ঢাকা ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পূর্ব বাংলার রেনেসাঁ ও আধুনিক ঢাকার রূপকার খাজা সলিমুল্লাহ, আজ তাঁর জন্মদিন

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের ইতিহাসে নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের চতুর্থ খাজা এবং পূর্ব বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান রূপকার। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর একক অবদান তাঁকে উপমহাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
খাজা সলিমুল্লাহ ১৮৭১ সালের ৭ জুন ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন নবাব খাজা আহসানুল্লাহ এবং দাদা ছিলেন নবাব খাজা আবদুল গনি।

ঢাকার নবাব পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশব থেকেই তিনি এক রাজকীয় ও অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গৃহশিক্ষকদের অধীনে ফারসি, উর্দু, আরবি ও ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে নবাব পরিবারের ঐতিহ্যগত শাসনপদ্ধতি, পরোপকার এবং সামাজিক নেতৃত্বের গভীর প্রভাব ছিল।

কর্মজীবনের সূচনা ও ক্ষমতার উত্থান
তরুণ বয়সেই খাজা সলিমুল্লাহ তাঁর মেধার পরিচয় দেন। ১৮৯৩ সালে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। প্রথমে ময়মনসিংহে এবং পরবর্তীতে মুজাফফরপুরে তিনি সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে সরকারি চাকুরির সীমাবদ্ধ জীবন তাঁকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ১৯০১ সালে তাঁর পিতা নবাব খাজা আহসানুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি সরকারি চাকরি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ঢাকার নবাব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং নবাব এস্টেটের প্রধান হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক উত্থান ঘটে।

শাসনকাল এবং জমিদারির আধুনিকায়ন
নবাব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খাজা সলিমুল্লাহ ঢাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তাঁর শাসনকালের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে-

জনকল্যাণমূলক শাসন: তিনি তাঁর প্রজাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। কর মওকুফ, কৃষিঋণ প্রদান এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

ঢাকার আধুনিকায়ন: ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নে তাঁর পিতা ও দাদার শুরু করা কাজগুলোকে তিনি আরও বেগবান করেন।

শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ: তাঁর সময়ে আহসান মঞ্জিল হয়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র। তিনি বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির ঢাকাকে নান্দনিকভাবে সাজাতে অবদান রাখেন।

সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন ও দূরদর্শী নেতৃত্ব
নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত সংগ্রামী এবং দূরদর্শিতায় পূর্ণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া পূর্ব বাংলার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মুক্তি সম্ভব নয়।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫)
তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও আসামের অবহেলিত মুসলিম ও সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানান। লর্ড কার্জনকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি এই অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বলেন, যার ফলশ্রুতিতে ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়।

নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯০৬)
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি। ১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে তাঁরই অর্থায়নে ও আমন্ত্রণে অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর তাঁরই একক প্রচেষ্টায় ও প্রস্তাবে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ (All India Muslim League) গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্ম দেয় এবং উপমহাদেশের রাজনীতি আমূল বদলে দেয়।

শিক্ষানুরাগ ও মানবিক গুণাবলি
নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দিক ছিল তাঁর অসামান্য দানশীলতা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মানুষ চরম হতাশার সম্মুখীন হয়। নবাব সলিমুল্লাহ সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ঢাকার রমনা এলাকায় নিজের জমি থেকে প্রায় ৬০০ একর জমি বিনা মূল্যে দান করেন। (যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হওয়ার আগেই ১৯১৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন)।

সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা: ১৯০৯ সালে তিনি নিজ খরচে ঢাকার আজিমপুরে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজো ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা’ নামে অসহায় শিশুদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা উপবৃত্তি ও দান: ঢাকা কলেজ, আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বুয়েট) সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও জমি দান করেছেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নিয়মিত উপবৃত্তি দেওয়া হতো। অতিরিক্ত দানশীলতার কারণে জীবনের শেষভাগে তিনি বিপুল পরিমাণ ঋণের মুখেও পড়েছিলেন, কিন্তু দান করা বন্ধ করেননি।

পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন একজন স্নেহময় পিতা ও দায়িত্বশীল অভিভাবক। তাঁর বেশ কয়েকজন সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে খাজা হাবিবুল্লাহ পরবর্তীতে ঢাকার নবাব হন এবং রাজনীতিতে যোগ দেন। নবাব পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশাল এস্টেট পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ভাই ও আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তবে রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তিনি নিজের পারিবারিক জীবনের চেয়ে সামাজিক জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

উপাধি 
ব্রিটিশ সরকার তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সমাজসেবা এবং নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করে। যার ম্ধ্যে রয়েছে- সি.এস.আই (১৯০৬), কে.সি.এস.আই (১৯০৯), জি.সি.আই.ই (১৯১১)। এছাড়া তিনি বংশানুক্রমিক ‘নবাব বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন।

অকালে চলে যাওয়া
অবিরাম পরিশ্রম, রাজনৈতিক চাপ এবং আর্থিক উদ্বেগের কারণে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গীর বাসভবনে এই মহান নেতা মাত্র ৪৩ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মরদেহ ঢাকায় এনে বেগমবাজারে নবাব পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ কেবল একজন জমিদার বা নবাব ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক ঢাকার রূপকার এবং উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের জাগরণের অগ্রদূত। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্বাধিকার—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তাঁর ত্যাগ ও দূরদর্শিতা। ইতিহাস তাঁকে চিরকাল একজন মহান দেশপ্রেমিক, শিক্ষানুরাগী ও দানবীর হিসেবে স্মরণ রাখবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

পূর্ব বাংলার রেনেসাঁ ও আধুনিক ঢাকার রূপকার খাজা সলিমুল্লাহ, আজ তাঁর জন্মদিন

আপডেট সময় ০৯:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের ইতিহাসে নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের চতুর্থ খাজা এবং পূর্ব বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান রূপকার। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর একক অবদান তাঁকে উপমহাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
খাজা সলিমুল্লাহ ১৮৭১ সালের ৭ জুন ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন নবাব খাজা আহসানুল্লাহ এবং দাদা ছিলেন নবাব খাজা আবদুল গনি।

ঢাকার নবাব পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশব থেকেই তিনি এক রাজকীয় ও অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গৃহশিক্ষকদের অধীনে ফারসি, উর্দু, আরবি ও ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে নবাব পরিবারের ঐতিহ্যগত শাসনপদ্ধতি, পরোপকার এবং সামাজিক নেতৃত্বের গভীর প্রভাব ছিল।

কর্মজীবনের সূচনা ও ক্ষমতার উত্থান
তরুণ বয়সেই খাজা সলিমুল্লাহ তাঁর মেধার পরিচয় দেন। ১৮৯৩ সালে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। প্রথমে ময়মনসিংহে এবং পরবর্তীতে মুজাফফরপুরে তিনি সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে সরকারি চাকুরির সীমাবদ্ধ জীবন তাঁকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ১৯০১ সালে তাঁর পিতা নবাব খাজা আহসানুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি সরকারি চাকরি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ঢাকার নবাব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং নবাব এস্টেটের প্রধান হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক উত্থান ঘটে।

শাসনকাল এবং জমিদারির আধুনিকায়ন
নবাব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খাজা সলিমুল্লাহ ঢাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তাঁর শাসনকালের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে-

জনকল্যাণমূলক শাসন: তিনি তাঁর প্রজাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। কর মওকুফ, কৃষিঋণ প্রদান এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

ঢাকার আধুনিকায়ন: ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নে তাঁর পিতা ও দাদার শুরু করা কাজগুলোকে তিনি আরও বেগবান করেন।

শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ: তাঁর সময়ে আহসান মঞ্জিল হয়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র। তিনি বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির ঢাকাকে নান্দনিকভাবে সাজাতে অবদান রাখেন।

সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন ও দূরদর্শী নেতৃত্ব
নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত সংগ্রামী এবং দূরদর্শিতায় পূর্ণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া পূর্ব বাংলার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মুক্তি সম্ভব নয়।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫)
তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও আসামের অবহেলিত মুসলিম ও সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানান। লর্ড কার্জনকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি এই অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বলেন, যার ফলশ্রুতিতে ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়।

নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯০৬)
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি। ১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে তাঁরই অর্থায়নে ও আমন্ত্রণে অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর তাঁরই একক প্রচেষ্টায় ও প্রস্তাবে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ (All India Muslim League) গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্ম দেয় এবং উপমহাদেশের রাজনীতি আমূল বদলে দেয়।

শিক্ষানুরাগ ও মানবিক গুণাবলি
নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দিক ছিল তাঁর অসামান্য দানশীলতা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মানুষ চরম হতাশার সম্মুখীন হয়। নবাব সলিমুল্লাহ সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ঢাকার রমনা এলাকায় নিজের জমি থেকে প্রায় ৬০০ একর জমি বিনা মূল্যে দান করেন। (যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হওয়ার আগেই ১৯১৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন)।

সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা: ১৯০৯ সালে তিনি নিজ খরচে ঢাকার আজিমপুরে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজো ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা’ নামে অসহায় শিশুদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা উপবৃত্তি ও দান: ঢাকা কলেজ, আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বুয়েট) সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও জমি দান করেছেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নিয়মিত উপবৃত্তি দেওয়া হতো। অতিরিক্ত দানশীলতার কারণে জীবনের শেষভাগে তিনি বিপুল পরিমাণ ঋণের মুখেও পড়েছিলেন, কিন্তু দান করা বন্ধ করেননি।

পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন একজন স্নেহময় পিতা ও দায়িত্বশীল অভিভাবক। তাঁর বেশ কয়েকজন সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে খাজা হাবিবুল্লাহ পরবর্তীতে ঢাকার নবাব হন এবং রাজনীতিতে যোগ দেন। নবাব পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশাল এস্টেট পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ভাই ও আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তবে রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তিনি নিজের পারিবারিক জীবনের চেয়ে সামাজিক জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

উপাধি 
ব্রিটিশ সরকার তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সমাজসেবা এবং নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করে। যার ম্ধ্যে রয়েছে- সি.এস.আই (১৯০৬), কে.সি.এস.আই (১৯০৯), জি.সি.আই.ই (১৯১১)। এছাড়া তিনি বংশানুক্রমিক ‘নবাব বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন।

অকালে চলে যাওয়া
অবিরাম পরিশ্রম, রাজনৈতিক চাপ এবং আর্থিক উদ্বেগের কারণে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গীর বাসভবনে এই মহান নেতা মাত্র ৪৩ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মরদেহ ঢাকায় এনে বেগমবাজারে নবাব পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ কেবল একজন জমিদার বা নবাব ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক ঢাকার রূপকার এবং উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের জাগরণের অগ্রদূত। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্বাধিকার—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তাঁর ত্যাগ ও দূরদর্শিতা। ইতিহাস তাঁকে চিরকাল একজন মহান দেশপ্রেমিক, শিক্ষানুরাগী ও দানবীর হিসেবে স্মরণ রাখবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি