বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে ক’জন কবি নিজেদের অনন্য মৌলিকতা এবং আদর্শের শক্তিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, কবি ফররুখ আহমদ তাঁদের অন্যতম। বিশ শতকের চল্লিশের দশকের কবি ফররুখ আহমদ তাঁর কাব্যে ইসলামী ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন। একই সাথে তাঁর কলম অন্যায়, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল এক সোচ্চার হাতিয়ার। আজ এই প্রখ্যাত বাংলাদেশি কবি সৈয়দ ফররুখ আহমদ এর জন্মদিন।
এই বাঙালি কবি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি বাংলা কাব্যজগতের সর্বাধিক সনেট রচয়িতা। তার কবিতায় বাংলার অধপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামি ভাবধারার বাহক হলেও তার কবিতা প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন এবং বাক্প্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তার কবিতায় পরিব্যাপ্ত।
তার কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে তিনি যে-কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন তা স্বতন্ত্র এবং এ-গ্রন্থ তার এক অমর সৃষ্টি।
জন্ম ও পরিবার
সৈয়দ ফররুখ আহমদের জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে (তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত) মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামের সৈয়দ বংশে। তার বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফররুখ আহমদের মায়ের নাম রওশন আখতার।
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। তার নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন যা সওগাত পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।
ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে এগারো জন। তারা হলেন: সৈয়দা শামারুখ বানু, সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আবদুল্লাহল মাহমুদ, সৈয়দ আবদুল্লাহেল মাসুদ, সৈয়দ মনজুরে এলাহি, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান (আহমদ আখতার), সৈয়দ মুহম্মদ ওয়হিদুজ্জামান, সৈয়দ মুখলিসুর রহমান, সৈয়দ খলিলুর রহমান ও সৈয়দ মুহম্মদ আবদুহু।
শিক্ষাজীবন
ফররুখ আহমদ খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাস করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তবে চল্লিশ-এর দশকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। তিনি ভারত বিভাগ তথা পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেন।
কর্মজীবন
ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কলকাতায়। তিনি ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।[৬] তবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকরি করেন ঢাকা বেতারে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। এখানেই প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।
প্রেম ও ভালোবাসা
কবি ফররুখ আহমদের জীবনে প্রেম ও ভালবাসা কোনো সস্তা আবেগ বা কেবলই রূপ-লাবণ্যের স্তুতি ছিল না। তাঁর কবিতায় এবং ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমের পরিধি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। তিনি প্রেমকে দেখেছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিকতা, ঐতিহ্যপ্রীতি এবং বিশ্বমানবতার এক মেলবন্ধন হিসেবে।
কবির জীবনের প্রেম ও ভালোবাসার প্রধান দিকগুলো ছিল-
মানবপ্রেম ও শোষিতের প্রতি সহানুভূতি: ফররুখ আহমদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় জায়গাটি জুড়ে ছিল সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত ও শোষিত শ্রেণী। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের হাহাকার তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি তাঁর এই তীব্র ভালোবাসা ও সহানুভূতিই তাঁকে রোমান্টিক কল্পনার জগত থেকে টেনে এনে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তিনি লিখেছেন:
“প্রেমের কাঙাল আমি, মানুষের ভালোবাসায় ধন্য হতে চাই।”
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা বা প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টি কোনোটিই সম্ভব নয়।
ঐতিহ্য ও স্বজাতির প্রতি গভীর প্রেম: ফররুখ আহমদের প্রেমের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল মুসলিম ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সোনালী অতীত। তিনি তাঁর সমাজকে, স্বজাতিকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন। আর এই ভালোবাসা থেকেই তিনি তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে সিন্দবাদ বা হাতেম তাইয়ের মতো কালজয়ী চরিত্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। ঝিমিয়ে পড়া সমাজকে জাগিয়ে তোলার যে আকুলতা তাঁর কবিতায় দেখা যায়, তা মূলত স্বজাতির প্রতি তাঁর গভীর ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
আধ্যাত্মিক ও অপার্থিব প্রেম (সুফিবাদ): ফররুখ আহমদের প্রেমের কবিতায় এক ধরণের সুফিবাদী বা আধ্যাত্মিক ভাবধারা লক্ষ্য করা যায়। পার্থিব সৌন্দর্যের মাঝে তিনি অপার্থিব ও চিরন্তন এক সত্যের সন্ধান করেছেন। তাঁর কাছে প্রেম মানে কেবল দেহের মিলন নয়, বরং তা হলো আত্মার পরিশুদ্ধি। প্রকৃতির সুষমা, পাখির ডাক বা নদীর কলতানের মাঝে তিনি সেই পরম প্রিয় বা স্রষ্টার প্রেমের ছোঁয়া অনুভব করতেন।
দাম্পত্য ও পারিবারিক প্রেম: ব্যক্তিগত জীবনে কবি ছিলেন একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং স্নেহপ্রবণ মানুষ। ১৯৪২ সালে খালাতো বোন রওশন আখতারের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ। শত অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি রাখেননি। তাঁর জীবনের এই শান্ত ও সুন্দর পারিবারিক প্রেম তাঁকে সাহিত্য সাধনার কঠিন পথ পাড়ি দিতে শক্তি জুগিয়েছিল।
মাতৃভাষা ও দেশের প্রতি প্রেম: নিজের দেশ এবং মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁর প্রেম ছিল আপসহীন। একজন উর্দূ-ভাষী বা মুসলিম ঐতিহ্যের কবি হয়েও তিনি বাংলা ভাষার ওপর কোনো আঘাত মেনে নেননি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা এবং বাংলা ভাষার সপক্ষে তাঁর জোরালো লেখনী প্রমাণ করে যে, নিজের মায়ের ভাষা ও মাটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা অকৃত্রিম ছিল।
দুর্ভিক্ষ ও মধ্যবিত্তের হাহাকার: ফররুখ আহমদের কবিতা ছিল মূলত ঘুমন্ত সমাজকে জাগিয়ে তোলার এক তীব্র সংগ্রাম। ১৯৪৩ সালের বাংলার অবর্ণনীয় ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ (দুর্ভিক্ষ) কবিমনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ক্ষুধার্ত, কঙ্কালসার মানুষের হাহাকার দেখে তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তাঁর ‘লাশ’ বা ‘ডাহুক’-এর মতো কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে এই মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। শোষক শ্রেণীর নিষ্ঠুরতা এবং ব্রিটিশ রাজের উদাসীনতার বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রধান অস্ত্র। তিনি নিছক কল্পনার জগতে বিচরণ না করে, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সংগ্রামে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
প্রতিবাদী চেতনা ও রাজনৈতিক অবস্থান
ফররুখ আহমদ ছিলেন আপাদমস্তক একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, তেমনই পাকিস্তান আমলে বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান ছিলেন। কোনো লোভ-লালসা বা ক্ষমতার ভয় তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও তিনি তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাব বজায় রেখেছিলেন।
কবি ফররুখ আহমদের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’-র কবিতাগুলো মূলত রূপক, প্রতীক এবং মুসলিম ঐতিহ্যের জাগরণী সুরে সমৃদ্ধ। এই কাব্যের কয়েকটি অত্যন্ত বিখ্যাত ও বহুল আবৃত্ত লাইন নিচে দেওয়া হলো:
‘সাত সাগরের মাঝি’ (মূল কবিতা) থেকে:
এই লাইনে কবি সিন্দবাদের রূপকে ঘুমন্ত ও ঝিমিয়ে পড়া সমাজকে নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন—
“কেঁদেছে আলোক-লতা, কেঁদেছে আঁধার,
রাতের সমুদ্র-তীরে জাগে হাহাকার।
কতদূর আর? কতদূর আর, মাঝি?
তোমার তরণী এখনো কি আছে বাজি?
এখনো কি তুমি ভোলনি তোমার দিশা?
কাটেনি এখনো তোমার রাতের নিশা?”
জাগরণের ডাক: সমাজকে অলসতা ও জড়তা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে কবি লিখেছেন—
“কত যে আঁধার পর্দা পেরিয়ে এসে
তোমার তরণী পৌঁছল এই দেশে;
তবু তুমি আজো ঘুমাও রাত্রি দিন,
তোমার ললাটে ভাগ্যের কালো চিহ্ন।”
‘লাশ’ কবিতা থেকে (দুর্ভিক্ষের নির্মম চিত্র): ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা এই লাইনে শোষক শ্রেণীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও বাস্তবতার রূপ ফুটে উঠেছে—
“এখানে জীবন পলে পলে হয় পঙ্কিল, আবিল;
এখানে ঘরের কোণে জমে ওঠে অন্ধকারের ফাটল,
এখানে মৃতের চোখে লাগে না তো স্বপ্নের কাজল;
এখানে কেবলই বাড়ে ক্ষুধার্তের দীর্ঘ হাহাকার।”
‘ডাহুক’ কবিতা থেকে: ডাহুক পাখির ডাকের মধ্য দিয়ে কবি গভীর রাতের নিস্তব্ধতা এবং মানুষের ভেতরের সুপ্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন—
“ঝড়ের রাতে ডাহুকী ওরে ডাহুকী রে,
তোর ডাকে কি ভাঙবে ঘুম এই পুরীরে?
এই যেখানে শবের মতো ঘুমায় মানুষ,
এই যেখানে নিভে গেছে আলোর ফানুস।”
এই লাইনগুলো শুধু কবিতার খাতিরে লেখা নয়, এগুলো ছিল তৎকালীন পরাধীন ও শোষিত সমাজের এক একটি ঘুম ভাঙানি গান।
রচনাশৈলী
“কাঁচড়া পাড়ায় রাত্রি। ডিপোতলে এঞ্জিন বিকল—
সুদীর্ঘ বিশ্রান্ত শ্বাস ফেলে জাগে ফাটা বয়লার, —অবরুদ্ধ গতিবেগ। তারপর আসে মিস্ত্রিদল। গলানো ইস্পাত আনে, দৃঢ় অস্ত্র হানে বার বার।
জ্বলন্ত অগ্নির তাপে এই সব যন্ত্র জানোয়ার দিন রাত্রি ঘোরে ফেরে সুদুর্গম দেশে, সমতলে সমান্তর, রেলে রেলে, সেতুপথ পার হয়ে আর অভীষ্ট লক্ষ্যের পানে দার্জিলিংয়ে আসামে জঙ্গলে।
আহত সন্ধ্যায় তারা অবশেষে কাঁচড়া পাড়াতে। দূরে নাগরিক আশা জ্বলে বালবে লাল-নীল-পীত; উজ্জীবিত কামনার অগ্নিমোহ-অশান্ত ক্ষুধাতে; কাঁচড়া পাড়ার কলে মিস্ত্রিদের নারীর সঙ্গীত।
(হাতুড়িও লক্ষ্যভ্রষ্ট) ম্লান চাঁদ কৃষ্ণপক্ষ রাতে কাঁচড়া পাড়ায় জাগে নারী আর স্বপ্নের ইঙ্গিত।”
ফররুখ আহমদ-এর “কাঁচড়াপাড়ায় রাত্রি”, প্রথম প্রকাশ: সওগাত, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ
সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও ফররুখ আহমদ-এর প্রধান পরিচয় ‘কবি’। তিনি সনেটও রচনা করেছেন। তার রচনায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব দেখা যায়। এছাড়া আরবি ও ফারসি শব্দের প্রাচুর্য তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তার অগাধ আস্থা। তবে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার সমর্থন করতেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কবি ফররুখ আহমদ মাসিক সওগাতের আশ্বিন ১৩৫৪ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) সংখ্যায় পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে লেখেন,
“গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ”
কাব্যগ্রন্থ
সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর, ১৯৪৪), নতুন কবিতা (১৯৫০), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর, ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন, ১৯৬১)-কাব্যনাট্য, মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর, ১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি, ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে, ১৯৬৬) কাহিনী কাব্যের জন্য ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার পান। নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (অগাস্ট, ১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর, ১৯৮১), সিন্দাবাদ (অক্টোবর, ১৯৮৩), দিলরুবা (ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪),
গল্পগ্ৰন্থ
ফররুখ আহমদের গল্প
পুরস্কার
১৯৬০ সালে ফররুখ আহমদ বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। কবি ফররুখ আহমদ ১৯৬৫ সনে প্রেসিডেন্ট পদক প্রাইড অব পারফরমেন্স এবং ১৯৬৬ সালে পান আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে তাকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।
মৃত্যু
ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯শে অক্টোবর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি তার কবিতায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লিখে গেলেও তার জীবনে তাকে বহু দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। মূলত ইসলামী আদর্শ লালন করার কারণেই তাকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ঢাকা বেতার থেকে তার চাকুরী চলে যায়। তার এক ছেলে ডাক্তারি পড়ছিল, টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়ে মারা যায়। তখন রমজান মাস ছিল। টাকার অভাবে ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে না খেয়েই রোজা রাখতেন তিনি। ২৭শে রমজান ইন্তেকাল করেন কবি। তাকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক আসাফউদ্দৌলা রেজাসহ অনেকেই সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া কিনা চেষ্টা করলেন। কিন্তু সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে কবি বেনজীর আহমদ তার শাহজাহান পুরের পারিবারিক গোরস্থানে কবিকে দাফন করার জায়গা দান করেন।
কবি ফররুখ আহমদের করুণ পরিণতি দেখে আহমদ ছফা লেখেন- “আজকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মত একজনও শক্তিশালী স্রষ্টা নেই। এমন একজন স্রষ্টা অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যত বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না।”
উপসংহার
কবি ফররুখ আহমদ কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সমাজের জাগরণের অগ্রদূত। ফররুখ আহমদের কবিতা আমাদের শেখায় কীভাবে শেকড়কে ভালোবেসে বিশ্বমানবতার গান গাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান, বিশেষ করে শব্দচয়ন, উপমা ও রূপকের ব্যবহার তাঁকে চিরকাল অমর করে রাখবে। অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর কবিতা আজও সমসাময়িক এবং অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি