শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
লক্ষ্মীপুরে মা ও দুই মেয়ে খুন: আহত আরেক মেয়ের মৃত্যু, পিটুনিতে সন্দেহভাজন যুবক নিহত শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা জারি ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প, মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা ৩০ শতাংশ চার মাসে দেশকে আরও এক লাখ কোটি টাকার ঋণের জালে বেঁধেছে সরকার বাংলাদেশে সুইডিশ বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ১৬৪, আহত প্রায় এক হাজার গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ৯ বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা, প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা করলে কঠোর শাস্তি : শিক্ষামন্ত্রী বিমানবন্দরের বাইরে পৃথক কার্গো ভিলেজ গড়ার তাগিদ বাণিজ্যমন্ত্রীর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজ করছে সরকার : পরিবেশমন্ত্রী

বাঙালির দুঃসময়ের পরম বন্ধু অ্যালেন গিন্সবার্গ: আজ তার জন্মদিন

বাংলা 71 নিউজ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৬৪ বার পড়া হয়েছে

অ্যালেন  গিন্সবার্গ । বিংশ শতাব্দীর মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত একজন  কবি ও লেখক। ১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক ইহুদি পরিবারে তার জন্ম। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর নামটির সাথে জড়িয়ে আছে এক গভীর আবেগ, মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।  কারণ ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি  দাঁড়িয়েছিলেন  নিপীড়িত বাঙালির পাশে।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বিট জেনারেশন

১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায় ‘বিট জেনারেশন’ নামে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, গিন্সবার্গ ছিলেন যার মূল পুরোধা। এই আন্দোলনটি তৎকালীন মার্কিন সমাজের পুঁজিবাদ, বস্তুবাদ এবং কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘হাউল’ কবিতাটি মার্কিন সাহিত্যে এক বিশাল ঝড় তোলে। কবিতাটিতে তিনি সমসাময়িক সমাজের হতাশা এবং মানুষের ভেতরের হাহাকারকে অত্যন্ত নগ্ন ও শক্তিশালী ভাষায় ফুটিয়ে তোলেন। তৎকালীন সরকার এটিকে “অশ্লীল” আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, যা পরে বাক-স্বাধীনতার এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।

বাংলাদেশ গিন্সবার্গ: ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড

বাংলাদেশের ইতিহাস ও হৃদয়ের সাথে অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম আজীবন মিশে থাকবে তাঁর কালজয়ী কবিতা  “September on Jessore Road” (সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড)-এর জন্য।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ যখন চরমে, তখন ভারতের কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিল কোটিখানেক বাঙালি শরণার্থী। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) সীমান্ত থেকে ভারতের যশোর রোড দিয়ে আসা এই শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট গিন্সবার্গ নিজের চোখে দেখেন। কলকাতার বিখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তিনি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখেন।

সেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখে স্তব্ধ হয়ে তিনি রচনা করেন ১৫২ লাইনের এই দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটিতে তিনি তুলে ধরেছেন ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, আশ্রয়হীন মানুষের হাহাকার আর বিশ্ববিবেকের নীরবতা। পরবর্তীতে আমেরিকায় ফিরে গিয়ে বিখ্যাত গায়ক বব ডিলান ও অন্যদের সহযোগিতায় এই কবিতাটিতে সুর দিয়ে তিনি গান হিসেবে গেয়েছিলেন। এই গান গেয়ে এবং কবিতা আবৃত্তি করে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করেন এবং শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে তাঁকে সম্মানসূচক ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ -এ ভূষিত করে।

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড

অ্যালেন  গিন্সবার্গের  “September on Jessore Road” কবিতার এই ৪টি লাইন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। কবি এখানে ১৯৭১ সালে যশোর রোডের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ ভাগ্যবিড়ম্বিত বাঙালির অবর্ণনীয় কষ্ট আর মানবিক বিপর্যয় ফুটিয়ে তুলেছেন।

“Millions of babies watching the skies

Millions of souls in their pockets colored dyes

Millions of voices in the human wilderness

Cry millions of sorrows in the sodden distress…”

(“লাখ লাখ শিশু তাকিয়ে আছে আকাশের পানে,

লাখ লাখ বিপন্ন আত্মা, বিবর্ণ মলিন বসনে।

মানবতার এই জনহীন প্রান্তরে লাখো কণ্ঠের আকুলতা,

সিক্ত এই চরম দুর্দশায় কাঁদছে লাখো মানুষের নীরব ব্যথা…”)

 অ্যালেন গিন্সবার্গেরহাউলকবিতা

হাউল (Howl) কবিতাটি মার্কিন সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম একটি মাইলফলক। এটি মূলত তৎকালীন মার্কিন সমাজের যান্ত্রিকতা, পুঁজিবাদ এবং কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে এক তীব্র চিৎকার ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কবিতাটি দীর্ঘ এবং এর ভাষা অত্যন্ত জোরালো, গতিশীল ও রূপকধর্মী।

‘হাউল’ কবিতার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী লাইনগুলো হচ্ছে-

“I saw the best minds of my generation destroyed by madness, starving hysterical naked,

dragging themselves through the negro streets at dawn looking for an angry fix…”

(“আমি দেখেছি আমার প্রজন্মের সেরা মস্তিষ্কগুলোকে উন্মাদনায় ধ্বংস হয়ে যেতে, ক্ষুধার্ত, উন্মত্ত, নগ্ন, ভোরের আলোয় কৃষ্ণাঙ্গদের গলিপথে নিজেদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে, একটু তীব্র নেশার খোঁজে…”)

কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় এই লাইনে গিন্সবার্গ এখানে তাঁর সমসাময়িক তরুণ সমাজ, শিল্পী, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের করুণ দশা তুলে ধরেছেন। তৎকালীন মার্কিন সমাজব্যবস্থা সাধারণ ছক বা নিয়মের বাইরে ভাবা এই প্রতিভাবান মানুষদের গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে তারা একাকীত্ব, মাদক আর উন্মাদনার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।

কবিতার দ্বিতীয় অংশে গিন্সবার্গ ‘Moloch’ (মোলক) শব্দটিকে একটি রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী মোলক হলো এমন এক প্রাচীন দেবতা, যাকে সন্তুষ্ট করতে সন্তান বলি দিতে হতো। গিন্সবার্গের চোখে আধুনিক আমেরিকার পুঁজিবাদী ও যান্ত্রিক সমাজই হলো সেই ‘মোলক’, যা তরুণদের জীবন বলি দিচ্ছে।

“Moloch! Solitude! Filth! Ugliness! Ashcans and unobtainable dollars! Children screaming under the stairways! Boys sobbing in armies! Old men weeping in the parks!”

বাংলা অনুবাদ

“মোলক! নির্জনতা! নোংরামি! কুৎসিত রূপ! আবর্জনার পাত্র আর অধরা ডলার! সিঁড়ির নিচে শিশুদের চিৎকার! সেনাবাহিনীতে যুবকদের ফুঁপিয়ে কান্না! পার্কের বেঞ্চে বৃদ্ধদের অশ্রুপাত!”

মূলত  কবি এখানে আধুনিক শহরের যান্ত্রিক ও নির্মম রূপটি তুলে ধরেছেন। যেখানে টাকার (ডলার) পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ একাকী হয়ে পড়ছে, শিশুরা অবহেলিত, তরুণরা যুদ্ধের বলি হচ্ছে আর বৃদ্ধরা পরিত্যক্ত অবস্থায় কাঁদছে।

“Moloch whose mind is pure machinery! Moloch whose blood is running money! Moloch whose fingers are ten armies!”

বাংলা অনুবাদ

“মোলক, যার মনটা পুরোপুরি আস্ত একটা যন্ত্র! মোলক, যার রক্তে বইছে কেবলই টাকা! মোলক, যার দশটি আঙুল যেন দশটি সেনাবাহিনী!”

গিন্সবার্গ এই লাইনে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার চরম ক্ষমতা ও নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিয়েছেন। সমাজ মানুষের আবেগ-অনুভূতি কেড়ে নিয়ে তাকে যন্ত্র বানিয়ে দিচ্ছে, যেখানে রক্তের চেয়ে টাকার মূল্য বেশি এবং রাষ্ট্র সামরিক শক্তি (১০টি সেনাবাহিনী) দিয়ে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

কবিতার শেষ অংশে গিন্সবার্গ তাঁর বন্ধু কার্ল সলোমনকে উৎসর্গ করে লিখেছেন, যিনি তৎকালীন একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

“Carl Solomon! I’m with you in Rockland where you’re madder than I am…”

বাংলা অনুবাদ

“কার্ল সলোমন! আমি রকল্যান্ডে তোমার সাথেই আছি, যেখানে তুমি আমার চেয়েও বেশি উন্মাদ…”

এখানে কবি বোঝাচ্ছেন যে, এই নিষ্ঠুর সমাজে যারা তথাকথিত “স্বাভাবিক”, তারা আসলে অন্ধ। আর যারা সত্য দেখতে পেয়ে সমাজের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, সমাজ তাদের “পাগল” বা “উন্মাদ” আখ্যা দিয়ে মানসিক হাসপাতালে (রকল্যান্ড) বন্দি করে রাখছে। কবি নিজেকে সেই বন্ধুদেরই একজন ভাবেন।

‘হাউল’ কবিতাটি পড়ার সময় মনে হয় কবি যেন দম না নিয়ে একনাগাড়ে সমাজের সব অন্যায়কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। এই ক্ষোভ এবং সত্য প্রকাশের সাহসের কারণেই কবিতাটি আজও বিশ্বসাহিত্যে এতটা জনপ্রিয়।

ব্যক্তিগত জীবন দর্শন

গিন্সবার্গ কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আজীবন অ্যাক্টিভিস্ট বা আন্দোলনকারী।

তিনি ভিয়েতনামের যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং মার্কিন সরকারের যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

১৯৬০-এর দশকে তিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা, বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্ম এবং ভারতীয় দর্শনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

তার বিতর্কিত দিকের মধ্যে রয়েছে- তিনি সমকামীদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছেন। তবে  বাক-স্বাধীনতার পক্ষে তার আমৃত্যু লড়াই তাকে অমর করে রেখেছে।

জীবনাবসান

১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল ৭১ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এই মহান কবি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখে গেছেন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com