মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
এলপি গ্যাসের দাম কমেছে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় পোস্টমর্টেম জরুরি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশজুড়ে ‘চিরুনি অভিযান’, হাসপাতাল-টেস্টে ছাড় ঘোষণা দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগ বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে নরওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রামিসা হত্যা: আদালতে স্বজন-প্রতিবেশীদের সাক্ষীতে উঠে এলো ভয়াবহ চিত্র আমাদের সবার সন্তান থাকলেও তাদের সুরক্ষা বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন নই: ডেপুটি স্পিকার ৪৮ ডিগ্রি তাপপ্রবাহে উত্তপ্ত উত্তর প্রদেশের বান্দা, ‘সব সময়ই যেন দুপুর’ সি‌ন্ডিকেটমুক্ত না করতে পারলে চলে যাব : প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ‘বাজেট বরাদ্দের পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জুলাই-আগস্টে সিদ্ধান্ত’

মহাকালের পাতায় এক অক্লান্ত পথিক বিপ্লবী এম এন রায়: যার মূল্যায়ন হয়নি

বাংলা৭১নিউজ,ডেস্ক:
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

আজ ২ জুন। আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম. এন. রায়)। তিনি একাধারে ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক, সশস্ত্র বিপ্লবী, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং ‘র‌্যাডিকাল হিউম্যানিজম’ বা ‘উগ্র মানবতাবাদ’ দর্শনের প্রবক্তা। স্বাধীন ভারতে তৎকালীন সরকারগুলোর কাছ থেকে তিনি জীবদ্দশায় কোন মূল্যায়ন পাননি।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

এম. এন. রায় ১৮৮৭ সালের ২ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ২৪ পরগনার আরবেলিয়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আত্মগোপন ও সাংগঠনিক কাজের সুবিধার্থে তিনি ‘মানবেন্দ্রনাথ রায়’ (সংক্ষেপে এম. এন. রায়) নাম ধারণ করেন।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ও ভারত ত্যাগ

তরুণ বয়সেই মানবেন্দ্রনাথ রায় ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। বিখ্যাত বিপ্লবী বাঘা যতীনের (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) সংস্পর্শে এসে তিনি ‘যুগান্তর’ দলের অন্যতম প্রধান সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৫ সালে) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য জার্মানি থেকে অস্ত্র আনার উদ্দেশ্যে তিনি ছদ্মবেশে ভারত ত্যাগ করেন। জাভা, জাপান ও চীন ঘুরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিশ্বমঞ্চে উত্থান

আমেরিকায় অবস্থানকালেই তিনি মার্ক্সীয় দর্শনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। এরপর তার রাজনৈতিক জীবন এক অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক মোড় নেয়। ১৯১৯ সালে তিনি মেক্সিকোতে বিশ্বের প্রথম সারির কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর একটি প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

লেনিনের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য

 ১৯২০ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের আমন্ত্রণে মানবেন্দ্রনাথ রায় রাশিয়ার মস্কোয় দ্বিতীয় কমিন্টার্ন (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) কংগ্রেসে যোগ দেন। সেখানে উপনিবেশিক প্রশ্নে লেনিনের তত্ত্বের সাথে তার তাত্ত্বিক বিতর্ক হয়, যা ইতিহাসে অত্যন্ত বিখ্যাত। পরবর্তীতে তিনি কমিন্টার্নের এশীয় অঞ্চলের প্রধান নিযুক্ত হন।

স্বদেশে প্রত্যাবর্তন, সাহিত্য ও নতুন দর্শন

১৯৩০ সালে তিনি গোপনে ভারতে ফিরে আসেন কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিতে পারেননি। ১৯৩১ সালে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ৬ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। জেলজীবন তার চিন্তাভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই সময়ে তিনি হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেখেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন গ্রন্থে রূপ নেয়। তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘India in Transition’,’Reason, Romanticism and Revolution’, এবং ‘Beyond Marxism’ (‘পরিবর্তনশীল ভারত’, ‘যুক্তি, রোমান্টিকতা ও বিপ্লব’, এবং ‘মার্ক্সবাদের ঊর্ধ্বে) অন্যতম।জীবনের শেষ অধ্যায়ে এম. এন. রায় সক্রিয় ও প্রথমার্ধের ক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যান। তিনি ভারতের উত্তরখণ্ডের পাহাড়ি শহর দেহরাদুন-এ তাঁর স্ত্রী ইভলিন ট্রেন্ট এবং পরবর্তীতে অ্যালেন রায়ের সাথে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি তাঁর চিন্তাভাবনা ও নব্য-মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দিতে ‘ইন্ডিয়ান রেনেসাঁ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রচলিত সাম্যবাদ বা মার্ক্সবাদের সীমাবদ্ধতা অনুভব করেন এবং এক নতুন দর্শনের জন্ম দেন, যার নাম ‘র‌্যাডিকাল হিউম্যানিজম’ বা নব-মানবতাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষই সমস্ত কিছুর পরিমাপক এবং মানুষের স্বাধীনতা কোনো দল বা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলে বন্দী হতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও স্বীকৃতি

এম. এন. রায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত। ব্রিটিশদের চোখে তিনি ছিলেন “বিপজ্জনক রাষ্ট্রদ্রোহী”, সোভিয়েত রাশিয়ার স্টালিনের চোখে “বিচ্যুত সমাজতন্ত্রী” এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় কংগ্রেসের অনেকের চোখে “কট্টর সমালোচক”। ফলে প্রথাগত রাজনীতির বৃত্তে স্বাধীন ভারতে তৎকালীন সরকারগুলোর কাছ থেকে তিনি জীবদ্দশায় খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় পদক পাননি।  তার মৃত্যুর পর ভারত সরকার ১৯৮৭ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারত সরকার তাঁর স্মরণে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এটি ছিল তাঁর বৈপ্লবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্তরের অন্যতম বড় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

এছাড়া দেহরাদুনে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনটিকে একটি হেরিটেজ সাইট বা ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান রেনেসাঁ ইনস্টিটিউট’ ও তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আজও রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় পরিচালনা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও দর্শনের পাঠ্যসূচিতে “আধুনিক ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তা” অধ্যায়ে এম. এন. রায়ের জীবনী ও তাঁর ‘র‌্যাডিকাল হিউম্যানিজম’ দর্শন  অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সন্মাননা

মেক্সিকোর জাতীয় ইতিহাসে প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল গঠনে তাঁর ভূমিকাকে আজও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। সেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দলিলে তাঁর নাম সবার ওপরে রাখা হয়েছে। আমেরিকার বিখ্যাত ‘হুভার ইনস্টিটিউশন’ এবং নেদারল্যান্ডসের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রি’ -তে রায়ের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কর্মজীবন ও কমিন্টার্ন অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষিত আছে।

মহাপ্রয়াণ

১৯৫২ সালে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার প্রাক্কালে দেহরাদুনে এক পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার সময় এম. এন. রায় মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন এবং পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। এই দুর্ঘটনার পর তাঁর শরীর ভাঙতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে তিনি তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হন, যা তাঁকে দীর্ঘ সময়ের জন্য শয্যাশায়ী করে ফেলে।

১৯৫৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, মধ্যরাতের ঠিক ১০ মিনিট আগে (রাত ১১টা ৫০ মিনিটে) দেহরাদুনের নিজ বাসভবনে আবারও তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে এই মহান আন্তর্জাতিক বিপ্লবী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

২ জুনের এই দিনে জন্ম নেওয়া এই মনীষী আজীবন মানুষের মুক্তি এবং চিন্তার স্বাধীনতার কথাই বলে গেছেন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com