দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা এবং সময়মতো হামের টিকা আমদানিতে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের আবেদন করা হয়েছে।
মামলার আবেদনে অন্য আসামি হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফরের।
সোমবার (৮ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জসিতা ইসলামের আদালতে মামলার আবেদন করেন মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির বর্তমান সভাপতি।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার আবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে এখনো শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
বেলা ১১ টা ৪৫ মিনিটে মামলার আদেশ অপেক্ষামান রাখা হয়।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবহেলা ও সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতার কারণে দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার ঘটে, যার ফলে শত শত শিশুর মৃত্যু এবং হাজারো শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। অভিযোগকারীর দাবি, এই পরিস্থিতি সাধারণ অবহেলার সীমা ছাড়িয়ে গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামের ভ্যাকসিন আমদানিতে বিলম্ব ঘটিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। এতে নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শিশুদের সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। হাম-রুবেলা টিকা সেই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই টিকার কার্যকর প্রয়োগের ফলে বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলা সংক্রান্ত মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার এতদিন ইউনিসেফের সহায়তায় হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন ধরনের টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা আমদানির প্রচলিত ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশে টিকার সংকট দেখা দেয় বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স গত ২০ মে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য টিকা সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে একাধিকবার সতর্ক করার কথা জানান। শুধু তাই নয়, বিদ্যমান টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা বহাল রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন বৈঠকে সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্ব দেয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, টিকার ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করতে পারেনি। এর ফলে দেশে হামের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫ হাজার ৭০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে সরকারি হিসাবে প্রায় ৬১০ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও বহু শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি পরিসংখ্যানে স্থান পায়নি। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং রাষ্ট্রকেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
আবেদনে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, টিকা সংকট ও হামের বিস্তারের সঙ্গে এসব মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, ভুল নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডের ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে, যা লাখো শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা নিলেও সময়মতো টিকা না পাওয়ার কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এড়াতে পারেন না। তাই শিশু মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ