্পদের সিংহভাগেরই রিসিভার নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার, এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদসহ আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগীরা এখনও এসব সম্পদের সুফল পাচ্ছেন।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, আদালতের আদেশের পর অনুসন্ধানী কর্মকর্তা অনুমতি নিয়ে রিসিভার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে মাঠপর্যায়ে সম্পদ বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে লোকবলের অভাব ও সময়সাপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়াকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন দুদকের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নথিপত্র সংগ্রহ ও বিভিন্ন দপ্তরে তদন্তের জন্য প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। লোকবল সংকটের কারণে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ দ্রুত করা যাচ্ছে না।’
তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম। তার মতে, দুদকের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার ঘাটতিই এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ‘সম্পদ থেকে অর্জিত আয় রিসিভারের কাছে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু দুদক আবেদন করে সেই নিয়ন্ত্রণ না নেওয়ায় মূল অভিযুক্তরাই সম্পদ ভোগ করছেন।’
অবশ্য ধীরগতির মধ্যেও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন প্রভাবশালীর সম্পদে রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন ও সম্পদ সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুদককে আরও সক্রিয় ও কৌশলী হতে হবে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের আদেশ দেয় আদালত। নিয়ম অনুযায়ী, এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও আয় সংগ্রহের জন্য রিসিভার নিয়োগ করার কথা থাকলেও প্রশাসনিক ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়ার কথা থাকলেও সম্পদগুলো বাস্তবে পূর্বতন মালিকদের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলা৭১নিউজ/এবি